এবার গভীর সমুদ্রবন্দরের কমর্যজ্ঞ, ভিত্তিস্থাপন শনিবার

বঙ্গোপসাগরের তীরে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়িতে বহুল প্রত্যাশিত গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের আনুষ্ঠানিক কর্মযজ্ঞ অবশেষে শুরু হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি হবে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ও গভীর সমুদ্রবন্দর। এই বন্দরে আট থেকে ১০ হাজার কনটেইনার ও কমপক্ষে এক লাখ মেট্রিক টন পণ্য নিয়ে জাহাজ ভিড়তে পারবে।

একই তীরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল আর গভীর সমুদ্রবন্দর ঘিরে হাতছানি দিচ্ছে বিপুল দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। এ অঞ্চল ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার ‘বিজনেস হাব’ গড়ে ওঠার সম্ভাবনার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

আগামী শনিবার (১১ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহেশখালীর মাতারবাড়িতে গভীর এই সমুদ্রবন্দরের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিন বছরের মধ্যেই গভীর সমুদ্রবন্দর তার অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে এবং প্রথম টার্মিনালে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নৌপথে ৭০ কিলোমিটার দূরে ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রকল্পটি ২০২০ সালের মার্চে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। সেপ্টেম্বরে জাপানের নিপ্পন কোই নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরই মধ্যে টার্মিনালের নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে। ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র আহ্বানের পর কার্যাদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল সারাবাংলাকে বলেন, ‘জাপান সরকারের সহায়তায় জাইকার অর্থায়নে আমরা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে যাচ্ছি। সমুদ্রবন্দরের জন্য মূল বিষয় হচ্ছে সাগরের চ্যানেল, সেটার নির্মাণ এরই মধ্যে হয়ে গেছে। ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী চ্যানেল উদ্বোধন করবেন এবং গভীর সমুদ্রবন্দরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। এরপর সর্বোচ্চ তিন বছরের মধ্যে প্রথম টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ হবে এবং সেটি পূর্ণাঙ্গ অপারেশনে চলে যাবে।’

মাতারবাড়িতে এরই মধ্যে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। সেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সামগ্রী বহনকারী জাহাজ ভেড়াতে একটি চ্যানেল খনন করে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল)। চ্যানেলটি ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ, ৩৫০ মিটার প্রশস্ত ও ১৮ দশমিক ৫ মিটার গভীর। বাংলাদেশে এখন এটি সবচেয়ে গভীর চ্যানেল। এ ছাড়া সিপিজিসিবিএল সেখানে একটি জেটিও নির্মাণ করেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২০ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো ইন্দোনেশিয়ার একটি জাহাজ ভেড়ার মধ্য দিয়ে চ্যানেলটি চালু হয়। এরপর গত তিন বছরে ১২৩টি জাহাজ প্রকল্পের সরঞ্জাম ও কয়লা নিয়ে এ চ্যানেল অতিক্রম করেছে। গত সাতমাসে প্রায় আট লাখ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেটিতে ভিড়েছে বিশালাকৃতির ১০টি জাহাজ। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা অনুযায়ী চলতি বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে চ্যানেলটির নিয়ন্ত্রণ নেয় চট্টগ্রাম বন্দর।

বন্দর চেয়ারম্যান এম সোহায়েল বলেন, ‘মাতারবাড়ি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য চ্যানেল ও দুটি জেটি তৈরি করা হয়েছিল। ট্রায়াল বেসিসে সেই চ্যানেল দিয়ে জেটিতে জাহাজ এসেছে। এখন পর্যন্ত ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টন পণ্য নিয়েও জাহাজ এসেছে। এটি চট্টগ্রাম বন্দরে যে জাহাজ আসে, তার দ্বিগুণ। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে। চ্যানেল দিয়ে জাহাজ হ্যান্ডলিং শুরু হবে।’

বন্দরের কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে ৪৬০ মিটার দীর্ঘ কনটেইনার জেটি ও ১৮ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটসহ (জাহাজের নিচের অংশ) ৩০০ মিটার দীর্ঘ একটি বহুমুখী জেটি নির্মাণের কাজ শুরু হবে। একইসঙ্গে একটি কনটেইনার ইয়ার্ডসহ আনুষাঙ্গিক স্থাপনাও নির্মাণ হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জেটির অদূরে ও সাগর উপকূল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে নির্মাণ হবে গভীর সমুদ্রবন্দরের টার্মিনাল।

নির্ধারিত ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে ১২ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে জাপান। আর সরকার দুই হাজার ৬৭১ কোটি টাকা এবং চট্টগ্রাম বন্দর দুই হাজার ২১৩ কোটি টাকা জোগান দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরে অন্তত ১৫ মিটার গভীরতা বা ড্রাফটের জাহাজ অনায়াসে প্রবেশ করতে পারবে। অথচ গভীরতা কম হওয়ায় চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে ৯ মিটার ড্রাফট হলেই জাহাজ ভিড়তে পারে না। ৯ মিটারের কম ড্রাফটের জাহাজে দুই হাজারের বেশি কনটেইনার পরিবহন সম্ভব নয়।

২০২৬ সালের শেষদিকে গভীর সমুদ্রবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম শুরুর তথ্য দিয়ে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, ‘বড় বড় মাদার ভ্যাসেল আট থেকে ১০ হাজার কনটেইনার নিয়ে এখানে ভিড়তে পারবে। এক লাখ টন কার্গো নিয়ে এখানে জাহাজ আসতে পারবে।’

আমদানি-রফতানি খরচ কমবে, সময়ও বাঁচবে
বন্দরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে বাংলাদেশ থেকে রফতানি পণ্য নিয়ে কোনো জাহাজকে আর ট্রানজিট বন্দরে যেতে হবে না। আমদানি পণ্য নিয়েও ট্রানজিট বন্দর হয়ে আসতে হবে না। এতে সময় ও খরচ বেঁচে যাবে। এ ছাড়া ভারতের ‘ল্যান্ডলকড’ সাতটি অঙ্গরাজ্য পণ্য আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে এ বন্দর ব্যবহার করতে হবে। ভারত, নেপাল, ভুটানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও চীন সরাসরি এ বন্দর ব্যবহার করে সুফল পাবে।

বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের গার্মেন্টস পণ্য, রেডিমেড যেসব পোশাক আমরা রফতানি করি, সেগুলো চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছোট ছোট জাহাজে প্রথমে সিঙ্গাপুর বা কলম্বো নিতে হয়। সেখান থেকে বড় বড় মাদার ভ্যাসেলে করে পাঠাতে হয় ইউরোপ-আমেরিকায়। এখানে লোডিং-আনলোডিংয়ের খরচ এবং সময়ের একটা বিষয় থাকে। জাহাজের ভাড়াও বেশি লাগে। বিশ্বের যেকোনো দেশে পণ্য পাঠানো কিংবা সে দেশ থেকে পণ্য আনার খরচ বেড়ে যায়। এতে পণ্যের দর বাড়ে।’

‘কিন্তু গভীর সমুদ্রবন্দর হলে আমাদের পণ্য নিয়ে জাহাজকে অন্য কোনো ট্রানজিট কান্ট্রিতে যেতে হবে না। এখানে বড় বড় মাদার ভ্যাসেলগুলো আসবে। এখান থেকে লোড হয়ে পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে যাবে,’— বলেন বন্দরের চেয়ারম্যান।

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মাহবুবুল আলম সারাবাংলাকে বলেন, ‘ভারতের সেভেন সিস্টার্স, মানে ল্যান্ডলকড রাজ্যগুলোর পণ্য গভীর সমুদ্রবন্দরে খালাস হয়ে আমাদের সড়কপথ ব্যবহার করে সেখানে যেতে পারবে। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ গভীর সমুদ্রবন্দর হবে। আমরা যদি সঠিকভাবে এগিয়ে যেতে পারি, তাহলে এটি আমাদের অর্থনীতির গেম চেঞ্জার হবে।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাতারবাড়িতে বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে। জাহাজ থেকে আমদানি করা তেল পাইপের মাধ্যমে খালাস করে সংরক্ষণের জন্য নির্মিত হয়েছে রিজার্ভার। একইসঙ্গে বাংলাদেশের একমাত্র এলএনজি ল্যান্ডিং স্টেশনের অবস্থানও সেখানে। নৌ ও সড়কপথের যোগাযোগের কারণে আগামীতে মহেশখালী এই অঞ্চলের ‘বিজনেস হাব’ হিসেবে গড়ে উঠবে।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ও সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দর হবে। অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে আস্তে আস্তে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সাগরতীরে বিপুলসংখ্যক শিল্পকারখানা হবে, আবাসিক এলাকা হবে, ট্যুরিজম সেন্টার হবে, এ ধরনের আরও নানা অবকাঠামো হবে। কিন্তু তার জন্য আগেভাগে চাই পরিকল্পনা।’

বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, ‘গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে পুরো একটি শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে। এর মাধ্যমে শুধু বাংলাদেশ উপকৃত হবে তা-ই নয়, দক্ষিণ এশিয়া এবং চীনসহ আরও কয়েক দেশের অন্তত তিন শ কোটি মানুষ সুফল পাবে। আমাদের অর্থনীতিতে অন্তত ২ থেকে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আসবে।’