বাড়ছে রেলপথ ॥ বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে

আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ-ভারতের ১০টি সীমান্ত পথে হচ্ছে রেল কানেক্টিভিটি। এর মধ্যে দর্শনা-গেদে, বেনাপোল-পেট্রাপোল, রোহানপুর-সিঙ্গাবাদ, বিরল-রাধিকাপুর ও চিলাহাটি-হলদিবাড়ী এই ৫টি সীমান্তপথে বর্তমানে ট্রেন চলাচল করছে। এ ছাড়া শাহবাজপুর-মহিশাসন, বুড়িমারী-চ্যাংড়াবান্দা ও মোগলহাট-গিতলদহ এই ৩টি রেলপথ সংস্কারে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন করে আখাউড়া-আগরতলা ও ফেনী-বিলোনিয়া ২টি রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। এই রেলপথগুলো চালু হলে আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে।এ ছাড়া ভারত, নেপাল, ভুটানের মধ্যে পণ্য ও যাত্রীবাহী রেল যোগাযোগ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়।

২০১৭ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ভারতের অর্থায়নে আখাউড়া-আগরতলা রেলপথটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এর ফলে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগ বৃদ্ধিসহ আন্তর্জাতিক ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়েতে যুক্ত হবে বাংলাদেশ।

এ ব্যাপারে রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সেই ব্রিটিশ আমল থেকে রেল চলাচল করত। কিন্তু ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় এই রেলপথগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এই বন্ধ রেললাইন সংস্কার করে পুনরায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেলসংযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক রেলপথ ট্রান্স এশিয়া রেলওয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে এই রেলপথ ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া নতুন করে আখাউড়া-আগরতলা ও ফেনী-বিলোনিয়া ২টি রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে।’ এর ফলে দুই দেশের মধ্যে রেলপথে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পণ্য রপ্তানি-আমদানি প্রসার লাভ করবে বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামলে ৮টি স্থান দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে সরাসরি যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করত। এগুলো হলো, বাংলাদেশের দর্শনা ও ভারতের গেদে, বাংলাদেশের বেনাপোল থেকে ভারতের পেট্রাপোল, বাংলাদেশের রোহনপুর থেকে ভারতের সিঙ্গাবাদ, বাংলাদেশের বিরল থেকে ভারতের রাধিকাপুর, বাংলাদেশের শাহবাজপুর থেকে ভারতের মহিশাসন, বাংলাদেশের চিলাহাটি থেকে ভারতের হলদিবাড়ী, বাংলাদেশের বুড়িমারি থেকে ভারতের চ্যাংড়াবান্দা ও বাংলাদেশের মোগলহাট থেকে ভারতের মহিশাসন পর্যন্ত রেলপথ ছিলো। এ সব রেলপথের বেশিরভাগেই ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় বন্ধ হয়ে যায়। কিছু আবার ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ও পরে বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে পাঁচটি রেলপথ চালু হলেও এখনো তিনটি রেলপথ বন্ধ রয়েছে বলে রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান।

দর্শনা-গেদে ॥ বাংলাদেশের দর্শনা থেকে ভারতের গেদে পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার রেলপথ দিয়ে বর্তমানে যাত্রীবাহী এবং পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করছে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় এই পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে মালবাহী ট্রেন চলাচলের মাধ্যমে রেলপথটি পুরনায় চালু হয়। ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে এই রেলপথে ঢাকা-কলকাতা যাত্রীবাহী মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল করছে। এই রেল লাইন ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের অন্তর্ভুক্ত।

বেনাপোল-পেট্রাপোল ॥ বাংলাদেশের বেনাপোল থেকে ভারতের পেট্রাপোল পর্যন্ত ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথটি বাংলাদেশ ও ভারতের রেলওয়ের একটি অপারেটিং ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্ট। ১৯৬৫ সালে পর থেকে এই পয়েন্টটি পরিত্যক্ত ছিল। এর পর ২০০২ সালে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের জন্য পুনরায় চালু করা হয়। ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর এই রেলপথে খুলনা-বেনাপোল-কলকাতা রুটে বন্ধন এক্সপ্রেস নামে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে রেল সংযোগসহ আন্তর্জাতিক ট্রান্স-এশিয়ান রেলপথে যুক্ত হবে এই রেল লাইন।

রোহনপুর-সিঙ্গাবাদ ॥ বাংলাদেশের উত্তর সীমান্ত রোহনপুর থেকে ভারতের সিঙ্গাবাদ পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথটি। নেপালের সীমান্ত স্টেশন রাক্সাউল ও জগবানীর সঙ্গে যথাক্রমে বীরগঞ্জ ও বিরাটনগর স্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত। ১৯৯০ সাল থেকে এই লাইনে নিয়মিত মালবাহী ট্রেন চলাচল করছে। এটিও ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়েতে যুক্ত হবে।

বিরল-রাধিকাপুর ॥ বাংলাদেশের বিরল থেকে ভারতের বাধিকাপুর পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্ত রেলপথটি ২০০৫ সাল পর্যন্ত নেপালের সঙ্গে ট্রানজিট কার্যক্রমে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু ২০০৫ সালে ভারতের অংশের রেলপথ ব্রডগেজে রূপান্তরিত করায় তা বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ অংশে পার্বতীপুর-বিরল-বিরল বর্ডার পর্যন্ত রেলপথ ডুয়েলগেজে রুপান্তর করে ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল থেকে রেলপথটি চালু করা হয়। এই রেলপথ চালুর ফলে ১২ বছর পর বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়।

চিলাহাটি-হলদিবাড়ী ॥ বাংলাদেশের চিলাহাটি থেকে ভারতের হলদিবাড়ী পর্যন্ত ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্ত রেলপথটি ১৯৬৫ সালে বন্ধ হয়ে যায়। পরে রেলপথটি ব্রডগেজে উন্নতি করে ২০২০ সালে ১৭ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। এর ২০২১ সালের ১ আগস্ট মালবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এর পর ২০২২ সালের ১ জুন বাংলাদেশের ঢাকা থেকে ভারতের নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত এই পথে চালু হয় তৃতীয় আন্তঃদেশীয় ট্রেন ‘মিতালী এক্সপ্রেস’। রেলপথটি ভুটানের সীমান্তবর্তী স্টেশন হাসিমাড়া পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা সম্ভব।

শাহবাজপুর-মহিশাসন : বাংলাদেশের সিলেটের শাহবাজপুর থেকে ভারতের মহিশাসন পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার সীমান্ত রেলপথটি ২০০২ সালের ৭ জুলাই বন্ধ হয়ে যায়। এই রেলপথে দিয়ে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করত। এটিও ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অংশ। কুলাউড়া-শাহবাজপুর বর্ডার পর্যন্ত ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পটি ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি)র আওতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থেকে শাহবাজপুর পর্যন্ত ৫১ কিলোমিটার রেলপথ পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে।

২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই রেলপথটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। রেলপথটিকে ডুয়েল গেজে রূপান্তরিত করে আরো ৯ কিলোমিটার বাড়িয়ে ভারতের করিমগঞ্জ পর্যন্ত নেওয়া হলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ও ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়।
বুড়িমাড়ি-চেংড়াবান্ধা ॥ বাংলাদেশের বুড়িমারি থেকে ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রেলপথটি ১৯৭১ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে। এটি ভুটানের সঙ্গে ট্রানজিট কার্যক্রমের একটি সম্ভাব্য রেলপথ হতে পারে। এই রেলপথকে দুইদিক দিয়ে সংযুক্ত করা যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশের পার্বতীপুর থেকে কাউনিয়া ও লালমনিরহাট হয়ে বুড়িমারি পর্যন্ত মিটার গেজ রেলপথ থেকে ডুয়েল গেজে রূপান্তর অথবা বগুড়ার সান্তাহার থেকে লালমনিরহাট হয়ে বুড়িমারী পর্যন্ত মিটারগেজ রেলপথ ডুয়েল গেজে রূপান্তর, বুড়িমারি স্টেশন থেকে ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা পর্যন্ত নতুন ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ-ভারত ভুটানের মধ্যে পণ্য পরিবহন সহজ হবে রেলওয়ে সূত্র জানায়।

মোগলহাট-গিতলদহ ॥ বাংলাদেশের লালমনিরহাটের মোগলহাট থেকে ভারতের পশ্চিমবেঙ্গর কোচবিহার জেলার গীতলদহ পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার রেলপথটি ১৯৬৫ সালে ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধের পর বন্ধ হয়ে যায়। স্বাধীনতার পরে দুই-একটি মালগাড়ি চললেও ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় রেললাইনের দুই পাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপর বন্ধ হয়ে যায় এই পথ। রেলপথ পুনরায় চালু হলে ভুটান ও আসমের একটি বড় অংশের ব্যবসায়ীদের এই পথ দিয়ে পণ্য পরিবহন সুবিধাজনক হবে। পরে যাত্রী পরিবহনও সম্ভব হবে বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়।

আখাউড়া-আগরতলা রুট ॥ বাংলাদেশের আখাউড়া থেকে ভারতের আগরতলা পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। নতুন এই ইন্টারচেঞ্জ লাইন চালুর করার জন্য বাংলাদেশের গঙ্গাসাগর স্টেশন থেকে ভারতীয় বর্ডার পর্যন্ত বাংলাদেশের অংশে ১০ কিলোমিটার এবং ভারতের অংশে ৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যৌথভাবে এই রেলপথটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী। বর্তমানের রেলপথের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে রেলপথটি চালু করা হবে বলে রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান।

ফেনী-বিলোনিয়া ॥ বাংলাদেশের ফেনী থেকে ভারতের বিলোনিয়া পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার রেলপথ পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ভারতের রাজ্য ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য এ রেললাইন ব্যবহৃত হবে। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী এ রেললাইনের সংস্কারে যাবতীয় ব্যয় বহন করবে ভারত সরকার। আসামের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ১৯২৯ সালে এ রেলপথ চালু করে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি। প্রথমদিকে এ লাইনে মালবাহী ট্রেন চলাচল করলেও ১৯৪৭ সালের পরে রেলপথটি বন্ধ হয়ে যায়।