দক্ষিণাঞ্চলে রেল সংযোগের কাজও চলছে পুরোদমে

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত হতে যাচ্ছে বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চল। পদ্মা সেতু নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার সাথে নদীমাতৃক দক্ষিণাঞ্চলের রেল সংযোগের কাজও চলছে পুরোদমে। ঢাকা-কুয়াকাটা রুটে থাকছে ১২টি রেলস্টেশন। বরিশাল ও পটুয়াখালীর মধ্যে ট্রেন থামবে ঝালকাঠির নলছিটিতে।

ইলিশ মাছের আদলে দৃষ্টিনন্দন নকশায় এখানকার রেলওয়ে স্টেশনটি হবে নলছিটি উপজেলার ভরতকাঠি গ্রামে। ইতোমধ্যে স্টেশনের জন্য জমি অধিগ্রহণ করছে সরকার। এই রেলস্টেশন থেকেই ঝালকাঠির মানুষ রাজধানী ঢাকায় ও পটুয়াখালীর পায়রা বন্দর ও সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায় যাতায়াত করতে পারবেন।

ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী, পায়রা বন্দর হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের জন্য ম্যাপ চূড়ান্ত করে তিনটি সার্ভে কোম্পানি জরিপ কাজ সম্পন্ন করেছে আগেই। ম্যাপ অনুযায়ী মাটি পরীক্ষা, জমি, ঘর-বাড়ি, স্থাপনা ও গাছ-পালার জরিপ কাজও সম্পন্ন হয়েছে। এ তথ্য জানিয়েছে জরিপ কাজের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সেফ গার্ড কনসালটেশন (ডিএসসি)’ কোম্পানির সুপারভাইজার মো. মিজানুর রহমান।

সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তে এরই মধ্যে ভাঙ্গা থেকে পায়রা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ভাঙ্গা থেকে বরিশাল, পায়রা বন্দর হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত রেলের জন্য বিশদ নকশা এবং টেন্ডার ডকুমেন্ট প্রস্তুতির পাশাপাশি সম্ভাব্যতা অধ্যয়নের কাজ শুরু করেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

ফরিদপুর-বরিশাল-পায়রা বন্দর-কুয়াকাটা রেললাইন প্রকল্পটির বাস্তব অবকাঠামো নির্মাণ কাজ সঠিক সময়ে সম্পন্ন হলে আগামী ২০২৮ সালে এ রুটে ট্রেন চালু করতে আশাবাদী রেলপথ বিভাগ। আগামী ২ বছরের মধ্যে ভাঙ্গা থেকে বরিশাল সেকশনের ৯৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ সম্পন্ন করে ট্রেন চালুর সম্ভাবনার কথাও বলেছিলেন একাধিক কারিগরি বিশেষজ্ঞ।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক (সিনিয়র কনসালট্যান্ট) আখতারুল ইসলাম খান ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট আহসান আলী জহিরসহ রেলপথ অধিদপ্তরের বেশ কজন কর্মকর্তা জানান, ‘এ রেলপথ নির্মাণে ৫ হাজার ৬৩৮ একর ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে। কিছু জায়গায় মামলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকায় ভূমি অধিগ্রহণ কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ধরনের জটিলতা থাকলে ৪১ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয় সাপেক্ষ ২১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কার্যক্রম বিলম্বিত হতে পারে। বিলম্ব যত হবে এ কাজের প্রকল্প ব্যয় ততই বাড়বে।

ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডিজাইন কনসালট্যান্ট জুনিয়র কনসালট্যান্ট আহসান আলী জহির জানান, ‘ভাঙ্গা থেকে পায়রা পর্যন্ত ২১১ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে। যে রেলপথ ৩২৮ ফটু প্রশস্ত জায়গার মাঝখান দিয়ে নির্মিত হবে। প্রথমপর্যায়ে রেলপথটি হবে সিঙ্গেল লেনের। তবে ৩২৮ ফুট বা ১০০ মিটার প্রশস্ত জায়গা থাকায় পরবর্তীতে এখানে ডাবল লেনেরও রেলপথ তৈরি করা যাবে। সে ক্ষেত্রে নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না।

তিনি আরও জানান, ভাঙ্গা থেকে পায়রা পর্যন্ত রেলপথটি বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী ও বরগুনাসহ ৬টি জেলার মধ্যদিয়ে যাবে। এখানে থাকবে ১২টি প্রধান রেলস্টেশন। এর মধ্যে শুধু বরিশাল নগরীসহ জেলায় থাকবে তিনটি। এর মধ্যে একটি বরিশাল এয়ারপোর্ট এলাকা, একটি বরিশাল নগরীর ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাশিপুর এলাকা এবং অন্যটি বাকেরগঞ্জ উপজেলায় হবে।

এ ছাড়া বরিশাল জেলার মধ্যবর্তী স্থান ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া এলাকায় আরও একটি স্টেশন থাকবে। যদিও ১২টি প্রধান স্টেশনের বাইরে আরও কিছু সাব-স্টেশনও থাকবে। তবে সাব-স্টেশনের সংখ্যা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। তা ছাড়া পরবর্তীতে প্রধান স্টেশনের সংখ্যা আরও সংযোজন-বিয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন আহসান আলী জহির।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র কনসালট্যান্ট আখতারুজ্জামান খান বলেন, ‘রেলপথ নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণে সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে পৃথকভাবে মতবিনিময় করা হচ্ছে। ভূমি অধিগ্রহণ, মাঠপর্যায়ে জরিপ ও সব আনুষঙ্গিক কার্যক্রম শেষে দরপত্র আহ্বান করা হবে। এ প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। তবে রেলপথ নির্মাণের জন্য এখনো দুটি স্ট্যাডি বাকি আছে, যা রেলপথ মন্ত্রণালয়সহ তিনটি দেশি-বিদেশি সহযোগী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করছে। সব কার্যক্রম সম্পন্ন করে প্রকল্প বাস্তবায়নে ৫ বছর সময় লাগতে পারে বলে ধারণা দিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

বেসরকারি সংগঠন ‘ঝালকাঠি নাগরিক ফোরাম’-এর সাধারণ সম্পাদক আহমেদ আবু জাফর বলেন, এ অঞ্চলে রেলপথ তৈরি হলে ট্রেনে যাতায়াতে দখিনা জনপদের মানুষ বাসের যাত্রী হয়রারি থেকে মুক্তি পাবে। পাশাপাশি ভ্রমণ ব্যয় সংকুলান হবে।

Views: 11