চিকিৎসকদের অলাভজনক সুলভ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান

হিউম্যান এইড রিসার্চ ল্যাব ও হাসপাতাল

খাদ্যনালির ক্যান্সার নিয়ে পটুয়াখালীর বাউফল থেকে রাজধানীর হিউম্যান এইড রিসার্চ ল্যাব ও হাসপাতালে এসেছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব শেখ ফয়জুল্লাহ (ছদ্মনাম)। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তিনি এখানে চিকিৎসাধীন। ভর্তি ও শয্যা ভাড়া বাবদ কোনো অর্থ ব্যয় করতে হয়নি তাকে। ফয়জুল্লাহর ভাষ্য, এখানকার চিকিৎসকরা খুবই আন্তরিক। চিকিৎসা নিয়ে আপাতত তার কোনো দুশ্চিন্তা নেই।

দুটি কিডনিই বিকল হওয়ায় দেড় বছর ধরে সপ্তাহে দু’বার ডায়ালাইসিস করাতে হয় মুন্সিগঞ্জের সাব্বির আহমদকে (ছদ্মনাম)। ২৮ বছরের এ তরুণ ডায়ালাইসিসের জন্য এখন নিয়মিত এ হাসপাতালে আসেন। অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালে প্রতিবার ডায়ালাইসিসে সাড়ে ৩-৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তবে এ হাসপাতালে ব্যয় ২ হাজারের কম।

শুধু ফয়জুল্লাহ কিংবা সাব্বির নন, হিউম্যান এইড রিসার্চ ল্যাব ও হাসপাতালে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রোগী আসে। এদের বেশির ভাগই জটিল কিংবা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত।

কয়েকজন চিকিৎসক মিলে গড়ে তুলেছেন অলাভজনক এ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। এখানে ভর্তি, শয্যা ভাড়া ও চিকিৎসকের পরামর্শের জন্য রোগীদের কোনো খরচ নেই। অস্ত্রোপচারের খরচও কম। আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় অনেক রোগীকে বিনামূল্যে ওষুধও দেয়া হয়।

হাসপাতালটির অবস্থান রাজধানীর মিরপুরের দারুস সালামে। প্রতিষ্ঠানটি মূলত হিউম্যান এইড বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। দরিদ্র রোগীদের সেবা দেয়ার প্রত্যয় নিয়ে দেড় দশক ধরে এ ফাউন্ডেশন কাজ করছে। এ উদ্যোগে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের অবদানও রয়েছে।

২০১৪ সালে এ ফাউন্ডেশন সরকারের অনুমোদন পায়। শুরুতে রক্তদান কর্মসূচি ও ছিন্নমূল রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ দেয়া হয়। বিভিন্ন সময় হেলথ ক্যাম্পও হয়। পরের বছর যাত্রা শুরু করে ‘স্বাধীনতা ব্লাড ব্যাংক অ্যান্ড ট্রান্সফিউশন সেন্টার।’ ২০১২ সাল থেকে ২০২০ সালের আগ পর্যন্ত কল্যাণপুর বস্তিতে ‘টোনাটুনির পাঠশালা’ নামে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার কার্যক্রম চালায় ফাউন্ডেশন। ২০১১-১৫ সাল পর্যন্ত ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় শীতবস্ত্র বিতরণও করা হয়। শুরুতে ফাউন্ডেশনের বেশির ভাগ কার্যক্রম চলে কল্যাণপুর বস্তিতে। বর্তমানে কার্যক্রম চলছে মিরপুরের দারুস সালামে।

হিউম্যান এইড রিসার্চ ল্যাব ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ৫০ শয্যার অনুমোদন মেলে। বর্তমানে ২০ শয্যায় রোগী ভর্তি নেয়া হয়। ফিস্টুলা, ক্যাথেটার, পাইলস, স্তন ক্যান্সার ও খাদ্যনালির মতো জটিল বিষয়ে নিয়মিত অস্ত্রোপচার হচ্ছে। মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও শিশু বিভাগেও সেবা পাওয়া যায়। ক্যান্সার, থ্যালাসেমিয়া ও কিডনি রোগীদের রক্ত সঞ্চালন সেবা দেয়া হয় অল্প খরচে। ক্যান্সার ও থ্যালাসেমিয়া রোগীদের অর্থ সহযোগিতাও দেয়া হয়। স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের পাশাপাশি সি-সেকশনও (সিজারিয়ান) হয় এখানে।

হাসপাতালের ডায়ালাইসিস সুবিধা দুই শয্যার। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রও (আইসিইউ) দুই শয্যার। ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাফি (ইসিজি), ইকোকার্ডিওগ্রাফি (ইকো), এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি (ইউএসজি), ডপলার টেস্টসহ প্যাথলজি ও বায়োকেমিস্ট্রির প্রায় অর্ধশত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা রয়েছে এখানে।

‘বি’ ক্যাটাগরির রোগ নির্ণয় কেন্দ্র হওয়ায় কম্পিউটারাইজড টমোগ্রাফি স্ক্যান (সিটি স্ক্যান) ও ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (এমআরআই) বাদে প্রায় সব সুবিধা এখানে রয়েছে। ক্যান্সার রোগীদের কেমোথেরাপিও দেয়া হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিতে রোগী ভর্তি হয়েছে প্রায় সাত হাজার। বহির্বিভাগে পরামর্শ নিয়েছে প্রায় ২৪ হাজার রোগী। ফিস্টুলা, ক্যাথেটার ও অন্যান্য অস্ত্রোপচার হয়েছে এক হাজারের বেশি। স্বাভাবিক সন্তান প্রসব করেছেন অন্তত ৬০০ প্রসূতি। সি-সেকশন (সিজারিয়ান) হয়েছে দেড় শতাধিক। বিশেষজ্ঞ ১১ চিকিৎসকসহ হাসপাতালটির মোট লোকবল ২৮ জন।

চিকিৎসকের পরামর্শের জন্য কোনো ফি নেয়া হয় না। তবে বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য বাইরের কোনো চিকিৎসক আনা হলে ন্যূনতম ফি নেয়া হয়। চিকিৎসকরা বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে যে ওষুধ নমুনা হিসেবে পান, তা এ হাসপাতালের রোগীদের বিনামূল্যে দেয়া হয়। আর নিজস্ব ফার্মেসির সব ওষুধে থাকে ১৫ শতাংশ ছাড়।

গত বৃহস্পতিবার সরজমিন দেখা যায়, সাততলা ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় হাসপাতালের কার্যক্রম চলছে। নিচতলায় ফার্মেসি, অস্ত্রোপচার কক্ষ, পুরুষ ওয়ার্ড, ডায়ালাইসিস কক্ষ ও আইসিইউ। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে নারী ওয়ার্ড, রোগ নির্ণয় কেন্দ্র ও চিকিৎসকদের চেম্বার।

স্তন ক্যান্সার নিয়ে গত মঙ্গলবার এ হাসপাতালে ভর্তি হন নরসিংদীর মাজেদা বেগম (ছদ্মনাম)। তার মেয়ে তানজুম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চিকিৎসার ব্যয় বিবেচনা করে এ হাসপাতালে এসেছি। চিকিৎসক ও অন্যান্য সেবার মান অনেক ভালো। আশা করি মায়ের ভালো চিকিৎসা পাব।’

শুরু থেকেই এ হাসপাতালে গাইনি বিশেষজ্ঞ হিসেবে চিকিৎসা দিচ্ছেন ডা. তামান্না আফরোজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করি। আমরা চাই, অসহায় রোগীরা যেন এখানে পরিপূর্ণ চিকিৎসা পান।’ ডা. তামান্না মনে করেন, ‘দেশে দাতব্য চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান আরো অনেক বেশি হওয়া প্রয়োজন।’

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তাদের অনুদানের ওপর নির্ভর করে চলতে হয়। অনেকে সদকা কিংবা জাকাতের অর্থ দিয়ে এ হাসপাতালকে সহায়তা করে। অনেক চিকিৎসকের নিজস্ব অনুদানও রয়েছে এখানে।

এ হাসপাতালে সেবা দেয়া অন্যান্য চিকিৎসক হলেন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ডা. শেখ মইনুল ইসলাম, জেনারেল সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. ইসতিয়াক আহমেদ, আইসিইউ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. সাকিব হাসান, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অরুণাভ পাল, গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. আসমা আক্তার সোনিয়া, ভাসকুলার (রক্তনালি) সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. এনামুল হাকিম, ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. মাহফুজুল আহমেদ রিয়াদ, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নাজমুল হক, অর্থোপেডিক সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. মো. শেখ সাদি, শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফাতেমা জলি, চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহসেনা আক্তার নিপুণ, ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. ফোরকান আহমেদ ও কিডনি বিশেষজ্ঞ ডা. শামসুন নাহার রানু।

ডা. শেখ মইনুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাসপাতালটির পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা করছি। আমরা রোগীদের ভর্তি ও শয্যার জন্য কোনো টাকা রাখি না। ডায়ালাইসিস ও অস্ত্রোপচারে রোগীদের তুলনামূলক ব্যয় যেন কম হয়, সে চেষ্টা করি। রোগী একেবারে অসহায় হলে বিনামূল্যে সেবা দেয়ার চেষ্টা করি। হাসপাতালটি অলাভজনক। চিকিৎসকদের বেশির ভাগই স্বেচ্ছায় সেবা দেন। আর ক্যান্সার রোগীদের কেমোথেরাপির ওষুধ আরো সহজলভ্য করতে সবার সহযোগিতা কামনা করছি।’