কোরবানির অর্থনীতি ‘লাখ কোটি’ টাকা ছাড়াবে

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার বলরামপুর গ্রামের কৃষক মো. আলী রাজ (হাসেম আলী)। প্রতিবছর তিনি কোরবানি দেন। এবার কোরবানি ছাড়াও ঈদের পরদিন রয়েছে একমাত্র কন্যার বিয়ের অনুষ্ঠান। আয়োজন বড় না হলেও আত্মীয়-স্বজনরা অংশ নেবে।

সব মিলিয়ে এবারের ঈদে হাসেম আলীর অন্তত ৯ লাখ টাকা খরচ হবে। আবার পাল্টা অনুষ্ঠান করতে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির পক্ষেরও খরচ হবে অন্তত ১০ লাখ টাকা।

কোরবানি ঈদ ঘিরে অর্থনীতির একটি উদাহরণ হাসেম আলী। এভাবে প্রতিবছর বড় হচ্ছে দেশে কোরবানির ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতি।

ধারণা করা হচ্ছে, এবার কোরবানির ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার এক লাখ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে পশু ক্রয়-বিক্রয় খাত। এ খাতে বড় অবদান রাখে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। ঈদের আগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করা বাংলাদেশিরা বিপুল রেমিট্যান্স পাঠান।

এবার কোরবানির ঈদের আগেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। চলতি জুন মাসের প্রথম ১২ দিনে ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে ১৪৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এই অর্থ আগের পুরো মাসের তুলনায় ৭৪ শতাংশ বেশি। আবার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ছাড়িয়েছে ১২৩ কোটি ডলার। এ খাতের প্রধান কাঁচামাল চামড়া, যার ৭০ শতাংশ সংগ্রহ করা হয় কোরবানির ঈদে।

তবে এবারের ঈদ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতিজনিত ব্যয় বাড়ার চাপ থাকবে। কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতি অনেকাংশে অন্তর্ভুক্তিমূলক। এতে গরিব মানুষের হিস্যাও জড়িত। আবার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা পশু বিক্রির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের পরিচালক অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এবারের কোরবানির ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। ঈদকেন্দ্রিক অর্থনীতির মধ্যে কোরবানির অর্থনীতিটা দেশের জন্য বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক। এই সময়ে ধনীদের কাছ থেকে গরিব মানুষ কোরবানির পশুর মাংস পায়। এতে কিছুটা হলেও তাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয়। আবার এক কোটির ওপর কোরবানির যেসব পশু বিক্রি হয়, তার বেশির ভাগ সরবরাহ করেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা। ফলে এই সময়ে এসব খামারি বাড়তি আয় করেন। যদিও এবার পশুর দাম ভোক্তা ও খামারিদের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব তৈরি করেছে। তবে বিষয়টি যেহেতু ধর্মীয়, বাড়তি দাম হলেও দিনশেষে মানুষ কোরবানির জন্য পশু কিনবে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও ব্যাবসায়িক কার্যক্রমের মধ্যে সবচেয়ে বড় খাত পশু ক্রয়-বিক্রয়। গত বছর এক কোটি ৪২ হাজার পশু কোরবানি দেওয়া হয়। চলতি বছর চাহিদা রয়েছে এক কোটি সাত লাখ পশুর। বিপরীতে পশু প্রস্তুত আছে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ। এ খাতের সঙ্গে জড়িত ফিড মিল, পরিচর্যায় নিয়োজিত শ্রম, ওষুধ ও ব্যবস্থাপনা। এসবের অর্থনীতিতে যুক্ত হতে পারে ৬৫ হাজার কোটি টাকা।

কোরবানির পশু ক্রয়-বিক্রয় ছাড়াও অন্য কিছু খাত রয়েছে। বিশেষ করে চামড়া, মসলা, পশু খাদ্য, লবণ ও ওষুধ। এতেও বিপুল অর্থ হাতবদল হয়।

পাশাপাশি এ সময় প্রবাসীরা কোরবানির জন্য দেশে অর্থ পাঠান। এতে বাড়ে রেমিট্যান্স। মানুষের নতুন জামাকাপড় কেনার প্রবণতাও বাড়ে। আবার কোরবানির ঈদকে ঘিরে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান। ঈদ বোনাস কিংবা বাড়তি আয় দিয়ে অনেকে শৌখিন বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনে। এর মধ্যে অন্যতম টিভি, ফ্রিজ, এসি। কোরবানির মাংস সংরক্ষণে বছরের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় এ সময় ফ্রিজ বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফ্রিজ ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য মতে, দেশে বছরে ১৬-১৭ লাখ ফ্রিজের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ ফ্রিজ বিক্রি হয় কোরবানির ঈদের সময়। সব মিলিয়ে এসব খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়।

কোরবানির ঈদ অর্থনীতির আরেকটি খাত হলো পরিবহন। পশু পরিবহনের জন্য ট্রাক ভাড়া, মানুষের ভ্রমণ ও যাতায়াতের জন্য বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও বিমানের টিকিট কেনায় খরচ বাড়ে। ফলে পরিবহন খাতে যুক্ত হয় বাড়তি খরচ। সব মিলিয়ে পরিবহন ও ঈদ বোনাসের টাকায় বাড়তি কেনাকাটায় যুক্ত হয় আরো প্রায় আট হাজার কোটি টাকা।

কোরবানিকে কেন্দ্র করে পশু জবাই ও মাংস কাটার জন্য দা, বঁটি, ছুরিসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের বেচাকেনা বৃদ্ধি পায়। পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোরবানিকে ঘিরে চাঁদা, টোল, বকশিশ, চোরাকারবার, ফড়িয়া, দালাল, হাসিল, পশুর হাটের ইজারা, বাঁশ-খুঁটির ব্যবসা, পশুর খাবার, পশু কোরবানি এবং মাংস প্রসেস এবং কোরবানির পশুর সাজগোজ বাবদও বিপুল অর্থ হাতবদল হয়।