উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে চট্টগ্রাম

২৮ অক্টোবর শনিবার চট্টগ্রামের পতেঙ্গা হতে আনোয়ারা প্রান্ত পর্যন্ত কর্ণফুলীর তলদেশে প্রায় ৩ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র টানেল, বঙ্গবন্ধু টানেল উদ্বোধন করেছেন বদলে যাওয়া বাংলাদেশের রূপকার, উন্নয়নের ম্যাজিশিয়ান, বাঙালির উন্নত ভবিষ্যৎ রচয়িতা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। নতুন যুগে প্রবেশের রোমাঞ্চে শিহরিত চট্টগ্রামের মানুষ তাই সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মেতেছে। চট্টলার জনপদে চলছে উৎসবের আমেজ, আনন্দের ফল্গুধারা। যার আন্তরিকতা ও দূরদর্শী পরিকল্পনায় স্বপ্নযুগে প্রবেশ করছে চট্টগ্রাম, সেই উন্নয়ন আর অগ্রগতির বিস্ময়মানবী বাঙালির প্রাণের প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে অভিবাদন জানাতে এবং যুগান্তরের সাক্ষী হতে কর্ণফুলীর এপার-ওপার দু’পারেই মুখিয়ে ছিল লাখো লাখো জনতা। বাংলার দুঃখী মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে নিরলস কাজ করে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভালোবাসায় সিক্ত করেছে চট্টলাবাসী।
প্রধানমন্ত্রী আমাকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ ১০ বছর এ পদে থেকে আমি তাঁর প্রত্যক্ষ উন্নয়নকর্মী হিসেবে কাজ করতে পেরেছি। আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি, মানুষের প্রতি ভালোবাসা; দেশপ্রেম, নিষ্ঠা ও দূরদর্শিতা থাকলে একটি অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীকেও দ্রুত অগ্রসরমান জাতিতে রূপান্তর করা সম্ভব। বলাবাহুল্য, আমার এ উপলব্ধি জাতির জনকের কন্যা প্রাণপ্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে দেখেই হয়েছে।
উন্নয়নে বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন তিনি। দরিদ্রতা হ্রাস করে উন্নয়নে বাংলাদেশের এগিয়ে চলা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার অবদানেই সম্ভব হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত বাঙালি জাতিকে এনে দিয়েছেন স্বাধীনতা। আর তাঁরই সুযোগ্যকন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনা এনে দিয়েছেন বাঙালি জাতির ভাগ্যের পরিবর্তন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব, লক্ষ্য অর্জনে সঠিক পরিকল্পনা, সাহসিকতা ও দৃঢ়তা আজ বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যখন স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়, তখন এটি ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় দরিদ্রতম দেশ। মাত্র ৫১ বছরে বাংলাদেশ দরিদ্রতা কমিয়ে প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে মানুষের ভাগ্য বদলাতে একে বড় অর্জন বলে উল্লেখ করেছে। প্রাথমিক শিক্ষা এখন সবার নাগালে। লাখো নারী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে। মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যের বিষয়ে দারুণ অগ্রগতি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ এখন অনেক দক্ষ। বাংলাদেশের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে অনেক কিছু। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রচুর বিনিয়োগ।

শিল্প ও সেবা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, অবকাঠামোসহ অন্য খাতেও হয়েছে বড় বিনিয়োগ। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং অন্যসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এখন অনেকটাই সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এর ফলে দেশের অর্থনীতি মজবুত একটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান তৈরির ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এসব অর্জনের প্রায় সবটুকুই এসেছে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে।
আমাদের মোট রাজস্ব আয়ের শতকরা ৬০ ভাগ আসে চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে। দেশের সর্বমোট রপ্তানি বাণিজ্যেও প্রায় ৭৫ ভাগ সংঘটিত হয় চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে। অন্যদিকে আমদানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ হার ৮০ ভাগ। অর্থাৎ চট্টগ্রাম হলো দেশের অর্থনৈতিক সঞ্চালনের জীবনী শক্তি। তাই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সরকার চট্টগ্রামের উন্নয়নকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে।

এই দেশ যতদিন থাকবে অনেক প্রধানমন্ত্রী আসবেন, অনেক প্রধানমন্ত্রী যাবেন, কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনার মতো চট্টলাদরদী প্রধানমন্ত্রী আর পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। আমি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে যে কোনো প্রকল্প নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়েছি, কখনোই তিনি না করেননি। তার হাত ধরে অবহেলিত চট্টগ্রাম আজ কেবল বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম নান্দনিক ও সমৃদ্ধ শহর হতে চলেছে। শুধু শহর নয়, সমগ্র বৃহত্তর চট্টগ্রামে চলছে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ।
কর্ণফুলীর তলদেশে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকায় নির্মিত দুই টিউববিশিষ্ট বঙ্গবন্ধু টানেলটি ইতোমধ্যে উদ্বোধন হয়েছে। ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা অর্থায়নে নির্মাণ করা হচ্ছে দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুমধুম পর্যন্ত রেলপথ। যার মধ্যে দোহাজারী হতে কক্সবাজার পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন, নভেম্বরে এর উদ্বোধনের আশা রয়েছে। কক্সবাজারে সাগরছোঁয়া দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে সম্পন্ন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ কাজ প্রায় সম্পন্ন। এ বছরের মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার কমিউনিকেশন হাব হতে চলা বিমান বন্দরটি উদ্বোধন হতে পারে। মাতারবাড়িতে নির্মিত হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর।

বাঁশখালীর গণ্ডামারা ও মাতারবাড়িতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তব রূপ ধারণ করেছে, আনোয়ারা ও মিরসরাইয়ে দুটি ‘স্পেশাল ইকোনমিক জোন হচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ওয়াসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অসংখ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। চট্টগ্রাম মহানগরীতে সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন সম্পাদিত হয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। বাস্তবায়িত প্রকল্পের মধ্যে বহদ্দারহাট এমএ মান্নান ফ্লাইওভার, মুরাদপুর-লালখান বাজার আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভার, স্টেশন রোডে কদমতলী ফ্লাইওভার, দেওয়ান হাট ওভারপাস, পতেঙ্গা-ফৌজদারহাট মেরিন ড্রাইভ আউটার সিটি রিং রোড, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের আধুনিকায়ন, বায়েজীদ-ফৌজদারহাট বাইপাস রোড অন্যতম।

এছাড়াও অনেক মেগা প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। সমগ্র বৃহত্তর চট্টগ্রামে সড়ক ও সেতু বিভাগ, সওজ, এলজিইআরডি ইত্যাদির মাধ্যমে সম্পাদিত, চলমান অবকাঠামোগত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন বদলে দিচ্ছে পুরো চট্টগ্রামকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায়ই  চট্টগ্রামে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তাঁরই ঐকান্তিকতায় চট্টগ্রাম আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকলে চট্টগ্রামের উন্নয়নের এ অগ্রযাত্রা কখনোই থামবে না।
দেশরতœ শেখ হাসিনার সরকারের দক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ২০০৯-২০১৮ সময়কালে গড়ে ৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ হারে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেকর্ড ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। এরপর করোনা মহামারি শুরু হলে থমকে দাঁড়ায় বিশ্ব অর্থনীতি। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও বাংলাদেশ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছিল। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে নিষেধাজ্ঞা-পাল্টা নিষেধাজ্ঞায় বিশ্ব আবারও অর্থনীতি মন্দার কবলে থাকলেও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ভেঙে পড়তে দেয়নি।
বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকিং এবং অর্থনৈতিক সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি গ্লোবাল রিসার্চ প্রকাশিত ‘দ্য ফ্লাইং ডাচম্যান’-এর ‘এশিয়া’স শপার্স ইন ২০৩০’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্যমতে বাংলাদেশের কনজিউমার মার্কেট যুক্তরাজ্যকে ছাড়িয়ে যাবে। এ পর্যন্ত বাঙালির যত অর্জন তা বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু পরিবার ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই অর্জিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদেরকে একটি জাতীয়তা দিয়েছেন, দিয়েছেন পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি ও স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছে গণতন্ত্র, উন্নয়ন আর অগ্রগতি। ‘তাই বাংলার মানুষ আজ হৃদয়ের গভীর থেকে বিশ্বাস করে- শেখ হাসিনার সরকার, বারবার দরকার। যতদিন শেখ হাসিনার হাতে থাকবে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ।’

লেখক : আবদুচ ছালাম
সাবেক চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও কোষাধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ