মানসম্পন্ন রপ্তানিযোগ্য সোনালি আঁশ

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া, মৃত্তিকার ধরন পাট উৎপাদনের অনুকূলে। পাট উৎপাদনে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চল প্রথম, ফরিদপুর দ্বিতীয়, যশোর তৃতীয় এবং কুষ্টিয়া চতুর্থ। বাংলাদেশের পাট গুণগত দিক থেকে সব দেশে গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিকমানের। এত উৎকৃষ্ট পাট পৃথিবীর অন্য কোথাও উৎপন্ন হয় না। তাই সরকার পুনরায় পাট উৎপাদনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে।

বাংলাদেশ কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী দেশে পাটচাষি রয়েছে প্রায় ৪০ লাখ। তাঁরা নিরলসভাবে প্রায় ৭.৫-৮.০ লাখ হেক্টর জমিতে পাট উৎপাদন কাজে অবদান রাখছেন, যা থেকে প্রায় ৮০ লাখ বেল পাট আঁশ উৎপন্ন হয়। ফলে পাট ও পাটজাত পণ্য পুনরায় দেশের দ্বিতীয় রপ্তানি খাত হিসেবে স্থান দখল করে নিয়েছে।
বাংলাদেশে পাট উৎপাদন মৌসুম হচ্ছে চৈত্রের প্রথম থেকে আষাঢ়ের শেষ। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত পাটখেতে করণীয় কাজ নিয়ে কৃষক ভাইদের উদ্দেশে কিছু দিকনির্দেশনা-

পরিচর্যা
নিড়ানি দিয়ে আগাছা দমন ও চারা পাতলা করতে হবে (অনেক চাষি ভাই ইতোমধ্যে এই কাজটি করেছেন)।

পাট গাছের বালাই দমন
বিছাপোকা আক্রমণ- কচি ও বয়স্ক সব পাতা খেয়ে ফেলে। এক্ষেত্রে আক্রমণের প্রথম অবস্থায় কীড়াসহ পাতাগুলো সংগ্রহ করে ধ্বংস করে ফেলতে হবে।
ঘোড়াপোকা আক্রমণ- ডগার দিকের কচি পাতা খেয়ে ফেলে। এক্ষেত্রে কেরোসিনে ভেজানো দড়ি গাছের ওপর দিয়ে টেনে দেওয়া যেতে পারে। খেতে ডালপালা পুঁতে পাখি বসার জায়গা করে দিলে পাখিরা পোকা খেয়ে পোকার সংখ্যা কমিয়ে দিতে পারে।
উড়চুঙ্গা পোকাÑ জমিতে গর্ত করে চারা গাছের গোড়া কেটে দেয়। এক্ষেত্রে খেতে পানি সেচ দিলে পোকা মাটি থেকে বের হয়ে আসবে। অতঃপর পোকা ধ্বংস করে ফেলতে হবে।
চারায় মড়ক রোগ- গোড়ায় কালো দাগ হয়ে চারা মারা যায়। মরা চারা তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
ঢলে পড়া রোগÑ শিকড়ে এ রোগের জীবাণু আক্রমণ করলে গাছ ঢলে পড়ে। এক্ষেত্রে জমিতে পানি থাকলে তা সরিয়ে ফেলতে হবে। খেত রাখতে হবে আবর্জনামুক্ত। এছাড়াও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শক্রমে অনুমোদিত মাত্রায় জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে।

পাটখেতের অর্ধেকের বেশি পাট গাছে ফুল এলে পাট কাটতে হবে। এতে আঁশের মান ভালো হয় এবং ফলনও ভালো পাওয়া যায়।
পরিসংখ্যান মতে বর্তমানে বছরে ৫০০ বিলিয়ন পচনশীল পলিব্যাগের বৈশ্বিক চাহিদা রয়েছে। বিশ্বের এই চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারলে তা দেশের মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী করে দেশের জন্য বয়ে আনবে সম্মান ও বৈদেশিক মুদ্রা। এ অবস্থায় পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার যে কোনো মূল্যে টিকিয়ে রেখে রপ্তানি আয় বাড়াতে হবে। পাট রপ্তানি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে পাটের মূল্য বেশি পাওয়ার জন্য পাটের আঁশের রং পরিষ্কার হওয়া বাঞ্ছনীয়। পাটের আঁশের গুণগতমান মূলত নির্ভর করে সঠিক পাট পচনের ওপর।

সাধারণত আষাঢ়ের শেষ-শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহে পাট কাটা হয়। যেখানে পর্যাপ্ত পানি আছে সেই স্থানে পাট পচিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। অন্যথায় পাট পচানোর জন্য ‘রিবন রেটিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। এ পদ্ধতিতে পুরো পাট গাছ না পচিয়ে কাঁচা গাছ থেকে ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে ছাল পচাতে হয়। এতে আঁশের মান ভালো হয় ও পচন সময় কমে যায়।

রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট পচানো
দেশী পাটের বয়স ১০৫-১১০ এবং তোষা পাটের বয়স ১০০-১০৫ দিন হলে পাট কাটতে হবে। পাট কাটার পর পাতা ঝরিয়ে গোড়ার অংশে ৩-৪ ইঞ্চি পরিমাণ একটি বাঁশের হাতুড়ি বা মুগুর দিয়ে থেঁতলে নিতে হবে। থেঁতলানো ৪-৫টি গাছ রিবনার যন্ত্রের দুই রোলারের (ইংরেজি ইউ আকৃতির মতো) মাঝখানে রেখে থেঁতলানো ছালগুলোকে দুই ভাগ করে রোলারের বাইরে থেকে টান দিতে হবে।

এতে পাটকাঠি সামনের দিকে চলে যাবে এবং পাট গাছ থেকে ছাল আলাদা হয়ে হাতে থেকে যাবে। ছালগুলোকে একত্রিত করে মোড়া বাঁধতে হবে। মোড়াগুলোকে একত্রিত করে মাটির চাড়িতে জাক দিতে হবে। মাটির চাড়িতে পর্যাপ্ত পানি, পাটের কাঁচা ছাল ১০০০ কেজি, ইউরিয়া সার ১০০ গ্রাম অথবা ৩-৪টি পাট গাছ টুকরা করে অন্য পাত্রে পচিয়ে নিয়ে পচন ইনোকুলাম (ব্যাকটেরিয়া) হিসেবে ব্যবহার করা যায়। যা পাট পচন ক্রিয়া ত্বরান্বিত করে।
অতঃপর কচুরিপানা বা খড় বা চট দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে দিতে হবে যেন রৌদ্রে ছালগুলো শুকিয়ে না যায়। সাধারণত ১০-১৫ দিনের মধ্যে ছাল পচে যায়। জাক দেওয়া শেষ হলে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে বাঁশের আড়ায় ভালোভাবে শুকিয়ে গুদামজাত করতে হবে।
রিবন রেটিং পদ্ধতির ওপরে প্রশিক্ষণ, রিবনার যন্ত্রসহ সার্বিক সহযোগিতার জন্য উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।

লেখক : ড. শাহনাজ বেগম নাজু
কৃষিবিদ, কুড়িগ্রাম