মৎস্য ব্যবসায় নারী

ইচ্ছে শক্তি মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে। ঘরে ঘরে মেয়েরা তার প্রমাণ দিচ্ছে। তারা শিক্ষিত হচ্ছে, উপার্জন করছে, সংসার সামলাচ্ছে, সন্তানও পালন করছে। আর উপার্জন শুধু চাকরির মাধ্যমেই নয় বরং নিজে উদ্যোক্তাও হচ্ছেন। ফলে, নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যের জন্যও কাজের ব্যবস্থা করছেন। এমনকি চ্যালেঞ্জিং কাজ মাছ বিক্রিও করছেন। ভ্রু কুঁচকে গেল! আমাদের এই পরনিন্দার সমাজে একটা শিক্ষিত মেয়ের মাছের ব্যবসা করা দুঃসাহসী পদক্ষেপ। এমনই দুজনের মাছ ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার কথা জানাচ্ছেন- শিউলী আহমেদ

আমেনা আক্তার রোমানা
কুমিল্লার মেয়ে রোমানা আগানগর ডিগ্রী কলেজ থেকে ২০১০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ঢাকায় একটি আইটি ফার্মে রিসিপশনে চাকরি নেন। আইটিতে কাজ করার আগ্রহ থেকে কম্পিউটার সাইন্সে ৪ বছরের ডিপ্লোমা এবং একই প্রতিষ্ঠানে ৫ বছর ‘ক্লাইন্ট সাপোর্ট’ বিভাগে চাকরি করেন। কোভিডের সময় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খুব হতাশ হয়ে যান পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে। সে সময় এক আত্মীয়ের সঙ্গে কথোপকথনে জানতে পারেন অনলাইনে ‘উই’ নামে একটা গ্রুপের সঙ্গে সে যুক্ত আছে । সেই গ্রুপে লাখো উদ্যোক্তা। কচুরলতি থেকে পেঁয়াজ বাটা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
রোমানার বিয়ে হয় ২০১৮ সালে, চাঁদপুরে। ঢাকায় এসে কখনো মাছ কিনে খেতে হয়নি তাকে। সব সময় শশুর বাড়ি থেকেই মাছ নিয়ে আসেন। ঠিক করলেন মাছ নিয়েই কাজ করবেন। তখনো ‘উই’তে হাতে গোনা ২/৩ জন মাছ নিয়ে কাজ করেন। রোমানা বলেন,‘আমার বর শুনে হাসে- বলে পাগল নাকি! মাছ বাজারে গিয়ে দেখে কেনার জিনিস। অনলাইনে শুধু ছবি দেখে মাছ কিনবে কে?’

স্বামীর কথায় একটু হতাশ হলেও দমে যাননি রোমানা। মাথায় ঘুরঘুর করছে রেডি-টু-কুক সার্ভিস। অনলাইনে পেজ খুলেন- ‘মাছ আছে’। সেখানে নিজের বাসার জন্য কেনা কিছু মাছের ছবি পোস্ট দিলেন। ৩ দিন পর প্রথম অর্ডার পেয়ে গেলেন। কিন্তু ডেলিভারি, প্যাকেজিং সম্পর্কে কোনো অভিজ্ঞতা নেই তার। রোমানা বলেন, ‘প্রথম অর্ডারের সেই অনুভূতি কখনোই কাউকে বলে প্রকাশ করতে পারব না। সেদিন লাভ ছিল টাকার অংকে শূন্য। বরং নিজের পকেট থেকে ৬৫ টাকা গচ্চা দিতে হলো। কিন্তু ক্রেতা বুঝতেই পারেননি যে, উনি আমার প্রথম গ্রাহক।

উনার ফিডব্যাক মনে হলে আজো মন খুশিতে কেঁদে ওঠে। সেই আপু এরপর আমার থেকে মাছ নিয়েছেন আরো ১৭-১৮ বার। আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আমার পুলিশ বর শুরুতে একটু লজ্জা পেলেও পরবর্তীতে সাপোর্ট দিয়েছেন। মাছ ওজন দেওয়ার মেশিনটা সেই আমাকে ২৩০০ টাকায় কিনে দিয়েছিল। আমার উদ্যোগের প্রথম ইনভেস্ট। এখন কোথাও গেলে তিনি নিজেই সবার আগে বলেন, আমার বউ উদ্যোক্তা। অনলাইনে নদীর মাছ বিক্রি করে।’
মাছওয়ালি, জাইল্লা আরও অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছে রোমানাকে। তবু থেমে যাননি। তার এখন ১০০০+ গ্রাহক। গত বছর সিংগাপুর, লন্ডন, আমেরিকা, সৌদি আরব, দুবাই, কাতারে ৭০ কেজি মাছ-মাংস রপ্তানিও করেছেন। ঢাকা ছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় মাছ সরবরাহ করে যাচ্ছেন রোমানা। তিনি বলেন, ‘আমার শাশুড়ি আমার সঙ্গে ভোর ৪ টায় ওঠে মাছের ঘাটে যান। আত্মীয়স্বজন যারা কটু কথা বলেছেন, আজ তারাও আমার কাছ থেকে মাছ কিনে। লেগে ছিলাম বলেই আজ আমার অর্জন সবার কাছে গল্প করার মতো, গর্বের রসদ।’

রোমানা প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনের উপহারস্বরূপ আইসিটি মন্ত্রণালয় থেকে ‘স্মার্ট নারী উদ্যোক্তা’ হিসেবে পেয়েছেন প্রণোদনা। প্রত্যেকটা কাজেই বাধা বিপত্তি আসবে। দেখার বিষয় সেই বাধা বিপত্তিকে আপনি কিভাবে নিচ্ছেন। হতাশ হয়ে থেমে গেলে হবে না। লড়াই করে এগিয়ে যেতে হবে। রোমানা আড়ত থেকে মাছ এনে বিক্রি করে, নিজের লভ্যাংশ রেখে আড়তদারকে টাকা দেন। নিজের উদ্যোগের টাকায় এখন মা-ভাইয়ের দেখাশোনা করতে পারেন। শাশুড়িকেও বাড়িতে ফ্রিজ কিনে দিয়েছেন। অনেক নতুন পণ্যও সংযোজন করেছেন ক্রেতাদের চাহিদানুসারে। ঘরে বসেই এখন মাসে তার লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হয়। ইলিশের মৌসুমে দৈনিক লাখ টাকার ইলিশ বিক্রি হয়। রোমানা বলেন, ‘আমাকে এখন ৯টা-৫টা অফিস করতে হয় না। আমার সন্তান এখন ২৪ ঘণ্টা তার মা’কে কাছে পায়। আমার সংসারে নিজের যা প্রয়োজন আনন্দচিত্তে কেনাকাটা করি।’
উদ্যোক্তার জীবনে শেখার কোনো শেষ নেই। দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য রোমানা অনলাইনে ক্লাস, বিভিন্ন ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ এবং ‘উই’ থেকে মাস্টার ক্লাসও করেছেন- যা তাকে একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়ার সব খুঁটিনাটি শিখিয়েছে। আবেগ্লাপ্লুত হয়ে জানান, ‘আমার ঝুলিতে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে কিছু অ্যাওয়ার্ডও যোগ হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। আমি এখনো শিখছি। সফলতার কোনো শেষ নেই। তাই সফল হওয়ার জন্য এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ স্বামী আর ১ বছরের ছেলেকে নিয়ে সুখের সংসার তার। একটা সময় অনেক কষ্ট করেছেন। এখন ভালো আছেন। ছেলে হওয়ার ৪ দিন আগেও কাজ করেছেন রোমানা। ১৫ দিন পর থেকে আবার কাজ শুরু করে দেন।

রোমানার পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে- লোকাল চাঁদপুরের ইলিশ ও মেঘনা নদীর সব তাজা মাছ। সঙ্গে আছে সামুদ্রিক মাছ, ঘরে পালা কবুতরের বাচ্চা, দেশি হাঁস, রাজ হাঁস, চিনা হাঁস, দেশী মুরগি, টার্কি মুরগি, গরুর মাথা, মগজ, বট, কুমিল্লা মাতৃভান্ডারের রসমালাই, দেশী গরুর খাঁটি দুধ, খাঁটি গুড়। প্রতিটা পণ্য রোমানা নিজে বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে দেখে বেছে কিনে আনেন। আর ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী রেডি টু কুক করে দেন।

সোমা ঘোষ
সোমা ঘোষ, মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর থানার নব গঙ্গার তীরে বিনোদপুর গ্রামে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করে স্বাবলম্বী হওয়ার ইচ্ছা থেকে উদ্যোক্তা বনে যাওয়া। শ্বশুর বাড়ির ছিল মাছের ব্যবসা। মাঝে মাঝে সেখানে সময় দিতেন। সেখান থেকেই ভালোলাগা আর উদ্যোক্তা হয়ে ‘জেলেবাড়ি’ নিয়ে পথচলা। বাসা থেকে কখনো তিনি কোনো কাজের বিষয়ে বাধা পাননি, যার জন্য আত্মবিশ্বাসটা একটু বেশিই ছিল তার। সোমা ব্যবসা শুরু করেন ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে। মাত্র ছয় মাসে সাড়া পেয়েছেন প্রচুর। আর কিছুদিন মাছের ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় এর প্রক্রিয়াকরণটা ভালোই বুঝেন সোমা। তিনি বলেন, ‘আমার ব্যবসার বিশেষ শক্তি জন্মসূত্রেই জেলে পরিবারে বেড়ে উঠা একজন মানুষ।

মাছের কাজের সঙ্গেই জড়িত তিনি। মাছ সম্পর্কে খুব ভালো জানেন। এ কারণেই আমি নিয়মিত রিপিট এবং রেফারেন্স কাস্টমার পাচ্ছি। আমার লক্ষ্য হচ্ছে সব সময় কাস্টমারের সন্তুষ্টি। মানসম্মত পণ্য এবং বেটার সার্ভিসের মাধ্যমে আমি সবসময় আমার ক্রেতাদেরকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করি। আর তারাই আমার উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।’ সোমা নদীর, বিলের, হাওড়-বাওড় ও সামুদ্রিক সব রকম কাঁচা মাছ ও গ্রামের গেরস্ত বাড়ির দেশী মুরগি নিয়ে কাজ করেন। দেশের বিভিন্ন জায়গা যেমন: চাঁদপুর থেকে পদ্মার ইলিশ, শিং মাছ গোপালগঞ্জ থেকে, পারশে-কাঁকড়া ও ঘেরের কয়েক প্রকার মাছ সাতক্ষীরা থেকে আনেন। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় আত্মীয়স্বজন যারা মাছের কাজের সঙ্গে জড়িত, তাদের মাধ্যমেও মাছ সংগ্রহ করে থাকেন।

সোমা বলেন, ‘অনেকেরই ধারণা, অনলাইন মাছ মানেই ফ্রিজিং আর পচা মাছ- এ ধারণা এখন পাল্টাতে শুরু করেছে। প্রথম থেকেই রেডি টু কুক ফ্রেশ মাছ নিয়ে কাজ করছি।’ ফ্রেশ মাছ যাতে খুব দ্রুত ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারে তার জন্য সোমার রয়েছে নিজস্ব ডেলিভারি ব্যবস্থা। সময়ের তারতম্য বুঝে মাছ সংগ্রহের পর তাপমাত্রা ঠিক রাখার জন্য আইসবক্সে করে ডেলিভারি দেন। ককশিটে বরফ দিয়ে সাইকেলের পিছনে বেঁধে মহাখালী থেকে মাছ পৌঁছে দেন ক্রেতার দরজায়। ৫ বছরের মেয়েকে নিয়ে সোমার উদ্যোগী জীবন।

স্বপ্ন দেখেন একটি আউটলেট দেওয়ার। শুরুতে দিনে ১/২টা অর্ডার পেলেও এখন প্রায় ৬/৭টি অর্ডার পান সোমা। সেখানে গড়ে প্রায় ৩০ কেজির মতো মাছ বিক্রি করেন। সোমার রয়েছে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি টিম। তিনি আজ শুধু নিজেই উদ্যোক্তা হননি, কয়েকজনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করেছেন। সোমা আর রোমানারা এগিয়ে যাক। পরিবার ও কাছের মানুষের উৎসাহে তাদের চলার পথ হউক মসৃণ।