সমুদ্রের নীল পানি ছুঁয়ে নামবে বিমান

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পর দেশের চতুর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হতে যাচ্ছে কক্সবাজার। সাগরের জলঘেঁষা এই বিমানবন্দরের রানওয়ে হবে দেশের দীর্ঘতম। প্রায় ৯ হাজার ফুট দৈর্ঘ্যরে রানওয়েকে ১০ হাজার ৭০০ ফুটে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭০০ ফুট বর্ধিত হয়েছে সমুদ্রে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে উদ্বোধনের পর সমুদ্রের নীল পানি ছুঁয়েই এখানে ওঠানামা করবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট। এতে দেশের পর্যটন অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। শুধু পর্যটন নয়, যোগাযোগ ও অর্থনীতির বিকাশে এই বিমানবন্দর রাখবে যুগান্তকারী ভূমিকা।

কক্সবাজার বিমানবন্দরে যখন কোনো বিমান অবতরণ করবে, তখন ওপর থেকে যাত্রীদের মনে হবে সাগরের মধ্যেই যেন নেমে যাচ্ছে বিমানটি। এমন মনোমুগ্ধ অনুভূতি বিশ্বে খুব বিমানবন্দর আছে। সমুদ্রসৈকতে রানওয়ের সেই স্বপ্ন এখন দৃশ্যমান। এই রানওয়ে হচ্ছে দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে। বোয়িং ৭৭৭ এবং বোয়িং ৭৪৭-এর মতো বড় বিমানগুলো কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণ করতে সক্ষম হবে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, পর্যটন নগরী কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ প্রায় শেষপর্যায়ে। সাড়ে ১৮ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ চলছে। অর্থাৎ এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। তবে দেশে প্রথমবারের মতো সমুদ্রবক্ষের ওপর ১ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। মহেশখালী চ্যানেলের দিকে এ বিমানবন্দর সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য হবে ১০ হাজার ৭০০ ফুট। এরপরের অবস্থানে থাকবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। যার রানওয়ের দৈর্ঘ্য ১০ হাজার ৫০০ ফুট।

সমুদ্রের জলঘেঁষা রানওয়েতে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের বড় বড় উড়োজাহাজ অবতরণ করতে পারবে উল্লেখ করে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম. মফিদুর রহমান বলেন, আগামী ৫০ বছরের চাহিদা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বিশেষ এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। রানওয়ে উদ্বোধনের পর এখানে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ওঠানামা করতে পারবে ৩৮০-এর মতো সুপরিসর এয়ারবাস। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কক্সবাজার বিমানবন্দরে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। বসানো হয়েছে ৩০০ কেজি ওজনের ও ৪ টন ওজনের সিসি ব্লক। আর বিমান ওঠানামার জন্য সমুদ্রের ২ হাজার ২০০ ফুট অংশে বসানো হচ্ছে লাইট। প্রকল্পের আওতায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব থেকে রানওয়ের সুরক্ষার জন্য সমুদ্র তীর প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিতে চারপাশে রাস্তাও নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে কক্সবাজার বিমানবন্দরে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০টি যাত্রীবাহী বিমান ও ৬ থেকে ৮টি কার্গো বিমান ওঠানামা করছে। রাতে বিমান ওঠানামার জন্যও বন্দরটি প্রায় প্রস্তুত। সমুদ্রগর্ভে আরও লাইটিং সিস্টেম স্থাপনের কাজ চলছে। বর্তমানে ইউএস বাংলা, নভোএয়ার, এয়ার অ্যাস্ট্রা ও বাংলাদেশ বিমান ফ্লাইট পরিচালনা করছে। উদ্বোধনের পর কক্সবাজার থেকে সরাসরি পূর্ণ লোডে সুপরিসর আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা, সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন অ্যাপ্রোচ ক্যাট-১ লাইটিং সিস্টেম সংস্থাপনের ফলে রাত্রিকালীন বিমান পরিচালনা, বিমানবন্দরে যাত্রী ও কার্গো পরিবহণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আকাশপথে দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপন সম্ভব হবে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজার রানওয়ে সম্প্রসারণ কাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় রিফুয়েলিং হাব হিসেবে গড়ে উঠবে কক্সবাজার বিমানবন্দর। সরকার দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে সারা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের একটা কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চায়। সেক্ষেত্রে কক্সবাজার হবে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সি-বিচ ও পর্যটন কেন্দ্র এবং অত্যন্ত আধুনিক শহর। যাতে আর্থিকভাবেও আমাদের দেশ অনেক বেশি লাভবান হবে।

১৯৫৬ সালে অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর হিসেবে কক্সবাজার বিমানবন্দর যাত্রা শুরু করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বিমানবন্দরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সংস্কার করে আবার বিমানবন্দর সচল করা হয়। পরে ধাপে ধাপে কক্সবাজার বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন করা হয়েছে। এরপর বিমানবন্দরটিকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উন্নীত করতে ২০১২ সালে পরিকল্পনা নেয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। সেই মাস্টারপ্ল্যানে প্রথম ও প্রধান কাজ রানওয়ে ও টার্মিনাল সম্প্রসারণ। দু’টি কাজই শুরু হয় ২০২১ সালে। চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড পায় রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ। উল্টোদিকে জায়গা না থাকা এবং দৃষ্টিনন্দন একটি রানওয়ে করার পরিকল্পনায় সমুদ্রের বুকে রানওয়ে করার সিদ্ধান্ত হয়।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, সমুদ্রবক্ষের ওপর ১ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫৬৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং আন্তর্জাতিক যাত্রী ভবন নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় সরকার। যার পুরোটাই অর্থায়ন করছে বেবিচক। ২০২১ সালে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (সিসিইসিসি) সঙ্গে চুক্তি করে সংস্থাটি। এই কোম্পানি চীনের আরেক প্রকৌশল কোম্পানি চাংজিয়াং ইচাং ওয়াটার ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরোকে (সিওয়াইডব্লিউসিবি) সঙ্গে নিয়ে ২০২১ সালের আগস্ট মাসে প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ শুরু করে।

কক্সবাজার রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক লি গুয়াংচি বলেন, সমুদ্রের যে মোহনা, সেটি ভরাট করে রানওয়ে করা হয়েছে। বিমানবন্দরের কাজ নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়েছে। সাগরের পানি নিষ্কাশন করে সেখানে জমির উন্নয়ন, বাঁধ বানানো, সেগুলোর সুরক্ষা, সীমানা প্রাচীর, সাগর তীরে রানওয়ের ফুটপাত নির্মাণ ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন করে সমুদ্র জলরাশি বিস্তৃত রানওয়ের ফলে কক্সবাজার বিমানবন্দরে বড় বড় উড়োজাহাজ উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারবে।

Views: 15