বিশ্বমঞ্চে নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে আবারও তুলে ধরলেন বিশ্ববাসীর কাছে। সময়োপযোগী বক্তৃতার মাধ্যমে সম্পন্ন করলেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ১৯তম ভাষণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এটি অনন্য এক অর্জন, যা বিশ্বের আর কারও নেই। এর আগে সবচেয়ে বেশি ১৬ বার ভাষণ দেওয়ার রেকর্ডটি ছিল মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের। নিজের রেকর্ড আবার নিজেই ভাঙলেন তিনি। প্রতিটি ভাষণেই যে দৃঢ়চেতা মনোভাব তিনি দেখিয়েছেন সে কারণেই জাতিসংঘে নিজেকে স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব করে তুলেছেন বিশ্বমঞ্চে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের ৫১তম অধিবেশনে ১৯৯৬ সালের ২৪ অক্টোবর ভাষণ দিয়েছিলেন।

প্রথম ভাষণে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে বলেছিলেন, ‘আজ থেকে ২২ বছর আগে ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে এ মঞ্চে দাঁড়িয়ে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এক মহান ভাষণ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, জাতির জনকের কন্যা হিসেবে এই অনন্য বিশ্ব ফোরামে বক্তব্য রাখার বিরল সম্মান ও সুযোগ আমাকে আবেগাপ্লুত করে তুলেছে। এর মধ্যে বিশ্বে অনেক নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে, পুরনো আদর্শভিত্তিক বিভক্তি ভেঙে পড়েছে, আঞ্চলিক সহযোগিতার সম্পর্ক গভীরতর হয়েছে এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিগত দুই দশকে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের ফলে নতুন শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক জোটের আবির্ভাব হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি ভাষণের মধ্য দিয়ে আমরা যেন খুঁজে পাই ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ময়দানে বাংলা ভাষার প্রথম বলিষ্ঠ ও সাহসী উচ্চারণ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অসামান্য কূটনৈতিক দক্ষতায় ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। জাতিসংঘের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের দুটি শক্তিশালী রাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতা করেছিল। এমন প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার মাত্র আড়াই বছরের মধ্যে জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তি বাংলাদেশের জন্য ছিল বিশাল অর্জন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর অনন্যসাধারণ নেতৃত্বগুণের কারণেই যা সম্ভব হয়েছিল।

জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তির এক সপ্তাহ পর ২৫ সেপ্টেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন বাংলায়। ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘যে মহান আদর্শ জাতিসংঘের সনদে রক্ষিত আছে, আমাদের লাখ লাখ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছে। শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সকল মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের উপযোগী একটি বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য বাঙালি জাতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভাষণ ছিল নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। বরাবরের মতো বাংলায় প্রদত্ত ভাষণে তিনি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ ও নিষেধাজ্ঞা পরিহার, জরুরি অবস্থা মোকাবিলার জন্য আঞ্চলিক খাদ্য ব্যাংক চালু, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি), সন্ত্রাসবাদ ও সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং অন্যান্য বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি একদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যগাথা যেমন তুলে ধরেন, তেমনি একটি বিশ্ব গড়ে তোলার বিশ্বনেতাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার আহবান জানান।

তুলে ধরেন শান্তির অমোঘ বাণী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি যুদ্ধ ও সংঘাতের পথ পরিহার করে মানবজাতির কল্যাণ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আজ আপনাদের সকলের কাছে, বিশ্ব নেতাদের কাছে আমার আবেদন যুদ্ধ ও সংঘাতের পথ পরিহার করুন এবং আমাদের জনগণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থায়ী শান্তি, মানবজাতির কল্যাণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করুন।’ গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়ে বলেন, ‘একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে জনগণের মানবাধিকার রক্ষায় আমরা সম্পূর্ণরূপে অঙ্গীকারবদ্ধ। দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করতে চাই যে, বাংলাদেশ সংবিধানের আলোকে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে যাবে।’
জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের ভাষণে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অভূতপূর্ব সাফল্যগাথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার মডেল উপস্থাপন করে বিশ্ববাসীর কাছে বর্তমানে তিনি একজন উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক। যে উদ্ভাবনা এখন স্বীকৃতি পেয়েছে ‘দ্য শেখ হাসিনা ইনিশিয়েটিভ’ নামে। কমিউনিটি ক্লিনিককে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘বিশেষ সম্মাননায়’ ভূষিত করা হয়। সেইসঙ্গে তিনি নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যা জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের গুরুত্বপূর্ণ পঞ্চম লক্ষ্যের মূল কথা। জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে এখন পর্যন্ত কোনো নারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব দ্রুতই পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

পুরো বিশ্ব আজকে অসহযোগিতা ও অসহনশীলতার দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা বিশ্বকে চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারেÑ এই অমোঘ সত্য শেখ হাসিনা অকপটে তুলে ধরেন। সাম্প্রতিককালে গোটা বিশ্বে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে সেই প্রেক্ষিতে একটি ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজে আরও ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে বিশ্বব্যাপী সবার মধ্যে মানবিক ঐক্যবদ্ধ-ভ্রাতৃত্ববোধের পুনর্জাগরণ। পারস্পরিক নির্ভরশীলতার স্বীকৃতিই কেবল বর্তমান সমস্যার যুক্তিসংগত সমাধান করতে সক্ষম। বর্তমান দুর্যোগ কাটাতে হলে অবিলম্বে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা দরকার। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য সংকট, নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি), সন্ত্রাসবাদ এবং সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অন্যান্য বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক সমস্যার বিষয়গুলো স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেন।

তিনি যুদ্ধের পথ পরিহার করে শান্তির পথ অনুসরণের আহ্বান জানান। মানবজাতির কল্যাণ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য একযোগে কাজ করার গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি। যুদ্ধ ও সংঘাতের পথ কখনই কাম্য নয়, বরং জনগণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থায়ী শান্তি, মানবজাতির কল্যাণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করার মধ্যেই নিহিত আছে বৈশ্বিক সকল সমস্যার সমাধান। সেইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন, বাংলাদেশে সংবিধানের আলোকে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়ে আসছে, ভবিষ্যতেও হবে।
মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও মমত্ববোধের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা যোগ্য পিতার যোগ্য কন্যা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনাও প্রতিবারই সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় বক্তব্য দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্রনায়ক বাংলা ভাষায় কখনো বক্তব্য রাখেননি। বিএনপি দেশপ্রেমের কথা বলে, অথচ বেগম খালেদা জিয়া ১০ বছরের ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদান করেন। তিনি একবারের জন্যও বাংলায় ভাষণ দেননি। এছাড়াও জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের পক্ষে জাতিসংঘে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

তাঁরাও বাংলায় ভাষণ দেননি। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি ভাষণের মাধ্যমে বাংলা ভাষা বিশ্বমঞ্চে সম্মানিত হয়েছে। আমরা পেয়েছি বৈশ্বিক বিভিন্ন সমস্যার যথা উপযুক্ত সমাধান, আলোর পথের দিশা। ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবীতে কেউই চিরকাল থাকবে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার অনন্য রেকর্ড গড়ার মাধ্যমে নিজেকে করে তুলেছেন চিরস্মরণীয়। সেইসঙ্গে অনেক শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জন করে নেওয়া মাতৃভাষা বাংলাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
লেখক :ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া
অধ্যাপক, ট্রেজারার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়