বাঙালির আত্মপরিচয়

ড. আবদুল খালেক

বাঙালি জনগোষ্ঠী একটি মিশ্র জনগোষ্ঠী, বাংলা ভাষা একটি মিশ্র ভাষা, বাঙালি জাতি একটি মিশ্র জাতি। এই মিশ্র বাঙালি জাতির সন গণনায় যদি কিছু মিশ্রণ ঘটেই থাকে তাতে লজ্জার কিছু নেই। এই মিশ্রণ আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনায় প্লাবিত করেছে। বাংলা সন বাঙালি জাতির ভিতকে মজবুত করে দিয়েছে। বাংলা সন বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়কে করেছে সুদৃঢ়। এটিই বাংলা সনের বড় অর্জন

বাঙালি জাতি এবং বাংলা নববর্ষ অভিন্ন। হাজার বছরের ইতিহাস পাঠে জানা যায় হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান যাদের মাতৃভাষা বাংলা, তারা সবাই নিজেদের বাঙালি বলেই পরিচয় দিয়েছেন। বাঙালির সে পরিচয় এখনো অব্যাহত রয়েছে। ধর্মে ভিন্নতা থাকলেও বাঙালি জাতি এক, বাঙালির নববর্ষ এক। প্রাচীন ইতিহাসের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হবে বিষয়টি। বাঙালি জাতি মূলত ভাষাকেন্দ্রিক জাতি।

অতি প্রাচীনকালে ‘বং’ ভাষাভাষি এক জনগোষ্ঠী যে এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিল, সেই এলাকা ধীরে ধীরে পরিচিতি লাভ করে ‘বং’ জনপদ নামে। ‘বং’ জনপদের পাশাপাশি আরও কিছু জনপদ গড়ে উঠেছিল যেমনÑ গৌড়, রাঢ়, পু-্র, তাম্রলিপ্ত, সুম্ম, সমতট ইত্যাদি। জনপদগুলোর মধ্যে এক সময় আধিপত্য বিস্তারের লড়াই ছিল। শক্তির বিচারে ‘বং’ জনপদ ধীরে ধীরে অন্য জনপদগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তারে সমর্থ হয়। কালের গতিধারায় এক পর্যায়ে ‘বং’ জনপদ অন্যান্য জনপদকে আত্তীকরণ করে নেয়।

দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে মুসলমানদের ভারত দখলের আগে ভারতবর্ষে শাসন ক্ষমতায় যারা অধিষ্ঠিত ছিলেন খ্রিস্টপূর্ব কয়েক শ’ বছর আগে থেকে যদি হিসাব করা যায় তাহলে দেখা যাবে কালানুক্রমিকভাবে যারা এদেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন তারা হলেন অশোক রাজ, কুষাণ রাজ, গুপ্ত রাজ, পাল রাজ, সেন রাজ ইত্যাদি। কথিত আছে, ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম লিপির উদ্ভব ঘটে অশোক শাসনকালে। অশোক আমলের লিপির নাম ব্রাহ্মীলিপি।

ভারতীয় উপমহাদেশে যতরকম লিপির জন্ম হয়েছে, তার মূলে রয়েছে ব্রাহ্মীলিপি। বাংলা লিপিও যে ব্রাহ্মীলিপি থেকে জন্মলাভ করেছে, ইতিহাসে তা স্পষ্ট লিপিবদ্ধ রয়েছে। নতুন একটি লিপি উদ্ভাবনের জন্য যে ধরনের মেধা ও পা-িত্যের প্রয়োজন, বাঙালিদের মধ্যে সেই মেধা ও পা-িত্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব তখন ছিল। অশোকের আমল থেকেই বাঙালি প-িতদের মধ্যে জ্যোতিষশাস্ত্র এবং গণিত শাস্ত্রের ব্যাপক চর্চা হতে থাকে। যে বাঙালি প-িতেরা বাংলা লিপির জন্ম দিতে পেরেছে, সেই অঞ্চলের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নিজেদের সন, তারিখ, বর্ষ, তিথি গণনা করতে পারেননি- এমন কথা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।

বর্তমানকালে আমরা যে বাংলা মাসের নাম ব্যবহার করি, ভারতবর্ষে মুসলমানদের আগমনের হাজার বছর আগেই এ দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সে নামগুলো নির্ধারণ করেছিলেন। নামগুলো তারা নির্ধারণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন চন্দ্র, সূর্য ও নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যালোচনার মাধ্যমে। তবে এ কথা ঠিক, যুগে যুগে বাংলা বর্ষপঞ্জির নানা সংস্কার ঘটেছে। বিশেষ করে বাংলার শাসক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা বর্ষপঞ্জির পরিবর্তন একটি গতানুগতিক বিষয়। প্রাচীন বঙ্গদেশ প্রাচীন ভারতেরই অংশবিশেষ।

কাজেই ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের মিল থাকবেই। প্রাচীন ভারতীয় বর্ষপঞ্জির দিকে তাকালেই আমরা নানারকম সন বা অব্দের সন্ধান পাই যেমনÑ শ্রীহর্ষাব্দ, বিক্রমাব্দ, শকাব্দ, বল্লভাব্দ, গুপ্তাব্দ ইত্যাদি। নবম শতাব্দীর পর থেকে প্রায় সব প্রস্তর বা তাম্রফলকে লিখিত উৎকীর্ণ এই অব্দের মাধ্যমে প্রকাশ হতো। বাংলার প্রায় সমগ্র অঞ্চল গুপ্ত আমলে তাদের সাম্রাজ্যাধীন থাকায় বাংলা অঞ্চলে গুপ্তাব্দ দীর্ঘকাল প্রচলিত ছিল। গুপ্তদের শাসনকাল শেষ হওয়ার পর এ দেশ শাসন করেছে পাল এবং সেনেরা। তাঁদের শাসনকালেও বর্ষপঞ্জির নানা সংস্কার করা হয়েছে।

লক্ষণ সেনের রাজত্বকালে লক্ষণাব্দ নামে একটি অব্দ স্বল্পকাল প্রচলিত ছিল। বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক বঙ্গ বিজয়ের পর প্রকৃত অর্থে সর্ববঙ্গীয় কোনো অব্দ বাংলায় প্রচলিত ছিল না। রাজকীয় কাজে হিজরি সন ব্যবহৃত হতো। তবে বাংলা ভাষাভাষি জ্ঞানী- গুণীজন তাঁদের লেখা ও জ্ঞানচর্চায় শকাব্দ ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিলেন।
মোঘল সম্রাট আকবর রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে আমাদের বঙ্গাব্দ উপহার দিয়েছেনÑ এমন কথা অনেকেই বলে থাকেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিজস্ব নববর্ষের কোনো উৎসব ছিল না। ১ বৈশাখ বাঙালির নববর্ষের উৎসবকে পশ্চিম পাকিস্তানিরা হিন্দুদের উৎসব বলে গণ্য করতো। ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১ বৈশাখে নববর্ষের উৎসব পালন করতে গিয়ে নানারকম বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

বাংলা সনের প্রতিষ্ঠাতা যে বাদশাহ আকবর এ কথা পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকবর্গ কখনো মেনে নিতে পারেনি। এই পর্যায়ে বাঙালি কিছু প-িত ব্যক্তি পশ্চিম পাকিস্তানিদের বোঝাতে চেষ্টা করেন বাংলা সন প্রকৃতপক্ষে হিন্দুদের নয়, বাংলা সনের জন্মদাতা একজন মুসলিম বাদশাহ।
তবে এ কথা সত্য, প্রাচীন গুপ্ত শাসনকাল থেকে বাংলা সনের যাত্রা শুরু হলেও মোঘল সম্রাট আকবরের শাসনকালে বাংলা সনের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। সম্রাট আকবরের প্রিয়পাত্র আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’ থেকে জানা যায়, প্রাচীন ভারতে বিক্রমজিত নামে একজন নরপতি ছিলেন। তিনি সিংহাসনে আরোহণের দিন থেকে একটি নতুন অব্দের প্রচলন করেছিলেন। সম্রাট আকবরের রাজত্বের ৪০তম বছরে ঐ সালটি ১৫১৭ অব্দ চলছিল।

সম্ভবত এই প্রাচীন সালটিই আমাদের বর্তমান বাংলা সনের উৎস। হিজরি সনের সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষার একটা প্রচেষ্টাও এতে থাকতে পারে। তবে চান্দ্র মাসের হিসাবের গরমিল থেকে একে মুক্ত করা হয়েছে। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য, একটি ফসলি সন প্রচলনের উদ্দেশেই সম্রাট আকবর এ সংশোধিত সনটির প্রবর্তন করেন। বাংলা অগ্রহায়ণ মাসটি থেকে এ কথার সত্যতা অনুভূত হয়। বর্তমানকালে বাংলাদেশে বৈশাখ থেকে বছর গণনা শুরু হলেও এককালে তা শুরু হতো অগ্রহায়ণ মাস থেকে।
বিশাখা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম বৈশাখ। জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম জ্যৈষ্ঠ, শ্রবণা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম শ্রাবণ, ভদ্রা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম ভাদ্র, অশ্বিনী নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম আশ্বিন, কৃত্তিকা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম কার্তিক, প্রুষ্যা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম পৌষ, মঘা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম মাঘ, ফাল্গুনি নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম ফাল্গুন, চিত্রা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম চৈত্র।

হিজরি মাসের নামের সঙ্গে বাংলা মাসের নামকরণের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। হিজরি মাসের নামকরণের তুলনায় বাংলা মাসের নামকরণ অনেক প্রাচীন তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বঙ্গাব্দের সঙ্গে আকবর প্রবর্তিত ‘তারিখ-ই-ইলাহি’র সম্পৃক্ততা সকলেই মেনে নিয়েছেন, এমন কথা বলা যাবে না। বেশ কিছু ইতিহাসবিদ, গবেষক বঙ্গাব্দের উৎস নিয়ে ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন।
কেউ কেউ অবশ্য সম্রাট আকবরকেই বঙ্গাব্দের প্রবর্তক বলে মনে করেন। রাজ্য শাসনে আকবর যে অসাধারণ প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা প্রদর্শন করেছিলেন, তা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। রাজ্য পরিচালনার স্বার্থে, খাজনা আদায়ের প্রয়োজনে তিনি প্রচলিত পঞ্জিকার সংস্কার করতেই পারেন। আর সে সংস্কার শুধু বাংলা অঞ্চলের জন্য করবেন, তা মনে করার কোনো কারণ নেই।

সম্রাট আকবর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধা বিবেচনায় বাংলা সনসহ আরও কয়েকটি নতুন সনের প্রবর্তন করেন বা সৌর সনে রূপান্তরিত করেন। তৎকালীন নিয়মানুসারে ফসলের মাধ্যমে রাজকর পরিশোধ করা হতো। তাই সন প্রতিষ্ঠাকালে ফসলের মৌসুমের দিকে বিশেষ নজর রাখা হয়েছিল বলে এগুলোকে ‘ফসলি সন’ বলা হতো। বাংলা সনও ছিল মূলত ফসলি সন। বাংলা সনের সময়ে সম্রাট আকবরের নির্দেশে প্রথম ‘ইলাহি সন’ নামে একটি সনের প্রবর্তন করেন।

যতদূর জানা যায়, এটি ছিল তাঁর রাজ্য সন। ‘আইন-ই-আকবরী’ থেকে জানা যায়, সম্রাট আকবর এমন একটি ত্রুটিমুক্ত বিজ্ঞানসম্মত সৌর সনের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের কাছেই গ্রহণযোগ্য হবে। বাংলা সনের মাধ্যমে তাঁর সে আকাক্সক্ষা পূরণ হয়েছিল বলে মনে করা যেতে পারে। কেননা, বাংলা যেমন ‘হিজরি’ সন নয়Ñ তেমনি এটি ‘ইলাহি’ সন থেকেও ভিন্ন।

হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করা হলেও এর গঠন পদ্ধতি ভারতীয় শকাব্দের মতো, অথচ এটি শকাব্দেরও সমগোত্রীয় নয়। শকাব্দের সঙ্গে এর সম্পর্ক এতটুকু যে, এর মাস ও দিনের নাম শকাব্দ থেকে গৃহীত হয়েছে। মাস এবং দিনের নামকরণে হিজরি এবং ইলাহি মাস দিনের সঙ্গে বাংলা সনের মাস ও দিনের কোনোরকম মিল নেই।
বাঙালি জনগোষ্ঠী একটি মিশ্র জনগোষ্ঠী, বাংলা ভাষা একটি মিশ্র ভাষা, বাঙালি জাতি একটি মিশ্র জাতি। এই মিশ্র বাঙালি জাতির সন গণনায় যদি কিছু মিশ্রণ ঘটেই থাকে, তাতে লজ্জার কিছু নেই। এই মিশ্রণ আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনায় প্লাবিত করেছে। বাংলা সন বাঙালি জাতির ভিতকে মজবুত করে দিয়েছে। বাংলা সন বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়কে করেছে সুদৃঢ়। এটিই বাংলা সনের বড় অর্জন।

লেখক : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), সাবেক উপাচার্য, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী

 

Views: 2