লইট্টা মাছে সরগরম কক্সবাজার

ইলিশের পাশাপাশি সাগরে জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ছে সামুদ্রিক মাছ লইট্টা। বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী চ্যানেলের দক্ষিণ পশ্চিমে সোনাদিয়া পয়েন্ট, উখিয়া-ইনানী উপকূলের রেজু মোহনা, টেকনাফ পাহাড়ের পশ্চিমে ও বাহাড় ছড়া-শামলাপুর উপকুলের নিকটবর্তী পয়েন্টে এখন প্রতিদিন ধরা পড়ছে লইট্যা মাছের ঝাঁক। সাগরের নিকটবর্তী নাদিরারটেক এলাকায় ভোরে ট্রলার থেকে নামছে খাঁচাভর্তি লইট্টা। পাইকারদের মাধ্যমে এসব মাছ চলে যাচ্ছে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে। বেশি বেশি মাছ ধরতে পারায় জেলেপাড়ায়ও বইছে খুশির বন্যা। বাজারে সব ধরনের ক্রেতার ক্রয়সীমার মধ্যেই রয়েছে সামুদ্রিক এই মাছটি।

লইট্টা পরিচিত একটি মাছ। মানুষের কাছে এই মাছের আলাদা কদর রয়েছে। প্রতিবছর এই সময় প্রচুর লইট্টা মাছ ধরা পড়ে জেলেদের জালে। বাজারে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে লইট্টা মাছ দামে সস্তা ও পুষ্টিগুণে ভরা। এই মাছে রয়েছে প্রচুর প্রোটিন ও আয়োডিন। ছোট-মাঝারি ও বড় আকারের লইট্টা মাছে বাজারগুলো এখন জমজমাট।

মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, সামুদ্রিক মাছ খেতে পছন্দ করেন না এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। সামুদ্রিক মাছ খুবই সুস্বাদু। বিশেষ করে লইট্টা মাছে আছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড। এটি মানুষের শরীরের রক্তনালিগুলোকে পরিষ্কার রেখে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়, এ ছাড়া লইট্টা মাছ আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত রোগীর জন্য উপকারী। লইট্টা মাছ কোলন ক্যানসারেরও ঝুঁকি কমায়।

শহরের বিভিন্ন মাছবাজার ঘুরে দেখা গেছে, লইট্যা মাছে সয়লাব বাজারগুলো। বাজারে প্রতিকেজি লইট্টা বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়। কখনো কখনো এর চেয়েও কম দামে বিক্রি হচ্ছে এই মাছ।

মাছ বিক্রেতা কায়সার ইমরান বলেন, ‘আগের তুলনায় এখন সামুদ্রিক যে কোনো মাছের দাম কম। বড় সাইজের লইট্যা মাছ প্রতি কেজি ১০০-১২০ টাকা ও ছোট সাইজের লইট্টা বিক্রি করা হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়। আমি এক মণের বেশি লইট্টা মাছ বিক্রি করেছি।’

ট্রলারের জেলে আকতার কামাল ও গোলাম কাদের জানান, সাগরের বিভিন্ন পয়েন্টে এখন বড় সাইজের লইট্যা মাছ ধরা পড়ছে। জেলেরা জাল ফেললেই ঝাঁকে ঝাঁকে উঠে আসছে লইট্টা। এর সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছও ধরা পড়ছে।

জেলার বাজারঘাটা, বাহারছড়া, কানাইয়া বাজার, কালুর দোকান বাজার, ফায়ার সার্ভিস এলাকা, পানবাজার সড়ক, আদালত সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন সকাল থেকে গভীররাত পর্যন্ত চলছে মাছ বিক্রি।

হোটেল পউষীর বাবুর্চি মোক্তার আহম্দ বলেন, ‘কক্সবাজারের বিভিন্ন রেস্টুরেন্টের জনপ্রিয় খাবার লইট্টা মাছের ফ্রাই। এ ছাড়া লইট্টা মাছের ঝুরা, লইট্টা শুঁটকি ভুনা, লইট্টা মাছের কাপ কেক, লইট্টা ভাজি ও লইট্টা মাছের ভুনাও জনপ্রিয়। পর্যটকদের পছন্দের খাবারের তালিকার শীর্ষে থাকে লইট্টা ফ্রাই। লইট্টা মাছ দুইভাবে খাওয়া যায়। একটি হচ্ছে কাঁচা, যেটা সমুদ্র থেকে তুলে একেবারে তরতাজা খাওয়া হয়। আরেকটা হচ্ছে সমুদ্রের তীরে প্রচুর রোদের মধ্যে শুকিয়ে মাছকে একেবারে শুকনো করে খাওয়া যায়। তাছাড়া লইট্টা শুঁটকি দিয়ে তৈরি যে কোনো রেসিপি খুবই সুস্ব^াদু।’

কক্সবাজারের নারী উদ্যোক্তা শিরিন সুলতানা তোফা বলেন, ‘এখন মৌসুমটা হচ্ছে লইট্টা মাছ খাওয়ার। তাজা লইট্টা মাছ ও এর শুঁটকি সহজলভ্য, তাই পুরো দেশে এই মাছের চাহিদা বেশি। রসনাবিলাসী বাঙালি বিভিন্নভাবে এই মাছের স্বাদ উপভোগ করেন। মাছ বাঙালির পছন্দের খাবারের শীর্ষে। বাঙালির রসনা বিলাসে লইট্টা মাছ ও তার শুঁটকির জুড়ি নেই।’

কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান জানান, এখন লইট্টা মাছের মৌসুম, তাই সাগরে এ প্রজাতির মাছ বেশি ধরা পড়ছে। সহনশীল আহরণ ও নিষিদ্ধ জাল পরিহার করলে ভবিষ্যতে উৎপাদন ও আহরণ আরও বাড়বে। তাছাড়া সাগর থেকে জেলেরা ট্রলার ভর্তি করে লইট্টা নিয়ে সমুদ্র নিকবর্তী উপকূলে আসছেন। লইট্টা মাছের বেশিরভাগের গন্তব্য শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত কারখানা।’

এ বছর কক্সবাজার উপকূলে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার শুঁটকি উৎপাদিত হবে, যার এক-তৃতীয়াংশ লইট্টা শুঁটকি বলে জানান তিনি।

Views: 12