নারায়ণগঞ্জে মসলিনের পুনরুত্থান

প্রায় ২০০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী মসলিন শাড়ি আবার ফিরে এসেছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে এখন তৈরি হচ্ছে এ শাড়ি। এসব শাড়ি দেশের গণ্ডী পেরিয়ে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভারত, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

মিহি সুতার নানা ডিজাইনের মসলিন শাড়ি তৈরির দাবি করলেন রূপগঞ্জ উপজেলার নোয়াপাড়া এলাকার আল আমিন তাঁতি। নোয়াপাড়া বিসিক জামদানি পল্লিতে বসবাস করেন আল আমিন। এ পর্যন্ত ৩০০ থেকে ৪০০ কাউন্টের সুতা দিয়ে ৯টি মসলিন শাড়ি তৈরি করেছেন তিনি। প্রতিটি শাড়ির দৈর্ঘ্য ৬ গজ এবং প্রস্থ ৪৭ ইঞ্চি। ওজন প্রায় আড়াইশ গ্রাম। প্রত্যেকটি শাড়ি তৈরিতে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হয়।

আল আমিন বলেন, ২০১৩ সালে দৃক গ্যালারির সাইফুল ইসলাম মসলিন তৈরির কারিগর খুঁজছিলেন। ওই সময় তার সঙ্গে কথা হয়। এরপর থেকে আল আমিন চিকন সুতা দিয়ে শাড়ি বুনতে শুরু করেন। তবে সূক্ষ্ম সুতার কারণে শাড়ি বুনতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। এভাবে প্রায় ৬ মাস পেরিয়ে গেল। সুতা ছিড়ে যাওয়ার বিড়ম্বনায় আরও প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেল। এ ছাড়া আর্দ্রতার একটা বিষয় রয়েছে। রোদ উঠলে সুতা ছিঁড়ে যেত। এ কারণে ভোর থেকে সকাল ৯টা এবং বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত কাজ চলে অবিরাম। তবে নানান ঝামেলার কারণে অনেকে মসলিন শাড়ি তৈরির কাজ বন্ধ করার পরামর্শও দিয়েছিল তাকে। কিন্তু তিনি ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। অবশেষে আরও ৯ মাস চেষ্টা চালিয়ে একটি মসলিন শাড়ি তৈরি করতে সফল হন। ৩০০ কাউন্টের সুতা দিয়ে শাড়িটি তৈরি করা হয়। সেই শাড়ি ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শাহাবাগের জাদুঘরে এক প্রদর্শনীতে ঠাঁই পায়। সেখানে পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। ওই প্রদর্শনীর পর তার কাছে বহু শাড়ির অর্ডার আসতে থাকে। তবে খুব বেশি অর্ডার নেন না তিনি। কারণ একটি মসলিন শাড়ি তৈরি করতে প্রায় ৯ মাস সময় লেগে যায়।

তিনি আরো জানান, সম্প্রতি ৪টি শাড়ির কাজ সম্পন্ন করেছেন। ঈদুল ফিতরের আগে ফ্রান্স ও লন্ডনে যাবে এসব শাড়ি। প্রতিটি শাড়ি ৫-৬ লাখ টাকায় বিক্রি হবে। ঈদের আগে প্রায় ২৫ লাখ টাকার মসলিন শাড়ি বিক্রি হবে বলে তিনি জানান।

আল আমিন বলেন, ফুটি কার্পাস তুলা থেকে তৈরি ৩০০ ও ৪০০ কাউন্টের সুতা ভারতের মুর্শিদাবাদ থেকে কিনে আনা হয়। তবে আমাদের দেশে নতুন করে সরকারিভাবে ৭০০ কাউন্টের সুতা তৈরি করা হয়েছে। শাড়ির ডিজাইন ও সুতার কাউন্টের ওপর নির্ভর করে দাম কম বেশি হয়ে থাকে।

মসলিন শাড়ি নিয়ে স্বপ্ন বুনছেন আল আমিন মিয়া। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী মসলিন শাড়ি নিয়ে আগামীতে আরও কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে। যাতে করে দেশের সুনাম ও ঐতিহ্যকে সারা বিশ্বের সামনে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে পারি। এটা যেন দেশের ইতিহাস হয়ে থাকে, আর সেই ইতিহাসের অংশ হিসেবে আমার নাম সবাই স্মরণ করে।’

এ বিষয়ে বিসিক জামদানি শিল্প নগরী ও গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘জামদানি বিসিক পল্লিতে বসবাসকারী আল আমিন নামে এক ব্যক্তি বেসরকারিভাবে মসলিন শাড়ি তৈরি করেন। আমার জানা মতে, তিনি শুধু নারায়ণগঞ্জ জেলায় নয় সারা দেশের মধ্যে একমাত্র মসলিন শাড়ি তৈরি করেন। তবে সরকারিভাবে সহযোগিতা করলে মসলিন শাড়ির প্রচার ও প্রসার আরও বাড়ানো সম্ভব।

Views: 15