বৈশ্বিক জলবায়ু চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেখ হাসিনার প্রভাব

ক্রমবর্ধমান জলবায়ু চ্যালেঞ্জের মুখে, বিশ্বনেতারা ক্রমবর্ধমানভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। এই বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন ‘ট্রেইলব্লেজার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, জলবায়ু কর্মের দায়িত্বে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। তাঁর দূরদর্শী নীতি, অটুট দৃঢ়তা এবং টেকসই পরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে জলবায়ু সহনশীলতার একটি রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই নিবন্ধটিতে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় শেখ হাসিনার অসামান্য ভূমিকা, তাঁর বৈশ্বিক স্বীকৃতি এবং তাঁর নেতৃত্বে বাস্তবায়িত পরিবর্তনমূলক উদ্যোগগুলোকে তুলে ধরা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের বিশ্ব এবং এর বাসিন্দাদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একটি নিম্নাঞ্চলীয় ব-দ্বীপ দেশ হিসেবে, বাংলাদেশ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, চরম আবহাওয়ার ঘটনার বৃদ্ধি এবং কৃষি উৎপাদনশীলতার ক্ষতিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের জন্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও অভিযোজনকে তাঁর সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশের নেত্রী হিসেবে, শেখ হাসিনা জলবায়ু ন্যায়বিচারের নিশ্চিতের বিষয়টি এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর উদ্বেগের কথা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরেছেন। তিনি গ্লোবাল সাউথের পক্ষে শুধু একজন সোচ্চার কণ্ঠ হয়েই ওঠেননি, উন্নত দেশগুলোকে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (UNFCCC)-এর অধীনে তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করার জন্য এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অভিযোজন এবং প্রশমন প্রচেষ্টার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানিয়ে আসছেন। ঐতিহাসিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের জন্য উন্নত দেশগুলোর আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা ধারাবাহিকভাবে ‘সাধারণ কিন্তু আলাদা দায়িত্বের’ নীতির ওপর জোর দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তন জনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা কামনা করেছেন। ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (CVF), একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে একত্রিত করে– এ উদ্যোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে, বাংলাদেশ সিভিএফ-এর এজেন্ডাকে এগিয়ে নিতে, জলবায়ু সম্পর্কে শক্তিশালী পদক্ষেপের গ্রহণের ক্ষেত্রে, আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং দুর্বল দেশগুলোতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তদুপরি, শেখ হাসিনা জলবায়ু সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সমমনা দেশ এবং সংস্থাগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় চালিয়ে যাচ্ছেন।

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন (সিওপি) এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মতো আন্তর্জাতিক ফোরামে তাঁর অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উদ্বেগগুলোকে তুলে ধরতে এবং সব দেশের উচ্চাভিলাষী জলবায়ু প্রতিশ্রুতির পক্ষে সমর্থন করার প্ল্যাটফর্ম প্রদান করেছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অক্লান্ত পরিশ্রম এবং দৃষ্টান্তমূলক নেতৃত্ব তাঁকে আন্তর্জাতিক প্রশংসা অর্জন করতে সহায়তা করেছে। গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যাকশনে তাঁর অবদান জাতিসংঘের চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ পুরস্কার, গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড এবং চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের মাধ্যমে স্বীকৃত হয়েছে। এই প্রশংসাগুলো জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং বিশ্বনেতাদের মধ্যে সম্মিলিত পদক্ষেপকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাবশালী ভূমিকা তুলে ধরেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন জনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রূপান্তরমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্ম পরিকল্পনা (BCCSAP), অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি ব্যাপক কাঠামো। BCCSAP জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি, পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তির সম্প্রসারণ, টেকসই নগর উন্নয়ন এবং ইকো সিস্টেম সংরক্ষণের জন্য প্রোগ্রামগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জাতীয় এজেন্ডার কেন্দ্রে টেকসই উন্নয়নকে স্থান দিয়েছেন। তাঁর দূরদর্শী নীতি ও কর্মসূচির মাধ্যমে, তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশগত টেকসইতার মধ্যে ভারসাম্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে একটি মডেল হিসেবে তুলে ধরেছেন। জলবায়ু-স্মার্ট কৃষি, টেকসই নগর পরিকল্পনা এবং নবায়নযোগ্য শক্তির উন্নয়নে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও প্রশংসা অর্জন করেছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আগ্রহকে আকৃষ্ট করেছে। শেখ হাসিনার প্রচেষ্টার ফলে ডেনমার্ক, জাপান এবং নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলোর সহযোগিতায় বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের উন্নয়ন এবং পরিচ্ছন্ন শক্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অংশীদারিত্ব বাংলাদেশকে কার্বন নিঃসরণ কমাতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে সাহায্য করেছে।

তাছাড়া, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ু সহনশীলতাকে একীভূত করার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্ম পরিকল্পনা (BCCSAP) এবং ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ হলো ব্যাপক কাঠামো, যা জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা করার মাধ্যমে বিভিন্ন সেক্টরে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করেছে। সোলার হোম সিস্টেমের প্রবর্তন এবং সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্কেলিং পরিষ্কার এবং টেকসই শক্তির উৎসগুলোতে অ্যাক্সেস সম্প্রসারণ, গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাস এবং শক্তি সুরক্ষার উন্নতিতে উল্লেখযোগ্যভাবে অবদান রেখেছে। এই উদ্যোগগুলো জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অন্যান্য দেশের জন্য অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করেছে।

জলবায়ু-সম্পর্কিত বিপদের বিরুদ্ধে সহনশীলতা সৃষ্টিতে শেখ হাসিনার সক্রিয় দৃষ্টিভঙ্গির আরেকটি প্রমাণ বাংলাদেশের শক্তিশালী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন, বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক অভিযোজন কর্মসূচি অগণিত জীবন বাঁচিয়েছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব কমিয়েছে।

সুন্দরবন, যা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, অপরিসীম পরিবেশগত তাৎপর্য ধারণ করে রয়েছে।

শেখ হাসিনা বন উজাড়, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমিত করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই ভঙ্গুর ইকো সিস্টেমকে রক্ষা করার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

শেখ হাসিনা তাঁর নেতৃত্বের মাধ্যমে শুধু বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থানকে উন্নীত করেননি, বরং অন্য দেশগুলোকেও একটি যৌথ দায়িত্ব হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার দিতে অনুপ্রাণিত করেছেন। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রতি তাঁর দৃঢ় প্রতিশ্রুতি এবং সমতা ও অন্তর্ভুক্তির নীতিগুলো বিশ্বব্যাপী নেতা ও কর্মীদের কাছে অনুরণিত হয়েছে এবং সহযোগিতা এবং সম্মিলিত পদক্ষেপের মনোভাবকে উৎসাহিত করেছে।

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় শেখ হাসিনার নিরলস প্রচেষ্টা এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব বাংলাদেশকে বৈশ্বিক জলবায়ু কর্মকাণ্ডে শীর্ষস্থানে রেখেছে। তাঁর রূপান্তরমূলক উদ্যোগ এবং টেকসই নীতি শুধু দেশের দুর্বল জনসংখ্যাকেই রক্ষা করেনি বরং অন্যান্য দেশকে অনুপ্রাণিত করেছে। বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন টেকসইতার প্রতি শেখ হাসিনার অসাধারণ প্রতিশ্রুতি আশার আলো দেখিয়েছে এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের শক্তির প্রমাণ হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশের সহনশীলতা এবং দৃঢ় সংকল্পের সঙ্গে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায়, জাতি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আরও বড় মাইলফলক অর্জন করতে প্রস্তুত। আমরা যখন এগিয়ে যাচ্ছি, তখন সারা বিশ্বের সরকার, এবং সংস্থা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অসাধারণ নেতৃত্বের দ্বারা পরিচালিত বাংলাদেশের টেকসই অনুশীলনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তা অনুকরণ করছে। একই সঙ্গে তাঁর নেতৃত্বে আমরা আমাদের বিশ্ব এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ এবং আরও সহনশীল ভবিষ্যতের রেখে যাওয়ার কাজ করতে পারি।

লেখক: ড. প্রণব কুমার পান্ডে
অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়