জিয়াউর রহমান যেভাবে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে চেয়েছিলেন

 

১৯৮১ সাল ১৬ মে। জিয়াউর রহমান রাতে তাঁর বাসভবনে মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে এক বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। বৈঠকে জিয়াউর রহমান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার, শাহ আজিজুর রহমান, একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম মুস্তাফিজুর রহমান।
এই সময় বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ছিলেন উপরাষ্ট্রপতি। তিনি আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দায়িত্বে ছিলেন। শাহ আজিজুর রহমান ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং কর্নেল (অবঃ) মুস্তাফিজুর রহমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ ছাড়াও তৎকালীন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানকেও জিয়াউর রহমান ডেকেছিলেন। একই সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন ব্যক্তিকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ওই বৈঠকে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, কোন অবস্থাতেই যেন শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে না পারেন। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা ঠেকাতে কী কী করা যেতে পারে সে ব্যাপারে তিনি সবার মতামত জানতে চেয়েছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেছিলেন যে, এয়ারলাইন্স সংস্থাগুলোকে যদি বলে দেওয়া হয় যে, শেখ হাসিনা পারসোনা নন গ্রাটা, তাকে বাংলাদেশে প্রবেশের অধিকার দেওয়া হবে না, সেক্ষেত্রে এয়ারলাইন্সগুলো তাকে বাংলাদেশে নেবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জিয়াউর রহমানের অনুমতি চেয়েছিলেন এরকম আদেশ দেওয়া হবে কি না। এ ছাড়াও ওই বৈঠকে উপস্থিত শাহ আজিজুর রহমানও বলেছিলেন, শেখ হাসিনা যেন কোনভাবেই বাংলাদেশে আসতে না পারেন। তাকে যদি বাংলাদেশে আসতে দেওয়া হয় তাহলে এটি একটি গণ অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে।
তবে সেই সময় থাকা সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ব্যক্তিরা জিয়াউর রহমান এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছেন। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার দুজন কর্মকর্তা বলেছেন যে, এর ফলে একাধিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমত, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি ঘটতে পারে। কারণ তিনি ভারত থেকে আসছেন। ভারতের ইমিগ্রেশন বিভাগ যদি শেখ হাসিনাকে বিমানে ওঠার অনুমতি দেন, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে নামলে অন্য রকম পরিস্থিতি হবে। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে এটাও বলা হয়েছিল যে, শেখ হাসিনাকে যদি আসতে না দেওয়া হয় তাহলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে যেতে পারে। কারণ শেখ হাসিনার আগমন উপলক্ষে শুধু আওয়ামী লীগ নয়, সারা দেশের জনগণের মধ্যে একটা আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। এই সময়ে যদি শেখ হাসিনাকে বাঁধা দেওয়া হয় তাহলে জনগণ সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নেবে। মূলত সামরিক গোয়েন্দাদের এই বক্তব্যের পর জিয়াউর রহমান তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসেন। এই সময় বলা হয় যে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেও তাকে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না। তাকে গৃহবন্দি করা যায় কি না সেই বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত সিনিয়র ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ কে এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছিলেন, শেখ হাসিনা আসার পর পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। আমরা আগে বুঝার চেষ্টা করি তিনি আসার পরে কী করেন। তবে ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল শেখ হাসিনাকে ৩২ নম্বর বাসভবন দেওয়া হবে না এবং কোন ভাবেই ৩২ নম্বরের গেট খোলা যাবে না। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর জনতার ঢল দেখে জিয়াউর রহমান বিচলিত হয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী ওই দিন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের গেট খুলে দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগ সভাপতি ৩২ নম্বরে এসে রাস্তার পর মিলাদ মাহফিল পড়েন, দোয়া পড়েন। এ সময় তিনি আকুল কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর আগে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বুঝে পাননি শেখ হাসিনা। এই তথ্যগুলো ওই সময়ে কর্মরত সামরিক গোয়েন্দাদের কাছ থেকে সংগৃহীত। নানা রকম বাস্তবতার কারণে তারা তাদের পরিচয় গোপন করতে চেয়েছেন।