পাল্টে গেছে গ্রামীণ হাট: কৃষকের উঠান বা খেত থেকে সরাসরি পণ্য কিনছে ব্যবসায়ীরা

যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নে গ্রামীণ জনপদে বাজার ব্যবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। এখন আর কৃষকের উৎপাদিত কৃষিপণ্য কষ্ট করে মাথায় কিংবা ভ্যানে করে বাজারে নিয়ে যেতে হয় না। কৃষকের দোরগোড়ায় চলে যাচ্ছে পাইকার কিংবা ফড়িয়ারা। তারা বাড়ি-বাড়ি কিংবা কৃষকের মাঠ থেকেই ধান পাট আলু সবজি প্রভৃতি কৃষিপণ্য কিনে আনছে। ফলে বাজার এখন আর হাট ও আড়তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ছড়িয়ে পড়েছে গৃহস্থের উঠান থেকে গ্রামীণ সড়ক পর্যন্ত।

উত্তরের জেলাগুলোতে চলছে বোরো ধান কাটা মাড়াইয়ের ভর মৌসুম। কিছু এলাকাতে আবার ধান কাটা-বিক্রি শেষের দিকে। কৃষকের বাড়ি থেকে হাট বাজার মাঠ থেকে সদ্য আনা ধানের মনকাড়া গন্ধে চারদিক মাতোয়ারা।
কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এই ধান বিক্রি করতে কৃষককে এখন আর হাটের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। এখন প্রতিদিনই তাদের হাট। কেউ তাদের কাছে গিয়ে ধান কিনছেন, আবার আড়তে গিয়ে অনেক কৃষক ধান বিক্রি করে আসছেন। হাটের দিন না আসা পর্যন্ত ধান বিক্রি হবে না, আগের মতো এমন দুশ্চিন্তা আর কৃষকদের নেই। এতে সনাতনি ধারার সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুনত্ব।

সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে পাইকারদের ট্রাক, ব্যাটারি চালিত ভ্যান ও শ্যালো ইঞ্জিন চালিত ভ্যান সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে কৃষকদের দোরগোড়ায়। এতে কৃষকের উঠান থেকে পাইকার বা ফড়িয়াদের কাছে ধান বেচা-বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ। এমনকি মাঠ থেকে ধান কাটার পর সড়কে এনে সেখান থেকে ধান মাড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষকদের ধান বিক্রি হয়ে ট্রাকে উঠছে।

এতে আর্থিকভাবে কৃষকরা তেমন লাভবান না হলেও কৃষকরা বলেছেন, হাটে নিয়ে যেতে সময় ও নানা বিড়ম্বনা এখন তাদের পোহাতে হচ্ছে না। বিপরীতে ফড়িয়া ও ধান ব্যবসায়ী পাইকারদের তৎপরতাও সমানভাবে বেড়েছে।
শুধু ধানই নয়, সদ্য সমাপ্ত আলু মৌসুমেই দেখা গেছে একই চিত্র। কৃষকের উৎপাদিত আলু মাঠ থেকেই পাইকাররা কিনে নিয়ে গেছে। কৃষককে আর তার আলু বিক্রির জন্য হাটের জন্য অপেক্ষা করতে হয়নি। সবজির ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, কৃষক তার উৎপাদিত নানা সবজি খেত থেকে তুলে সড়ক কিংবা মহাসড়কের পাশে রেখে দিচ্ছেন। আর পাইকাররা ট্রাকে করে সেই সবজি একে একে কিনে নিয়ে গেছে। এতে দাম কিছুটা কম পেলেও ভোগান্তি দূর হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যোগোযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নের কারণেই বাজার ব্যবস্থায় এই পরিবর্তন এসেছে। দুর্ভোগ কমছে কৃষকদের। ধান কেনা-বেচা এখন শুধু হাটকেন্দ্রিক গ-ির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন তা হাট ও আড়ত থেকে ছড়িয়ে পড়ছে গৃহস্থের উঠান থেকে গ্রামের সড়ক পর্যন্ত।
কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে বগুড়াসহ উত্তরের জেলাগুলোতে বোরো ধান কাটা মাড়াইয়ের প্রায় অর্ধেক শেষ হয়েছে। দুই-একটি এলাকা ছাড়া সব এলাকার চিত্র একই। আগাম যারা আবাদ করেছেন, সেসব এলাকা ছাড়া সবখানেই কম- বেশি ধান কাটা মাড়াই একইভাবে চলছে। আবার কিছু এলাকায় আবার সবে ধান কাটা শুরু হয়েছে।

বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জানিয়েছেন, বগুড়ায় প্রায় ৫০ শতাংশ ধান কাটা মাড়াই হয়েছে। বগুড়ার গ্রাম পর্যায় ও উত্তরের বিভিন্ন জেলার চাল ব্যবসায়ী আড়তদারদের সঙ্গে কথা বলে ধান বিপণন ব্যবস্থার নতুন চিত্র উঠে এসেছে। কৃষকরা এখন আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সুফল পাচ্ছে।
কোন হাটে বা আড়তে কি দামে ধান কেনা-বেচা হচ্ছে, তা এখন হাতের মুঠোয়। এখন তারা শুধু হাট বারের ওপর ধান কেনা-বেচায় নির্ভর করেন না। ধানের পাইকার বা আড়তদাররা না গেলে ধানের নমুনা নিয়ে আড়তদারদের সঙ্গে যোগোযোগ করছেন কৃষকরা। আবার অনেক সময় পাইকার বা আড়তদার বা চালকলের প্রতিনিধি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।

ছোট চালকলগুলো কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনছেন আবার আড়তদার বা পাইকার বা ফড়িয়ারা কৃষকদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে যোগাযোগ করে প্রয়োজন অনুযায়ী ধান কিনছেন।
বগুড়ার দক্ষিণের শেষ উপজেলা নন্দীগ্রাম। নাটোর-বগুড়া মহাসড়ক থেকে গ্রামের পাকা রাস্তা ধরে কয়েক কিলোমিটার গেলেই দেখা মেলে প্রত্যন্ত গ্রাম কাথম। সেখানে গিয়ে দেখা গেল রাস্তার ধারে একটু খোলা জায়াগায় ধান ভরা বস্তার স্তূপ। পাশের দাসগ্রামের মোজাম্মেল বেপারী ট্রাক নিয়ে এসেছেন। তার লোকজন আগে থেকে ঠিক করা কৃষকদের বাড়ি-বাড়ি যাচ্ছেন ভ্যান ও ধান পরিমাপের স্কেল নিয়ে। ধান মাপার পর বস্তায় গৃহস্থের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা হচ্ছে মোজাম্মেল বেপারির কাছে।

কথা হয় বৃদ্ধ কৃষক মকবুল হাজী ও তার ছেলে আব্দুল খালেকের সঙ্গে। তারা জানালেন, ৪ বিঘা জমির ধানের মধ্যে ৩০ মণ ধান বিক্রি করছেন। আড়তের সঙ্গে দামের তেমন পার্থক্য নেই। আগে তারা হাটে গিয়ে ধান বিক্রি করতেন। এখন পাইকারের লোকজন বাড়ি থেকেই ধান কিনে নিয়ে যান। রাস্তা পাকা হওয়ায় বাড়ি- বাড়িতে এসে বেপারিদের ধান কেনার পরিমাণ বেড়েছে। এতে তাদের পরিশ্রম ও সময় বেঁচে যাচ্ছে।

কাথম পূর্ব পাড়ার আরেক কৃষক আব্দুল হাকিম জানালেন, ‘পাইকার বাড়িতে এসে ধান পছন্দ করার পর পাইকারের ভ্যান বাড়িতে এসে ৫৪ মণ ধান নিয়ে গেছে। এবার তার জমিতে কাটারি ধান ভালো হয়েছে। বিনা-৭ জাতের ধান পরে বিক্রি করবেন।’
গ্রাম থেকে ট্রাকসহ ধান কিনতে আসা মোজাম্মেল হক জানান, তিনি বগুড়া নওগাঁ ও বগুড়াসহ পাশর্^বর্তী জেলার মিলারদের ধান দেন। এক ট্রাকে প্রায় ২৫০ বস্তা ধান বহন করা চলে। গ্রামে এসে ওই ধান সংগ্রহের জন্য কৃষকদের বাড়িতে গিয়ে দর-দাম করার পর ধান নিয়ে যান।
তবে তিনি জানান, কৃষকদের বাড়ি থেকে ধান কিনলেও ২০ টাকা বস্তা হিসাবে খাজনা দিতে হয়। নিকটবর্তী কুন্দারহাটের ইজারাদারের লোকজন গ্রামের ভেতর মোটরসাইকেলে এসে ট্রাক থামিয়ে খাজনার টাকা আদায় করে।
একই ধরনের কথা বললেন কাহালু উপজেলার ভানসুন থেকে শাজাহানপুরের গোহাইল এলাকায় আড়তে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক আতিকুল ও রফিকুল। হাটের পরিবর্তে তারা রাস্তার পাশে আড়তদারের নিকট ধান বিক্রি করতে এসে জানালেন, কাহালু থেকে আসার পথে ভালসুন ও আতাইলের ইজারাদারদের লোকজন রাস্তায় খাজনা আদায় করে বস্তাপ্রতি ২০ টাকা।
আড়তদার আবু হানিফ জানান, হাটের কয়েক কিলোমিটার দূরে তার আড়ত হলেও খাজনা দিতে হয়।
তিনি আরও জানান, এখন আর হাটবার নয় সবসময়ই কৃষকরা তাদের নিকট ধান বিক্রি করতে পারেন। তিনি বিভিন্ন মিলার (চাউল কল) ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মিলে ধান দিয়ে থাকেন।
উত্তরাঞ্চলে চালকল মালিকদের নেতৃত্ব দেওয়া বিশিষ্ট ব্যবসায়ী লায়েক আলী জানান, কৃষকদের বাড়ি থেকে আগের তুলনায় ধান কেনা বেড়েছে। সড়ক যোগাযোগ ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় কৃষকদের সঙ্গে ধান ব্যবসায়ীদের যোগাযোগ বেড়েছে।
জয়পুরহাটের হিসনি বাজারের আরমান হোসেন চপল জানান, তার নিযুক্ত করা ৪০/৫০টি ভ্যানে কৃষকদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ধান আনা হয়। ঠাকুরগাঁও এর চাল ব্যবসায়ী বাদল জানান, ভ্যানে করে কৃষকদের বাড়ি থেকে ধান কিনে আড়তে বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা।
আগে কৃষকরা সরাসরি হাটে নিয়ে বিক্রি করত। এখন তাদের হাটে যাওয়া লাগছে না। কৃষকরা সপ্তাহের নির্দিষ্ট হাটের দিনের জন্য অপেক্ষা করতেন। এখন তারা ইচ্ছা করলে রাতেও ধান বিক্রি করতে পারেন। ছোট ছোট পাইকাররা কৃষকদের বাড়ি থেকে এমনকি মাঠ থেকেও ধান কিনে ভ্যানে করে আড়তে আনছেন। কৃষকদের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ধান সংগ্রহের পরিমাণ বেড়েছে। এতে আগের তুলনায় হাটে ধান কম আসছে। আড়তেই বেশি ধান আসছে।
বগুড়ার বুড়িগঞ্জ এলাকার ধান ব্যবসায়ী আলমগীর বলেন, কৃষকদের বাড়ি থেকে এলাকার চালকল মালিকরা গিয়ে ধান কিনছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগের মতো আর হাটে ধান ওঠে না। হাটের জায়গাও কমেছে। তবে খাজনা ঠিকই আদায় করা হয়।
বগুড়া কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাঠ ও বাজার পরিদর্শক আবু তাহের বলেন, ‘কৃষকের বাড়ি-বাড়ি থেকে ধান বেচা-কেনার প্রবণতা বাড়ছে। এতে কৃষকরা বাড়িতে ভেজা ধান নিয়ে দুর্ভোগের আশঙ্কা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন।’
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মতলেবুর রহমান বলেন, ‘কৃষকদের বাড়ি-বাড়ি থেকে ধান বিক্রি ভালো বিষয়। আগে এটি সীমিত ছিল তবে এখন এই প্রক্রিয়া বাড়ায় কৃষকদের বিপণন নিয়ে দুশ্চিন্তা না থাকলে উৎপাদনে উৎসাহ বাড়বে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হওয়ায় এটি সম্ভব হচ্ছে।’