মৌলভীবাজারের ‘আগর-আতর’ এর সম্ভাবনা বিশ্বব্যাপী

মৌলভীবাজার জেলার জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে আগর-আতর। আগর নামক এক প্রকার গাছ থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এই আতর তৈরি হয়।

এই শিল্পটিকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়েছে দিনব্যাপী সেমিনার।
আলোচকদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, সারা দেশে প্রায় ২ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই আগর এবং আতর পণ্য উৎপাদনে শ্রম বিক্রয়ে ও বিপণনের সঙ্গে নিয়োজিত রয়েছেন।

‘আগর-আতর শিল্পের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসক ড. উর্মি বিনতে সালাম।

প্রধান অতিথি হিসেবে কর্মশালার উদ্বোধন করেন সিলেট বিভাগীয় কমিশনার আবু আহমদ সিদ্দিকী।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ‘আগর-আতর শিল্পকে গার্মেন্টস শিল্পের মতো বৃহৎ রপ্তানি খাতে পরিণত করতে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর সম্ভাবনা রয়েছে বিশ্বব্যাপী। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই পণ্য উৎপাদন, পরিবহন ও বিদেশে রপ্তানিতে ব্যবসায়ীরা যাতে কোনো ধরনের জটিলতা কিংবা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন না হন সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সম্পূর্ণ বৃক্ষে উন্নতমানের আগর রেজিন সঞ্চয়ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন শীর্ষক প্রকল্পের বিভাগীয় কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ জাকির হোসাইন।

সিলেট বিভাগে আগর চাষ ও সম্ভাবনা বিষয়ক আলোচনা করেন আগর-আতর ব্যবসায়ী ও সিলেট ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সিআইপি মহিউদ্দিন আহমদ সেলিম।

বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার দেবজিৎ সিংহ, মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আব্দুস সালাম চৌধুরী, মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদর্শন কুমার রায়, বড়লেখা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আসলাম সারোয়ার, কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মনোয়ার হোসেন প্রমুখ।

 

আগর-আতর শিল্পের উন্নয়নে সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরে বাংলাদেশ আগর অ্যান্ড আতর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি আশরাফ মুহিত ছয়েফ বলেন, প্রায় ৪শ বছর ধরে বংশানুক্রমে বড়লেখার সুজানগরে আগর ব্যবসা চালু থাকলেও ইতোপূর্বে কোনো সরকার এই প্রাচীন ব্যবসার পৃষ্ঠপোষকতা করেনি।

তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগর শিল্পের সম্ভাবনা অনুধাবন করে ২০১৩ সালে আগরকে ক্ষুদ্র শিল্প ঘোষণা করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আগরকে ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে সরকারি গেজেট প্রকাশ করে।

বাংলাদেশ আগর অ্যান্ড আতর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনকে টি ও শাখায় লাইসেন্স দেন। ২০১৪ সাল থেকে ইপিবি মৌলভীবাজার জেলার রপ্তানি পণ্য হিসেবে ‘এক জেলা এক পণ্য’ ওডিওপি কর্মসূচির আওতায় নিয়ে সহায়তা করে আসছে। ২০১৬ সালে শিল্প মন্ত্রণালয় আগরকে অগ্রাধিকার খাতের আওতায় নিয়ে সহায়তা প্রদান করছে। রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় আগর পণ্য রপ্তানিতে ২০ শতাংশ প্রণোদনা দিতে ব্যবসায়ীরা কুরিয়ার সার্ভিস ও প্যাসেঞ্জার লাগেজ বাদ দিয়ে বৈধ পথে রপ্তানি শুরু করেন।

কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালেও প্রায় ১৫০ কোটি টাকার আগর-আতর রপ্তানি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি আগর-আতরের বিরাট চাহিদা রয়েছে। এর উন্নয়নে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ ও প্রতিবন্ধকতা দূর করা হলে দেশের উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়বে, বছরে হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আগর আতর শিল্পের উন্নয়নে আগর-আতর ফ্যাক্টরির গ্যাস বিল বাণিজ্যিক হারে না নিয়ে ক্ষুদ্র শিল্প হারে অথবা চা শিল্পের মতো নির্ধারণ, বন বিভাগে সৃজিত প্রাপ্তবয়স্ক আগর গাছ ‘২০১২ সালে আগর গাছ বিক্রয় নীতিমালা’ অনুযায়ী বিক্রয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ, আকাশপথে দ্রুত আগর পণ্য পরিবহনের জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের স্পেস রিজারভেশন কৌটা ঘোষণা, দ্রুততম সময়ে সাইটিস সার্টিফিকেট সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া, দীর্ঘ মেয়াদি বড় অঙ্কের ব্যাংক ঋণ প্রদানসহ ১২টি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।

উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বড়লেখার সুজানগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আগর আতর রপ্তানিকারক দুবাই প্রবাসী ব্যবসায়ী বদরুল ইসলাম, বাংলাদেশ আগর অ্যান্ড আতর ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি আব্দুল আজিজ, আব্দুল কুদ্দুছ, সাধারণ সম্পাদক বাবুল আহমদ, সদস্য আজিজ আশরাফ আল মুহিত, বিডা জেলা প্রশিক্ষণ সমন্বয়ক মো. নিয়াজ মোর্শেদ, সাংবাদিক আব্দুর রব, দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউপি চেয়ারম্যান মুহিবুর রহমান কামাল প্রমুখ।