বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন যুগের সূচনা

অনেক আলাপ-আলোচনা এবং বিচার-বিশ্লেষণ শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভারতীয় মুদ্রা রুপিতে লেনদেন শুরু হয়েছে। গত ১১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার আনুষ্ঠানিকভাবে দুই দেশের মধ্যে রুপিতে লেনদেন শুরুর ঘোষণা দেন। রুপিতে লেনদেনের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা রুপিতে আমদানি-রপ্তানি শুরুও করে দিয়েছেন। এ থেকে বোঝা যায় যে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন করার জন্য উদগ্রীব হয়েই ছিলেন।

প্রাথমিকভাবে শুধু ভারতীয় মুদ্রা রুপিতে লেনদেন শুরু হলেও আগামী সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশি টাকায় লেনদেন শুরু হবে। ফলে মূলত তখন থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপক্ষীয় লেনদেন শুরুর পূর্ণ মাত্রা পাবে। সত্যি বলতে কি, এই পদক্ষেপ অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। বাংলাদেশের জন্য যেহেতু বিষয়টি একেবারেই নতুন ধারণা, তাই হয়তো কিছুটা সময় লেগেছে। দেরিতে হলেও এ ধরনের লেনদেন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা গেছে, এটাই আশার কথা।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রুপি এবং টাকায় লেনদেন করতে পারলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয় ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে। স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন থেকে যেসব প্রত্যক্ষ সুবিধা পাওয়া যাবে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে—১. ডলার সংকট কাটিয়ে উঠতে কিছুটা হলেও কাজে আসবে; ২. সরাসরি ডলারের ওপর থেকে চাপ কমবে—অন্তত যে পরিমাণ লেনদেন স্থানীয় মুদ্রায় সম্পন্ন করা হবে, সেই পরিমাণ চাপ রিজার্ভের ওপর থাকবে না; ৩. ডলার সংকটের কারণে এলসি খোলা, কাঁচামালসহ অত্যাবশ্যক পণ্য আমদানিতে যে সমস্যা দেখা দিয়েছিল সেটা অনেকটাই কেটে যাবে। পরোক্ষ সুবিধার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের সরাসরি আমদানির ক্ষেত্রে সৃষ্ট সমস্যা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ।

আমরা স্বীকার করি আর না করি, আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা উন্নত বিশ্বের রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে সরাসরি আমদানি করতে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। অধিকসংখ্যক ব্যাংকের সঙ্গে করেসপনডেন্ট রিলেশনশিপ ও কাউন্টারপার্টি লিমিট না থাকায় আমাদের দেশের ব্যাংকগুলো আমদানিকারকের পক্ষে সরাসরি এলসি খুলতে পারে না। ফলে তাদের হংকং বা সিঙ্গাপুরে অবস্থিত মধ্যস্বত্বভোগকারী কম্পানির মাধ্যমে আমদানি করতে হয়। এ ধরনের আমদানির ক্ষেত্রে একদিকে যেমন আমদানিমূল্য অনেক বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকিও কয় নয়। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন চালু হওয়ায় এখন আমাদের দেশের আমদানিকারকরা ভারতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সেসব পণ্য আমদানি করতে পারবেন।

উল্লেখ্য, ভারতে অনেক কম্পানি সেসব পণ্য উন্নত বিশ্ব থেকে সহজ শর্তে সরাসরি আমদানি করে থাকে। বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন যুগের সূচনাবাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যদি আমেরিকার মারুবেনি করপোরেশন থেকে সয়াবিন বা কানাডা থেকে মসুর ডাল বা চিলির কোডেলকো থেকে কপার আমদানি করতে চান, তাহলে সেসব কম্পানির পক্ষে সরাসরি এলসি খোলা আমাদের দেশের ব্যাংকের পক্ষে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেশ কঠিন কাজ। কোনো রকমে এলসি খুলতে পারলেও সেই এলসি তিন-চার ব্যাংক হয়ে যখন এখানকার রপ্তানিকারকের হাতে পৌঁছাবে, তখন তার খরচ অনেক বৃদ্ধি পাবে। ফলে উন্নত বিশ্বের রপ্তানিকারকরা রপ্তানির আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অথচ ভারতের অনেক ব্যবসায়ী সরাসরি এসব পণ্য আমদানি করে থাকেন। রুপিতে লেনদেন করার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এখন আমাদের দেশের আমদানিকারকরা রুপিতে এলসি খুলে ভারতের সেসব ব্যবসায়ীর কাছ থেকে খুব সহজেই আমদানি করতে পারবেন। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন যে ডলারে এলসি খুলেও তো সেটি করা সম্ভব। অবশ্যই সম্ভব, কিন্তু সে ক্ষেত্রে ডলারসংক্রান্ত যে জটিলতা বা সংকট আছে সেটি থেকেই যাবে। আমাদের দেশের আমদানিকারকরা এখন রুপিতে যত সহজে এলসি খুলতে পারবেন, ডলারে এলসি খুলতে তেমনটি পারবেন না। ফলে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন শুরু হওয়ায় ক্রস-বর্ডার ট্রেড শুধু অবারিতই হয়নি, যথেষ্ট সহজও হয়েছে। এর বহুমাত্রিক সুবিধা ব্যবসায়ীরা আগামী দিনে নিশ্চয়ই পাবেন।

অনেকেই বলার চেষ্টা করছেন যে ডলার একটি শক্তিশালী মুদ্রা এবং সে তুলনায় ভারতীয় রুপি যথেষ্ট দুর্বল মুদ্রা। ফলে রুপিতে আমদানি-রপ্তানি করে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। তাঁদের যুক্তি হচ্ছে, রুপি পুনরায় ডলারে রূপান্তর করার কারণে আর্থিক ক্ষতি হবে। বিষয়টি মোটেই তেমন নয়। প্রথমত, বাংলাদেশ ডলারে কাঁচামাল আমদানি করে তা দিয়ে উত্পাদিত পণ্য ভারতে রপ্তানি করবে তেমন সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও তা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। দ্বিতীয়ত, ভারত থেকে রুপিতে কাঁচামাল আমদানি করে তা দিয়ে উত্পাদিত পণ্য ডলারে রপ্তানি করতে পারলে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা অপেক্ষাকৃত দুর্বল মুদ্রায় আমদানি করে শক্তিশালী মুদ্রায় রপ্তানি করলে লাভই বেশি হবে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের টাকার সঙ্গে ভারতীয় রুপির বিনিময় হার নির্ধারণ করা হবে ক্রস কারেন্সি পদ্ধতি প্রয়োগ করে, যেখানে ডলারকেই ভেহিকল কারেন্সি হিসেবে ব্যবহার করা হবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ডলারের মূল্য ওঠানামার সঙ্গে টাকা এবং রুপির বিনিময় হারও সমন্বয় হবে। এতে ব্যবসায়ীদের এক্সচেঞ্জ লাভ-লোকসানের কোনো সুযোগ নেই। তা ছাড়া ভারতীয় রুপি বা বাংলাদেশি টাকায় লেনদেন চালু করার অর্থ এই নয় যে ভারতের সঙ্গে ডলারে লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে। ভারতের সঙ্গে ডলারে আমদানি-রপ্তানি আগের মতোই চালু থাকবে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন চালু করা হয়েছে মাত্র। দুটি পথই খোলা থাকবে। ফলে যে যেভাবে বাণিজ্য করে সুবিধা পাবে, সে সেভাবেই করবে। সুতরাং এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে ভারতের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন চালু হওয়ায় ক্ষতির তেমন কিছুই নেই, কিন্তু লাভের অনেক কিছুই আছে।

একটি বিষয় অবশ্য এখানে বিবেচনায় নেওয়ার আছে, তা হচ্ছে ভারতের সঙ্গে আমাদের বিশাল অসম বাণিজ্য। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য মতে, ভারত থেকে বছরে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের আমদানি হয়। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ ভারতে বছরে রপ্তানি করে মাত্র দুই বিলিয়ন ডলারের মতো। এটি শুধু রুপিতে লেনদেনের বিষয় নয়। স্বাভাবিকভাবেই এত বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। তাই ভারতে আমাদের রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি করার কোনো বিকল্প নেই। ভারতে বাংলাদেশি যেসব পণ্যের বাজার আছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সেখানে রপ্তানি বৃদ্ধির সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। যদি সরাসরি রপ্তানি করতে সমস্যা হয়, তাহলে ভারতে সাবসিডিয়ারি বা সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যেমনটি আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক কম্পানি করে থাকে। বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট বিধায় এখানে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই।

বর্তমান বিশ্বে ডলার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মুদ্রা হলেও এই মুদ্রা নিয়ে বিরাজ করছে বেশ অনিশ্চয়তা। ফলে অনেক দেশই ডলার এড়িয়ে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন শুরু করেছে এবং ডি-ডলারাইজেশন নিয়ে বেশ জোরেশোরেই আলোচনা চলছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের মতো, যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এত বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য শুধু ডলারের ওপর নির্ভর করে সম্পন্ন করা মোটেই সমীচীন নয়। একাধিক বিকল্প পদ্ধতি থাকা বাঞ্ছনীয়। তা ছাড়া প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সব সময়ই স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ রাখতে হয়। বিশ্বের অনেক দেশই তাদের প্রতিবেশী বা আঞ্চলিক দেশের সঙ্গে অনেক আগে থেকেই স্থানীয় মুদ্রায় ক্রস-বর্ডার লেনদেন শুরু করেছে। আমেরিকা ও কানাডায় তো এই লেনদেন একেবারে নিয়মিত ঘটনা। ইউরোপের অনেক দেশ, এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়ন-বহির্ভূত অনেক দেশ স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন করছে। লাতিন আমেরিকার চিলি, পেরু, মেক্সিকো ও কলম্বিয়া স্থানীয় মুদ্রায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্রস-বর্ডার লেনদেন সম্পন্ন করে থাকে। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থাত্ টাকা ও রুপিতে লেনদেন শুরু করা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী পদক্ষেপ, যা বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।

লেখক : নিরঞ্জন রায়, সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা