স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা

‘উন্নয়ন দৃশ্যমান করতে বাড়বে এবার কর্মসংস্থান’ স্লোগানে ‘আমাদের বিশেষ অগ্রাধিকার’ শিরোনামের নির্বাচনী ইশতেহারে ১১ দফা অঙ্গীকার করেছে টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ। উন্নয়নের চমক জাগানিয়া স্বপ্ন দেখানো ইশতেহারে তরুণদের স্মার্ট জনশক্তিতে রূপান্তর, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদ ও মাদক নির্মূলের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশকে স্মার্ট বাংলাদেশে গড়ার প্রতিশ্রæতি দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে ঘোষণা রয়েছে কৃষিতে বিনিয়োগ, শিল্পের প্রসার, ব্যাংক খাতে সক্ষমতা বাড়ানো, স্বাস্থ্য সেবা, সর্বজনীন পেনশন, আইনশৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা এবং সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুরক্ষা ও চর্চার প্রসার ঘটানোর। ‘টেকসই উন্নয়নের পরিক্রমায় স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা’ শিরোনামে সদ্য প্রস্তাবিত বাজেটের মূল স্লোগান সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অঙ্গীকার। স্মার্ট সমাজ, স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট সরকার ও সর্বোপরি স্মার্ট অর্থনীতির সুফল দেশের সব নাগরিকের কাছে পৌঁছে দিতে বাজেটে উচ্চ মূল্যস্ফিতির লাগাম টেনে ধরার কৌশল নেয়া হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রাধান্য দেয়া হয়েছে টেকসই উন্নয়নে। টার্গেট জীবন মান উন্নয়নের মাধ্যমে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, রূপকল্প ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ এবং ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নসহ নির্বাচনী প্রতিশ্রæতি স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে স্মার্ট বাংলাদেশ ইশতেহারের শুরুতে ১১টি বিষয়ে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। এই ১১ দফায় এক নম্বরে স্থান পেয়েছে পণ্যের দাম সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার; বাজার মূল্য ও মানুষের আয়ের মধ্যে সঙ্গতি প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস। বাজেটে দেশে উৎপাদনের স্বার্থে বেশকিছু পণ্যে শুল্ক কমানো হচ্ছে। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বাজারে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে অন্তত ২৭ প্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্যশস্য সরবরাহের ওপর উৎসে কর কমানো হচ্ছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এসব পণ্যে উৎসে কর ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে। পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে- পেঁয়াজ, রসুন, মটর, ছোলা, চাল, গম, আলু, মসুর, ভোজ্যতেল, চিনি,

আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ডাল, ভুট্টা, ময়দা, আটা, লবণ, গোলমরিচ, এলাচ, দারচিনি, লবঙ্গ, খেজুর, তেজপাতা, পাট, তুলা, সুতা এবং সব ধরনের ফলসহ ৩০ পণ্য।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, সংকটের এই সময়ে গণমুখী বাজেট হয়েছে। দলের নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া অঙ্গীকার ও অগ্রাধিকার খাত বিবেচনায় নিয়ে বাজেট দেয়া হয়েছে। পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণেও ফোকাসটা থাকবে। বাস্তবসম্মত হয়েছে এই বাজেট।

এদিকে সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের ভিশন ২০৪১ সাল। স্মার্ট বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকবে ৩ শতাংশের কম। চরম দারিদ্র্য নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়। মূল্যস্ফীতি সীমিত থাকবে ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে। বাজেট ঘাটতি থাকবে জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত হবে ২০ শতাংশের উপরে। বিনিয়োগ উন্নীত হবে জিডিপির ৪০ শতাংশে। শতভাগ ডিজিটাল অর্থনীতি আর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক সাক্ষরতা অর্জিত হবে। সবার দোড়গোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যাবে। স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগ ব্যবস্থা, টেকসই নগরায়নসহ নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সব সেবা থাকবে হাতের নাগালে। তৈরি হবে পেপারলেস ও ক্যাশলেস সোসাইটি। আর এ সব কিছুর পেছনে মূল লক্ষ্য হবে সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক একটি সুখী সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই মেয়াদে সরকারে প্রথম বাজেটে স্মার্ট বাংলাদেশ প্রত্যয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আর সেই ‘স্মার্ট বাংলাদেশে’ মাথাপিছু আয় কমপক্ষে ১২ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। বাজেট পেশের সময় মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে বিশাল প্রত্যাশা দেখিয়েছেন মন্ত্রী। তার আশা অনুযায়ী, ২০৪১ সাল থেকে একজন বাংলাদেশি বছরে ১৪ লাখ ৬৬ হাজার ২৫০ টাকা আয় করবেন। যদিও বর্তমানে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৮৪ ডলার, গত অর্থবছরে যা ছিল ২ হাজার ৭৪৯ ডলার। ফলে বছরের ব্যবধানে ৩৫ ডলার বেড়েছে। বর্তমানে টাকার হিসাবে মাথাপিছু আয় ৩ লাখ ৬ হাজার ১৪৪ টাকা যা গত অর্থবছরে ছিল ২ লাখ ৭৩ হাজার ৩৬০ টাকা।

আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় নির্বাচনী প্রতিশ্রæতি কর্মোপযোগী শিক্ষা ও যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার সম্প্রসারণে সহায়ক নীতিমালা ও পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিজ্ঞানভিত্তিক যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী নতুন শিক্ষা কারিকুলাম তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের ১৬০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় কাজ করে যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ১১ অঙ্গীকারে আরো ছিল- আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলা, লাভজনক কৃষির লক্ষ্যে সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা, যান্ত্রিকীকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়ানো, দৃশ্যমান অবকাঠামোর সুবিধা নিয়ে এবং বিনিয়োগ বাড়িয়ে শিল্পের প্রসার ঘটানো, ব্যাংকসহ আর্থিক খাতে দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো, নি¤œ আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা সুলভ করা, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় সবাইকে যুক্ত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সাম্প্রদায়িকতা এবং সব ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ রোধ করা, সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুরক্ষা ও চর্চার প্রসার ঘটানো। সদ্য প্রস্তাবিত বাজেটে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সমাজবিজ্ঞানী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম ভোরের কাগজকে বলেন, বাজেট শুধুমাত্র দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় তুলে ধরে না; এটি বৈশ্বিকভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে পরিচয়-ঐতিহ্য-সক্ষমতা তুলে ধরে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার জনকল্যাণমুখী এবং মানব উন্নয়নমুখী। প্রস্তাবিত বাজেটে ইশতেহারের প্রতিফলন ঘটেছে। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই বাজেট। তিনি বলেন, যোগাযোগখাতে দেশে বৈপ্লবিক উন্নয়ন ঘটেছে। এখন প্রয়োজন মানব উন্নয়ন। এক্ষেত্রে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বিনিয়োগে জোর দিতে হবে। এজন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং তাদের উৎসাহ দেয়া প্রয়োজন।

অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বির আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশের দর্শনকে দর্পণে রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রতিটি খাতে আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী ভৌত, সামাজিক ও প্রযুক্তি অবকাঠামো বিনির্মাণের প্রতি জোর দেয়া হয়েছে। ফলে স্মার্ট সমাজ, স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট সরকার এবং সর্বোপরি স্মার্ট অর্থনীতির সুফল দেশের সব নাগরিকের কাছেও পৌঁছানো সম্ভব হবে। তিনি বলেন, গবেষণা, কারিগরি শিক্ষা, এবং কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসৃজন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলাসহ সরকারের অগ্রাধিকার খাতসমূহে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিতকরণ এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিক্রমাকে প্রাধান্য দিয়েই বাজেট করা হয়েছে।

বাজেটে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য এক লাখ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে সরকার। অন্যদিকে দেশে গড় প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এ গতি ধরে রাখার লক্ষ্যে কৃষি ও শিল্প খাতের উৎপাদন উৎসাহিত করতে যৌক্তিক সব সহায়তা অব্যাহত রাখা হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি মধ্যমেয়াদে তা বেড়ে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছাবে বলে আশা করছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে ১১টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। তিনি বলেন, উন্নত, সমৃদ্ধ, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে এ বছরের নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা যে অঙ্গীকার করেছি, সেগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কর্মক্ষম সবার জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান, কৃষির উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও শিল্পের প্রসার, উপযুক্ত স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার ইত্যাদি নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষের জীবনমানের সুরক্ষা দেয়া হবে। সর্বোপরি নির্বাচনী ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রæতিগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রাথমিক ভিত্তি রচনা হবে আমাদের এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য।