রাজস্ব আদায়ে ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি

চলতি (২০২৩-২৪) অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সরকারের রাজস্ব আদায়ে ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরে ১০ শতাংশ গড় প্রবৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে আদায়ে এই ইতিবাচক ধারা সত্ত্বেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এখনো উল্লেখযোগ্য রাজস্ব ঘাটতিতে রয়েছে।

ফেব্রুয়ারিতে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১৯ শতাংশের বেশি, যা বছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বিশ্লেষকরা বলছেন, আমদানিমূল্য বৃদ্ধি ও কর আদায়ের প্রচেষ্টা বাড়ানোসহ বিভিন্ন কারণে আদায়ে এ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

তবে এ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ঘাটতি পূরণ হয়নি। প্রথমে নির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে কমানোর পরও এ আট মাসে এনবিআর এখন ১৮ হাজার ২২১ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতিতে রয়েছে।

অর্থবছরের প্রথম আট মাসে এককভাবে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে আয়কর থেকে, প্রায় ২০ শতাংশ। এ ছাড়া সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতে আয়কর আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ।

এনবিআর সদস্য সৈয়দ মো. আবু দাউদ বলেন, আমরা মাঠপর্যায়ে মনিটরিং বাড়িয়েছি। এ ছাড়া ট্যাক্স ডিডাকশন এট সোর্স (টিডিএস), যারা অতীতে টিডিএস কার্যকর করত না, তা এখন বাধ্য হচ্ছে। প্রুফ অব সাবমিশন অব রিটার্ন (পিএসআর) বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা আনা হয়েছে। এসব কারণে আয়কর আদায়ে ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

এ ছাড়া রমজানকে কেন্দ্র করে আমদানি বৃদ্ধির কারণে ফেব্রুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি অনেক বেড়েছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে আমদানিতে গত আট মাসে সম্মিলিতভাবে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও আমদানি কর আদায়ে প্রায় ১১ শতাংশ এবং ভ্যাট আদায়ে ১৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে সার্বিকভাবে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলা কমেছে ৪ শতাংশ। তা সত্ত্বেও আমদানি কর আদায়ে প্রবৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে এনবিআরের কাস্টমস বিভাগের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, আমদানির মিথ্যা ঘোষণা ঠেকানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা আমদানি কর আদায়ে প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।

রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর ভবনে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম।

সভায় উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, ফাঁকি বন্ধ করতে মনিটরিং বাড়ানো এবং মামলায় আটকে থাকা রাজস্ব আদায়ে কর্মকর্তাদের আরও নিবিড়ভাবে কাজ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তবে তা সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরের রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছেন এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন।

তিনি বলেন, রাজস্বের একটি বড় অংশ আসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন থেকে। সাধারণত বছরের শেষদিকে রাজস্ব আদায় অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি হয়; কিন্তু এবার এডিপি বাস্তবায়নের হার খুবই কম, যার ফলে শেষদিকে রাজস্ব আদায়ও কম হবে। এমন পরিস্থিতিতে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, বলেন তিনি।

চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিলে ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে গত বছরের আদায়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হতে হবে প্রায় ৩০ শতাংশ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এত বেশি হারে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি কোনো বছরই হয়নি।

এমন পরিস্থিতিতে লক্ষ্যমাত্রা ২০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। বাকি চার মাসে আদায় করতে হবে ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।

আর্থিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এনবিআরের বাড়তি রাজস্ব আদায়ের চাপ যাচ্ছে ভোক্তার ওপর, কারণ রাজস্বের বড় অংশই আসে পরোক্ষ কর থেকে।

এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, রাজস্বের ৮০ শতাংশই আসে পরোক্ষ কর থেকে। এর অর্থ হলো, বেশি রাজস্ব আদায় হলে এর চাপ ভোক্তার ওপর পড়ছে। যাদের আয় নেই বা কম, তাদের ওপর বড় চাপ পড়ছে।

তিনি বলেন, এমনিতেই পণ্যের দাম বাড়ছে। এর সঙ্গে আমদানিতে বিভিন্ন ধরনের কর এবং স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট যোগ হয়ে এই ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক সংস্কার ছাড়া সাধারণ মানুষের ওপর এই চাপ কমানো সম্ভব হবে না, বলেন তিনি।

কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসেনও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যে বাড়তি পরোক্ষ কর নেওয়া হচ্ছে, তা ব্যবসায়ী তার পকেট থেকে দেবেন না। ঘুরেফিরে তা ভোক্তার ওপরেই পড়ছে। এ জন্য আমাদের দাবি প্রত্যক্ষ কর বাড়িয়ে পরোক্ষ কর কমানোর জন্য। কিন্তু এনবিআর তা শুনছে না।

এ সময় তিনি সাম্প্রতিক সময়ে খেজুর, ডাল, চিনি ও বিভিন্ন ধরনের ফলে দাম বেড়ে যাওয়ার জন্য অন্যান্য কারণের পাশাপাশি বিদ্যমান কর ব্যবস্থাকেও দায়ী করেন।