গেটলক সিস্টেমে যানজটমুক্ত মহাখালী

রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে বনানীর কাকলী মোড় পর্যন্ত যানজট নিরসনে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে পরিবহন মালিক সমিতি ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে উত্তরাঞ্চলে ছেড়ে যাওয়া আন্তঃজেলা বাস বনানী রেলস্টেশন পর্যন্ত গেটলক থাকবে। পথিমধ্যে কোথায়ও দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলতে পারবে না।

বনানী রেলস্টেশন থেকে আবার পরবর্তী স্টপেজ কুর্মিটোলা, খিলক্ষেত, এয়ারপোর্ট ও আব্দুল্লাহপুর স্টপেজ ছাড়া মাঝপথে দাঁড়াতে পারবে না। বিআরটিএর সুনির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া যত্রতত্র দাঁড়িয়ে চালক যাত্রী তুলছেন কি না, সেটি কঠোরভাবে মনিটরিং করছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের প্রতিনিধি ও ট্রাফিক পুলিশ।

এতে কোনো চালক নতুন এই গেটলক চেকিং সিস্টেম ভঙ্গ করলেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে পরিবহন মালিক সমিতি ও পুলিশ। গত রবিবার এই সিস্টেম চালু কারার পর সোমবার সারাদিন মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া আন্তঃজেলা বাস এভাবে চলতে দেখা গেছে। তবে এর মধ্যেও জেনে আবার না জেনেই অনেক চালক যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলায় সোমবার ১৮টি এবং রবিবার ২৩টি মামলা দায়ের করেছে ট্রাফিক গুলশান বিভাগ।
রাজধানীতে যানজট প্রবণ স্থানগুলোর মধ্যে বনানীর কাকলী একটি। এমনটি চিহ্নিত করার পর নতুন এই সিস্টেমে আন্তঃজেলা বাস চলাচলের সিদ্ধান্ত নেয় ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ ও মালিক পরিবহন সমিতির নেতারা। এই উদ্যোগের ফলে এই এলাকার যানজট নিরসন হলে পরবর্তীতে মহাখালী থেকে উত্তরা পর্যন্ত এই সিস্টেম বৃদ্ধি করারও পরিকল্পনা রয়েছে।
গেটলক এই সিস্টেমের জন্য বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে পরিবহন মালিক সমিতি। মহাখালী থেকে বাস ছাড়ার আগে যাত্রীদের তালিকা, টিকিট, চালকের নাম, গাড়ির নম্বরসহ একটি প্রস্থানপত্র দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট পরিবহনের কাউন্টার থেকে যাত্রীর সংখ্যা গুনে এই প্রস্থানপত্র দেওয়া হয়।

বাস কাকলীতে যাওয়ার পর পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে, তালিকা অনুযায়ী যাত্রী আছে কি না। পরিবহন মালিকদের প্রতিনিধি, পরিবহন শ্রমিকদের প্রতিনিধি, মালিক ও শ্রমিকদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কমিউনিটি পুলিশ এভং ভলান্টিয়াররা প্রস্থানপত্র চেক করেন। কাকলীর চেকিং পোস্টে প্রস্থানপত্র দেখে যাত্রীর সংখ্যা বেশি পেলেই চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় পরিবহন মালিক সমিতি। পুলিশও সেখানে উপস্থিত হয়ে এসব চেক করছেন। এ ছাড়া মাঝ পথে পুলিশের টিম যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করানোর বিষয়টিও মনিটরিং করেন।
জানতে চাইলে মহাখালী বাস টার্মিনাল মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ মো. আবুল কালাম জনকণ্ঠকে বলেন, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মহাখালী টার্মিনাল থেকে হাজারের বেশি বাস যাত্রী নিয়ে বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। কিন্তু টার্মিনালটা উল্টো পড়ে গেছে। পূর্ব পাশের টার্মিনাল থেকে বাস ঘুরে বনানী হয়ে যেতে হয়। টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া সব বাস বনানী পর্যন্ত যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করায়।

এর ফলে যানজট তৈরি হয়। এ সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। সম্প্রতি আমরা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান ও গুলশান ডিভিশনের ট্রাফিকের উপ-কমিশনার আব্দুল মোমেনসহ শ্রমিক ফেডারেশনের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করি।

এতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, মহাখালী থেকে ছেড়ে যাওয়া কোনো বাস বনানী পর্যন্ত কোনো যাত্রী ওঠাবে না। এর মাধ্যমে এই এলাকায় যানজট নিরসন হবে। মহাখালী থেকে ছেড়ে যাওয়া গাড়িগুলোতে যাত্রীদের তালিকা, ড্রাইভারের নাম ও গাড়ির নম্বরসহ একটি ‘প্রস্থান পত্র’ দেওয়া হবে। পরে বনানীতে আমাদের সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্তরা সেখানে দেখবেন যে যাত্রীর সংখ্যা সঠিক আছে কি না।
কোনো চালক এই নিয়ম অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি কোন পরিবহন মালিক যদি চালককে মাঝ পথ থেকে যাত্রী তুলতে প্ররোচিত করে, তাহলে সে পরিবহনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চালক প্রথমবারের মতো এবং একবার এই নিয়ম ভঙ্গ করলে সে কোনো কাজ করতে পারবে না।

কাকলীর চেকিং পোস্টে বিনা পারিশ্রমিকে তাকে ডিউটি করতে হবে। দ্বিতীয়বার নিয়ম ভঙ্গ করলে তিন দিন ডিউটি করতে হবে। তৃতীয়বার করলে সাময়িকভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বহিষ্কার করা হবে। একইভাবে কোনো মালিক যদি রাস্তা থেকে যাত্রী তুলতে চালককে প্ররোচিত করে এবং সেটি প্রমাণ হলে বাস চলাচল সাময়িক বন্ধ থাকবে। দ্বিতীয়বার একই মালিক এমনটি করলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাস চলাচল বন্ধ রাখা হবে।

এত কিছুর পরও যত্রতত্র যাত্রী তোলা বন্ধ এবং শৃঙ্খলা ফিরবে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে আবুল কালাম বলেন, আমরা আশা করি ঠিক হবে। তবে এই নিয়ম আগেও ছিল। বিআরটি প্রকল্প এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজের সময় এটি বন্ধ রাখা হয়।
সোমবার সরজমিনে দেখা যায়, মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে উত্তরাঞ্চলে ছেড়ে যাওয়া আন্তঃজেলা বাসগুলো কাকলীর আগ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে না। ট্রাফিক গুলশান বিভাগ যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী না তোলার অনুরোধ করে মাইকিং করছেন। কিছুক্ষণ পরপরই ট্রাফিক পুলিশের টিম রয়েছে।

সেখানে কয়েকজন কনস্টেবল ও সার্জেন্ট দায়িত্ব পালন করছেন। কোনো বাস গেটলক নিয়ম ভঙ্গ করলেই তাকে মামলা দেওয়া হচ্ছে। ট্রাফিক গুলশান বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বিষয়টি মনিটরিং করেন। তবে কয়েকটি বাস যাত্রীর আশায় এই দূরত্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
তবে এই সিস্টেম চালু হওয়ায় সাধারণ মানুষও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। ওই রুটে চলাচলকারী যাত্রীরা বলছেন, মহাখালী থেকে জামালপুর সদর যেতে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা লাগে। কিন্তু বাসস্টেশন আর মহাখালী ছাড়তে কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় নেন। এরপর আমতলী, চেয়ারম্যানবাড়ি, সৈনিক ক্লাব ও কাকলী পর্যন্ত আরও এক ঘণ্টা যাত্রী নেওয়ার চেষ্টা থাকে। বাসের গতিও কম থাকে।

ফলে ঢাকার এক অংশেই প্রায় দুই ঘণ্টা চলে যায়। আর নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পাঁচ থেকে সাড়ে ছয় ঘণ্টাও লেগে যায়। গেটলক সিস্টেম চালুর ফলে এমন ভোগান্তিতে আর যাত্রীরা পড়বে না। নিরবচ্ছিন্নভাবে যাত্রাপথে ভ্রমণ করতে পারবে সবাই।
ট্রাফিক গুলশান দক্ষিণের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) এ এস এম হাফিজুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, সব পরিবহনের মালিকরা তাদের চালককে নতুন এই নিয়মের কথা জানিয়েছেন। তবে এখনো অনেক চালক বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেননি। তারা যাত্রী তোলার আশায় দাঁড়ান। আবার অনেক যাত্রীও এই বিষয়টি জানেন না।

তখন তাদের বুঝিয়ে বলা হয় সুনির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া আন্তঃজেলা বাস থামবে না। তাদের হয় মহাখালী টার্মিনাল থেকে না হয় কুর্মিটোলা স্টপেজ থেকে বাসে উঠতে হবে। তিনি বলেন, গেটলক চেকিং সিস্টেম চালুর পর আইন অমান্য করে যত্রতত্র যাত্রী তোলায় রবিবার ২৩টি এবং সোমবার ১৮টি বাসের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

ট্রাফিক গুলশান বিভাগ প্রতিনিয়ত গেটলক সিস্টেম তদারকি করবে। কোনো পরিবহন এই নিয়ম অমান্য করে যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Views: 17