খাগড়াছড়ির পাহাড়ে কফির আবাদ, সম্ভাবনার হাতছানি

‘২০২১ সালে কফি চাষ শুরু করি। বর্তমানে পাঁচ একর জমিতে কফির বাগান রয়েছে। প্রথম বছরে লাগানো চারাগুলোর মধ্যে ৫০০ থেকে ৬০০ চারায় কফি আসে। সেই গাছগুলো থেকে পাঁচ থেকে ছয় কেজি কফি সংগ্রহ করি। এক কেজি কফি ব্লেন্ড করে পাউডার করেছি। এই কফির স্বাদ ও ঘ্রাণ বাজারের প্রচলিত কফির চেয়ে অনেক ভালো। বর্তমানে বাগানের প্রায় পাঁচ হাজার গাছের সবগুলোতেই ফুল এসেছে। বাগানটি এখন ফুলে ফুলে পূর্ণ। আশা করছি, এ বছর কফির ভালো ফলন পাওয়া যাবে।’

সারাবাংলাকে কথাগুলো বলছিলেন পাবর্ত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার মরাটিলা গ্রামের ননী গোপাল ত্রিপুরা। পাহাড়ের স্থানীয় এই বাসিন্দা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি পৈত্রিক সম্পত্তিতে গড়ে তুলেছেন কফির বাগান।

সম্ভবনাময় এই ফসল নিয়ে এখন স্বপ্ন বুনছেন ননী গোপাল। আরও অনেকেই সেই সম্ভাবনার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে কফি চাষ অনেক সম্ভাবনাময়। আমার দেখাদেখি এই এলাকার অনেকেই কফি চাষে এগিয়ে এসেছেন।’

দেশে কাজুবাদাম ও কফির আবাদ বাড়াতে কয়েক বছর আগে ‘কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অধীন এ প্রকল্পের আওতায় চলছে প্রর্দশনী, দেওয়া হচ্ছে নানা সহায়তা।২০২১ সালের জুনে শুরু হওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটির কাজ ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পার্বত্য অঞ্চলের তিন জেলার ২৫টি উপজেলাসহ অন্যান্য উপযোগী এলাকায় কফি ও কাজুবাদাম চাষ সম্প্রসারণ, উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রক্রিয়াজাত ও বিপণনের মাধ্যমে কৃষকের আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং আর্থসামাজিক অবস্থার টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য রয়েছে। পাহাড়ের অনাবাদি জমিকে আবাদযোগ্য করে তোলাও এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। এ প্রকল্পের আওতায় কফির চারা ও সারসহ বিভিন্ন সহায়তা পেয়ে আসছেন খাগড়াছড়ির ননী গোপাল ত্রিপুরাও।

পৈত্রিক ৫ একর জমিতে কফির বাগান গড়ে তুলেছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ননী গোপাল ত্রিপুরা। পাহাড়ের আদি এই বাসিন্দা একইসঙ্গে আম ও কফির বাগান করেছেন। ননী গোপাল বলেন, ‘প্রকল্প শুরু হওয়ার প্রথম দিকে, অর্থাৎ ২০২১ সালে স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শ ও সহযোগিতায় এ অঞ্চলে আমিই প্রথম কফি চাষ শুরু করি। প্রকল্পের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে কফির চারা ও সার দেওয়া হয়। বাগান পরিচর্চার জন্য আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়। এলাকায় আগে কখনো কফি চাষ দেখিনি। আমাদের ভারত থেকে কফির চারা এনে দেওয়া হয়। দেশে কফি চাষের সম্ভাবনা অনেক। এ ছাড়া আম ও কলা বাগানে একইসঙ্গে কফি চাষ করা যাচ্ছে। এ কারণেই কফি চাষে এগিয়ে এসেছি।’

ননী গোপাল আরও বলেন, ‘কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসেছিলেন। তারা জানিয়েছেন, আকিজ গ্রুপ এখানে বাণিজ্যিকভাবে কফি প্রক্রিয়াজাত করবে। কফি চাষে বেশ লাভ হবে বলে প্রত্যাশা করছি। ইউটিউবে অনেক ভিডিওতে দেখেছি, সমতলে যারা কফি চাষ করছে তারা প্রতি কেজি কফির পাউডার দুই হাজার টাকায় বিক্রি করছে। প্রথম বছরে আবাদ করা কফির চারা থেকে যে পাঁচ-ছয় কেজি কফি ফল পেয়েছি, তা ব্লেন্ড করে এক কেজির মতো পাউডার করেছি। দেশীয় এই কফির স্বাদ ও ঘ্রাণ বেশ ভালো। বাজার থেকে কিনে আমরা যে কফি খাই তার চেয়ে এই কফির স্বাদ ও ঘ্রাণ অনেক ভালো।’

প্রথম বছর তথা ২০২১ সালে দুই হাজার কফির চারা লাগিয়েছিলেন ননী গোপাল ত্রিপুরা। এর মধ্যে পাঁচ থেকে ছয় শ গাছে ফল আসে গত বছর। এর আগে কখনো তারা কফি গাছ বা ফল দেখেননি। তাই কিছু ফল এখনো সংগ্রহে রেখে ছিলেন ননী। জানালেন, এরপর ধীরে ধীরে কফির পাঁচ হাজার চারা লাগিয়েছিলেন বাগানে।

ননী গোপাল বলেন, ‘বাগানে থাকা গাছগুলোর স্বাস্থ্য খুবই ভালো। প্রায় সব গাছেই ফুল এসেছে। যেহেতু গাছের বয়স ২ থেকে আড়াই বছর হয়ে গেছে, তাই এখন আর ফুল ভেঙে দিতে হবেনা। সবগুলো গাছেই হয়তো ফল আসবে। আগামী বছর থেকে আশা করি আরও বেশি হারে ফলন পাওয়া যাবে।’

মূলত দেশে কফির চাহিদা ও দাম বেশি থাকায় ফসলটি আবাদে অন্য চাষিরাও এগিয়ে আসছেন বলে জানাচ্ছেন ননী। তিনি বলেন, ‘এই এলাকায় আমি প্রথমে কফি চাষ শুরু করি। এখন আরও পাঁচ থেকে ছয়জন কৃষক কফি চাষে যুক্ত হয়েছে।ন এখানে কফি চাষ ধীরে ধীরে আরও বেশি হারে ছড়িয়ে পড়বে।’

জানতে চাইলে পানছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম মজুমদার সারাবাংলাকে বলেন, ‘ভূমি বা আবহাওয়ার কারণে কাজুবাদামের চেয়ে কফি এখানে বেশি জনপ্রিয়। এ ছাড়া আন্তঃফসল হিসেবে আম বাগান বা কলা বাগানেই কফি চাষ করা যাচ্ছে। আবাদ করতে গিয়ে নতুন জমির প্রয়োজন পড়ছে না। ফলে এই এলাকায় কফি চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।’

পানছড়িতে কফির আবাদের বিস্তৃতির তথ্য জানিয়ে এই কৃষি কর্মকতা বলেন, ‘এখানে ১৩৮ জন কৃষকের ১৯০ হেক্টর জমিতে ২৪৫টি কফির প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছে। বিনামূল্যে প্রায় ৪৫ হাজার কফির চারা দেওয়া হয়েছে কৃষকদের। এলাকাটি পাহাড়ি হওয়ায় এখানে পানির সংকট রয়েছে। সে কারণে প্রকল্প থেকে ২০ টি বাগানে সোলার ড্রিপ সেচ কাঠামো স্থাপন করা হয়েছে।’

নাজমুল ইসলাম মজুমদার আরও বলেন, ‘প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে, এখানকার কৃষকরা এখন ব্যক্তি উদ্যোগেই কফি চাষে এগিয়ে আসছেন। তারা নিজেদের জমিতে কফির বাগান গড়ে তুলছেন। বর্তমানে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রায় ২০ জন কৃষক তাদের ১৫ হেক্টর জমিতে কফি চাষ করছেন। প্রতিনিয়তই এখানে কফির আবাদ বাড়ছে। আমাদের লক্ষ্য ছিল কফি উদ্যোক্তা তৈরি করা, সেটি এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। কফি প্রক্রিয়াজাতকরণ শুরু হলে এই অঞ্চলে তা আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠবে।’

এদিকে খাগড়াছড়ির আলুটিলা পাহাড়ে প্রায় আট একর পতিত জমিতে কাজুবাদাম ও কফির বাগান গড়ে তুলেছেন সঞ্জয় দেবনাথ। প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে মিশ্র ফল বাগানে বিভিন্ন ধরনের ফলের আবাদ করে আসছেন তিনি। আম ও লিচুতে মুনাফা কম হওয়ায় কাজুবাদাম ও কফি চাষে ঝুঁকেছেন।

সঞ্জয় দেবনাথ সারাবাংলাকে বলেন, ‘গত বছর প্রায় আট একর জমিতে কাজুবাদাম ও কফির চারা লাগিয়েছি। দুটি ফলে পাঁচ হাজার করে ১০ হাজারের মতো চারা লাগিয়েছি। এ বছরই ফুল এসেছে। আবাদ খুব ভালো হয়েছে। বাগান দেখতে খুব সুন্দর লাগছে। এক বছরের মধ্যে বাগানটি খুব গর্জিয়াস হয়ে উঠেছে।’ কফি আবাদের জন্য স্থানীয় কৃষি অফিসের পরামর্শ থেকে শুরু করে চারা, সার ও অন্যান্য উপকরণ সহায়তা পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।

জানতে চাইলে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুক্তা চাকমা বলেন, ‘খাগড়াছড়িতে আমরা কাজুবাদাম ও কফির প্রায় ১০০ প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করেছি। আমরা বাগানগুলোতে বাণিজ্যিক ও জাত প্রদর্শনী করেছি। বাগানগুলোতে জাত প্রদর্শনী হিসেবে ৮০টি ও বাণিজ্যিক প্রদর্শনী হিসেবে ৬২৫টি কাজুবাদামের চারা দিয়েছি। আর জাত প্রদর্শনী হিসেবে কফির ১৩৫টি ও বাণিজ্যিক প্রদর্শনী হিসেবে এক হাজার ১২৫টি চারা দিয়েছি। এর মধ্যে কফির কিছু চারা মারাও গেছে। সেখানে আবার নতুন চারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। তবে মারা যাওয়া স্থানগুলোতে কফির চারা এখনো পরিপক্ক হয়নি।’

মুক্তা চাকমা বলেন, ‘কফিতে দুইবার ফুল হয়। আশা করি এবার ভালো ফলন আসবে। তবে বেশির ভাগ কাজুবাদামের বাগানে ফুল এসেছে। আমাদের এলাকাটি পর্যটননির্ভর। এরই মধ্যে কৃষকরা কফি শপ খোলার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। কাজুবাদাম ও কফি প্রসেসিংয়ের ব্যবস্থা করা গেলে এই অঞ্চলে কাজু ও কফি চাষ বেশ সম্ভাবনময় হয়ে উঠবে।’

‘কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কাজুবাদাম ও কফি আবাদ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। প্রকল্পের আওতায় পাহাড়ি এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজুবাদাম ও কফির আবাদ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। কৃষকরাও খুব আগ্রহ প্রকাশ করছেন। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিদেশে কাজুবাদাম ও কফি রফতানির সম্ভাবনাও রয়েছে। আমরা সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলছি।’


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস সারাবাংলাকে বলেন, ‘দুই বছর আগে যে কফির চারাগুলো লাগানো হয়েছিল, সেই গাছগুলো এখনো ছোট। তবে এরই মধ্যে ফল আসতে শুরু করেছে। গত বছর আমরা সবচেয়ে বেশি কফির চারা লাগিয়েছি। দুই বছর পর থেকে এ গাছগুলোতে ফল আসতে শুরু করবে। দেশে উৎপাদিত কফির স্বাদ গুণে-মানে চমৎকার। প্রধানমন্ত্রীও খেয়েছেন, দেশের এই কফি খেয়ে তিনি মুগ্ধতাও প্রকাশ করেছেন। সব মিলিয়ে দেশে কফি চাষ খুব সম্ভাবনাময়।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য বলছে, প্রকল্প শুরুর আগে দেশে ৫০ হেক্টর জমিতে কফির আবাদ হতো। উৎপাদন ছিল চার থেকে পাঁচ টন। সেখানে এখন প্রায় ১৬০০ হেক্টর জমিতে কফির আবাদ হচ্ছে। উৎপাদন উন্নীত হয়েছে ১০ থেকে ১২ টনে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কফি গাছগুলো মূলত দুই-তিন বছর পর থেকে ফল দিতে শুরু করে। পরিপূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত গাছের বয়স যত বাড়বে, আবাদও তত বাড়ে। গাছগুলো ৪০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত ফল দিতে সক্ষম। সে হিসেবে কফির ফলনে প্রকল্পের সুফল মিলতে শুরু করবে এ মৌসুম বা পরের মৌসুম থেকে।

Views: 5