আম চাষে সাফল্য

আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল হলেও সবচেয়ে জনপ্রিয় ফলের মধ্যে প্রথমেই আসে আমের নাম। গ্রীষ্মকাল মানেই মধুমাস। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, দেশী খেজুর, তরমুজ, বাঙ্গি, কলা, পেয়ারা, আনারস ও তালের শাঁসসহ নানা জাতের ফলে বাজার থাকে সয়লাব। এসব ফলের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য আম।  দেশের গন্ডি পেরিয়ে এখন বিদেশেও যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আম স্থানীয় বাজারের অর্থনীতিও সচল রাখছে। তথ্যে জানা যায়, দেশে ১৮টি দেশী ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বে দ্বিতীয়, আম উৎপাদনে সপ্তম, পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম, পেঁপেতে ১৪তম। ১০ বছর আগে বিশ্বে আম উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দশম।

 

পৃথিবীর শীর্ষ আম উৎপাদনকারী দেশগুলো হচ্ছে ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, মেক্সিকো, বাংলাদেশ, ব্রাজিল, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইন। আর প্রধান প্রধান আম আমদানিকারক দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি-আরব, যুক্তরাজ্য, স্পেন, মালয়েশিয়া, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, কানাডা, রাশিয়া, পর্তুগাল, থাইল্যান্ড ইত্যাদি।

বিদেশে বাংলাদেশের আম রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের দেশে সাধারণত মে মাস থেকেই আমের মৌসুম শুরু হয়। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে আম রপ্তানি আরও বৃদ্ধি পেলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে আম।
গত ১০ বছরে বাংলাদেশে আম চাষে ঘটে গেছে এক বিস্ময়কর বিপ্লব। এক দশক আগেও দেশে আমের উৎপাদন ছিল ১২ লাখ ৫৫ হাজার টন। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৭২ হাজার টনে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাবে গত ১৮ বছরে বাংলাদেশে বিশ্বেও অন্যন্যা দেশ থেকে বেশি হারে আমের চাষ বেড়েছে।

বছরে ১৬ শতাংশ হারে ফলটির উৎপাদন বাড়ায় মাথাপিছু ভোগের পরিমাণ ১০ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে আকাশপথে প্রায় ১ হাজার ৭৫৭ টন আম রপ্তানি হয়েছে। তথ্যমতে, বর্তমানে নিবন্ধিত আম রপ্তানিকারক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ৬৬টি, তারা প্রায় ২৮টি দেশে আম পাঠায়। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব ও ইতালিতে।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশী আমের বাজার ২০২১ সালে প্রায় ৫৭ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে, যা ২০১৬ সাল থেকে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজনেস রিসার্চ কোম্পানির মতে, আমের বাজার ২০২৬ সালে ৭৭ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রতিবছর আমের পরিকল্পিত বাগানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আর কৃষি বিভাগের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আমের গুণগত মান ঠিক রেখে আম সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণন করায় এর মানও ঠিক থাকছে। জানা যায়, ২০২১ সালে বিশ্বে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের আম রপ্তানি হয়েছে। রপ্তানিকৃত দেশের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে গত কয়েক বছরে।

অর্থাৎ প্রতিযোগিতার বাজারে রপ্তানি পণ্যের তালিকায় আম একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হয়ে উঠছে। তবে পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ এবং উৎপাদন পর্যায়ে আমের একটি অংশ নষ্ট হয়। এটি রোধ করা গেলে বা কমিয়ে আনতে পারলে আম রপ্তানি থেকে আয়ের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে। যদিও আম রপ্তানিতে এগিয়ে রয়েছে ভারত ও পাকিস্তান।

গত অর্থবছরে খিরসাপাতি, হিমসাগর, গোপালভোগ, লেংড়া, আ¤্রপালিসহ সাত জাতের আম রপ্তানি হয়। আর এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ২৯ হাজার ৪২৯ ডলারের ফ্রেশ এন্ড ড্রায়েড ম্যাংগো রপ্তানি হয়। এখানে চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদনের আম সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্যাকেজিং এবং তা ক্রেতাদের হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত আমের গুণগত মান ঠিক রাখা।

বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি অন্যতম প্রিয় ফল আম। প্রাচীনকাল থেকেই এই কৃষিপণ্য দেশের গ্রামে-গঞ্জে একটি নির্দিষ্ট মৌসুমে ফলের চাহিদা পূরণ করছে। এখন পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা আমের বাগানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমের উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত বহু মানুষের জীবন ও জীবিকা জড়িয়ে রয়েছে। তাছাড়া মৌসুম শেষেও প্রক্রিয়াজাতকৃত আমের বাজার থাকে বছরব্যাপী।

ভবিষ্যতে পরিকল্পিতভাবে ফলের রাজা আম কাজে লাগাতে সক্ষম হলে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়। বাংলাদেশে উৎপাদিত আমের তুলনায় রপ্তানির পরিমাণ খুবই কম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাব অনুযায়ী, দেশে গত বছর আম উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ২৭ লাখ টন। এবার এ উৎপাদন না বেড়ে বরং এক-তৃতীয়াংশ কমার শঙ্কা রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়া মূল কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ডিএই সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে গত বছর রেকর্ড তিন হাজার ৪৫ টন আম রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭৩ শতাংশ। সব শঙ্কা ছাড়িয়ে চলতি বছরেও বাংলাদেশের আম বিশ্ব বাজারে ব্যাপক অবদান রাখবে এটাই প্রত্যাশা।