অর্থনীতিতে যেসব সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে

প্রফেসর আবু হেনা রেজা হাসান

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করেছে। ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, আগামী ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয়

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশগুলো জাতীয় নির্বাচন নিয়ে নিজেদের চাওয়ার কথা জানিয়েছে। তারা বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য পরামর্শ দিয়ে আসছে অনেক দিন ধরেই। এটা নিয়ে কেউ কেউ স্যাংশনের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। অর্থনৈতিক স্যাংশন দেবেই, এমন কোনো কথা নেই। তেমন ইঙ্গিতও তারা দেননি। তবে এই ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো স্যাংশন দিলে তা কী ধরনের হয়ে থাকে? এখন পর্যন্ত তারা যেটা নিয়ে আপত্তি জানাচ্ছে, তা হচ্ছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি। আমার ধারণা, পশ্চিমা বিশ্ব কিন্তু আবেগপ্রবণ হয়ে যা ইচ্ছে তা-ই করে না। তারা বিদ্যমান কতগুলো নিয়মকানুনের আওতায় আসার চেষ্টা করেন; অর্থাত্ নিয়ম ভঙ্গের কারণে যে শাস্তির বিধান রয়েছে, তারা সেটাই প্রয়োগ করার চেষ্টা করে। তাই বিদ্যমান আইনের বাইরে কিছু করবে না। আর একটি ইস্যু হতে পারে, ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইট লঙ্ঘনের বিষয়টি। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার যেসব আইনকানুন রয়েছে, তার অনেকগুলোই বাংলাদেশ লঙ্ঘন করে চলেছে বলে অভিযোগ আছে। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্বের কাছে অনেকগুলো ইস্যু রয়েছে, তার মাধ্যমে তারা চাইলে বাংলাদেশকে কিছু অর্থনৈতিক চাপে ফেলতে পারে।

আন্তর্জাতিক বিশ্ব জানে, বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য প্রায় সম্পূর্ণরূপে তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। তারা যদি বাংলাদেশকে শাস্তি দিতেই চায়, তাহলে প্রথমেই তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর আঘাত আসতে পারে। তারা তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আইনগুলো প্রয়োগ করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই একটি অভিযোগ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে করেছে, তাহলো ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইট লঙ্ঘন। তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ বিভিন্ন সূত্র থেকে তৈরি পোশাকের ডিজাইন নিচ্ছে, ফেক আইটেম রপ্তানি করছে। অবশ্য এসব অভিযোগ অনেক দিন ধরেই করে আসছে, এর সঙ্গে হয়তো নির্বাচন বা রাজনীতি জড়িত নয়। তবে এসব ইস্যু নতুন করে সামনে নিয়ে আসতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি এসব ইস্যুতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা অন্যান্য দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের বাইরে যেতে পারবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র দেখাতে চাইবে, তারা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তারা সামগ্রিক স্বার্থেই এসব ব্যবস্থা নিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি কোনো দেশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহলে তা কঠিন হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেওয়া জিএসপি (জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স) স্থগিত করেছে। বাংলাদেশ অনেকভাবে চেষ্টা করা সত্ত্বেও এই সুবিধা এখনো ফিরে পায়নি। কাজেই যদি তারা নিষেধাজ্ঞার পথে হাঁটে, তাহলে পরিস্থিতি খুবই জটিল হতে পারে। তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর যদি কোনো আঘাত আসে, তাহলে আমাদের তৈরি পোশাক বিপর্যস্ত হবে।

বাংলাদেশ প্রধানত ‘লো-এন্ডে’র পোশাক রপ্তানি করে থাকে। এক্ষেত্রে আমাদের একধরনের সুবিধা আছে, তা হলো, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক উত্পাদনের খরচ তুলনামূলকভাবে কম। সস্তায় শ্রমিক পাওয়া যায় বলে আমাদের এখানে তুলনামূলক সস্তায় তৈরি পোশাক উত্পাদন করা যায়। পরিবেশগত ব্যয়, লেবার লো কস্ট—এগুলো তো আমরা মানি না। এসব আনুষঙ্গিক ব্যয় না করার কারণে উত্পাদন খরচ অন্যান্য দেশের তুলনায় কম হয়। আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পগুলো নানাভাবে ভর্তুকি পাচ্ছে। আমরা যেহেতু উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছি, তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো আমরা যাতে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার আইনগুলো সঠিকভাবে মেনে চলি সেদিকে জোর দেবে। তারা ভর্তুকি কমানোর জন্য বলতে পারে। তাদের এসব আইনি ব্যবস্থার ফলে আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প হয়তো ধ্বংস হবে না, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই এই শিল্পটি সংকুচিত হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি কোনো অজুহাতে বাংলাদেশকে দেওয়া জিএসপি স্থগিত করে, তাহলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকগণ নিশ্চিতভাবেই বিপাকে পড়বে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প ধ্বংস হয়ে যাক, এটা তারা চাইবে না। কারণ তৈরি পোশাকশিল্প বন্ধ হয়ে গেলে এই খাতে কর্মরত ৪০ লাখ থেকে ৪৫ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। সেই অবস্থায় দেশে মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটুক, এটা নিশ্চয়ই তারা চাইবে না। তবে তারা বিভিন্ন আইনকানুন প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পকে সংকুচিত করতে চাইতে পারে। আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ বর্তমানে একধরনের সংকটের মধ্যে রয়েছে। কোনো কারণে যদি তৈরি পোশাকশিল্প সংকুচিত হয়ে যায়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ এখনো আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় উত্স হচ্ছে পণ্য রপ্তানি খাত। আরো নির্দিষ্ট করে বলতে হয়, আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্ফীতি কমবে না বাড়বে, তা নির্ভর করে পণ্য রপ্তানির গতিপ্রকৃতির ওপর।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্স আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের দ্বিতীয় বৃহত্তম উত্স। অনেকেই বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স প্রেরণের পরিমাণ আগের তুলনায় কমে গেছে। এই বক্তব্য মোটেও ঠিক নয়। প্রবাসী বাংলাদেশিরা আগের তুলনায় বরং বেশি অর্থ দেশে প্রেরণ করছে। কিন্তু সেই অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে না পাঠিয়ে তারা হুন্ডির মাধ্যমে দেশে প্রেরণ করছেন। ফলে প্রেরিত রেমিট্যান্স দেশে এলেও তা বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে যুক্ত হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের ওপর নগদ আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু বৈধ চ্যানেলে নগদ আর্থিক প্রণোদনাসহ যে বিনিময় হার পাওয়া যাচ্ছে, কার্ব মার্কেটে তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ পাওয়া যাচ্ছে। বৈধ চ্যানলে রেমিট্যান্স প্রেরণ করতে প্রতি মার্কিন ডলারে পাওয়া যায় ১১২ টাকা। আর কার্ব মার্কেটে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে ১২৬ থেকে ১২৭ টাকা পর্যন্ত। কাজেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা বেশি অর্থ পাবার আশায় হুন্ডির মাধ্যমে দেশে অর্থ প্রেরণ করছে। এছাড়া অনেকেই আছেন, যারা অবৈধ উপায়ে বিদেশে গমন করেছেন। তারা চাইলেও ব্যাংকিং চ্যানলে অর্থ দেশে প্রেরণ করতে পারবেন না। বর্তমানে রেমিট্যান্স-প্রবাহে যে মন্থর গতি লক্ষ করা যাচ্ছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের চিন্তা করতে হবে।

যেহেতু অবৈধ পথে রেমিট্যান্স এলেও তা স্থানীয় সুবিধাভোগীদের হাতেই থাকছে, তাই তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমছে না। যখন অবৈধ পথে রেমিট্যান্স আসা বন্ধ করতে চাইবেন তখনই সংকট দেখা দেয়। তারা প্রয়োজনে কর্মস্থলেই টাকা সংরক্ষণ করবেন। জনশক্তি রপ্তানির বিষয়টি কার্যত ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সরকারি পর্যায়ে যদি জনশক্তি রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হতো, তাহলে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হয়ে যেত। কারণ সরকারিভাবে বিদেশে জনশক্তি প্রেরণ করা হলে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ দেশে প্রেরণ করতে হতো। ফলে তারা চাইলেও হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ দেশে প্রেরণ করতে পারতেন না।

বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ আছে। সেই বিনিয়োগটা কিন্তু ব্যক্তি খাত থেকে আসা। বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের তেমন কোনো বিনিয়োগ নেই। কাজেই বাংলাদেশে মার্কিন নাগরিকদের যে বিনিয়োগ আছে, সেগুলো খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। বাংলাদেশে যেসব মার্কিন কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তারা প্রতি বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্থ নিয়ে আসে না। তারা স্থানীয়ভাবে যে মুনাফা অর্জিত হয়, সেটাই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে। কাজেই সংকট সৃষ্টি হলেও মার্কিন বিনিয়োগ খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

রপ্তানি বাণিজ্য সংকটে পড়লে আমদানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দেবে। আমাদের বেশির ভাগ শিল্পের কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি করতে হয়। রপ্তানি কমে গেলে মার্কিন ডলারের অভাবে আমাদের আমদানি কমাতে হবে। এতে দেশের অভ্যন্তরে পণ্য আমদানি কমে যেতে পারে।

লেখক :ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ডিপার্টমেন্ট, পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ অন বিজনেস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন :এম এ খালেক

 

নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একধরনের অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। দেশের অন্যতম বিরোধী দল বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো নির্বাচন বয়কট করছে। শুধু তা-ই নয়, তারা নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে, অর্থাত্ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন সংঘাতময় হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতা যদি আরো বৃদ্ধি পায়, তাহলে আমাদের দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।