কারিগরি শিক্ষায় বেড়েছে নারীর আধিপত্য

তেজগাঁওয়ে অবস্থিত ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষায় গত বছর প্রথম হন উম্মে হাবিবা শান্তা। তিনি ৪০০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩ দশমিক ৯৯ মাকর্স পেয়ে অষ্টম, অর্থাত্ চূড়ান্ত পর্বে প্রথম স্থান অধিকার করেন। বরাবরই শান্তার ফলাফল ভালো, অথচ বছর কয়েক আগেও এই বিভাগে মেয়েরা পড়তেন না বলে জানান ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত তেজগাঁও ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ জাকির হোসেন। কারিগরি শিক্ষায় ছেলেদের একচেটিয়া আধিপত্যে মেয়েরা নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে গত কয়েক বছর ধরে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণে কারিগরি শিক্ষায় যেমন বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ, তেমনি নারীরা নেতৃত্বেও নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ১০ বছরে কারিগরি শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ১৭ শতাংশ। বর্তমানে মোট শিক্ষার্থীর ২৭ শতাংশ নারী আর শুধু পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ১০ শতাংশ। ১৫ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী দেশের চারটি মহিলাসহ ৫০টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে লেখাপড়া করছেন।

মেয়েদের জন্য বিষয়টি নয় :মার্জিয়া আক্তার ন্যাশনাল পলিটেকনিকে আর্কিটেকচারে সপ্তম পর্বের শিক্ষার্থী। মার্জিয়া জানান, তার বড় বোন পলিটেকনিকে পড়াশোনা করে চাকরি করছেন। তার উত্সাহেই তিনি এ বিষয়ে পড়ে ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হতে চান। শারমিন সুলতানা ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ইলেকট্রো মেডিসিনে পড়া শেষ করে এখন ঢাকা পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করছেন।

শারমিন জানান, তিনি ২০১২-১৩ সেশনে পড়াশোনা করেন, তখন ৪৮ জন মেয়ে ছিলেন তার বিভাগে, যা এখন বেড়ে হয়েছে ২০০। শারমিন সুলতানা জানান, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভাইস প্রিন্সিপালসহ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিকস, ইলেকট্রিক্যাল, রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড ইয়ার কন্ডিশনিং, কেমিক্যাল অ্যান্ড ফুড প্রকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান নারী শিক্ষক।

আশুগঞ্জ সার কারখানায় সহকারী কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার রুমা আক্তার জানান, ২০০৮ সালে তিনি যখন পড়াশোনা করেন, তখন চার জন মেয়ে শিক্ষার্থী ছিলেন তারা, তাদের মধ্যে দুই জন চাকরি করছেন, এক জন নিজের ফার্ম করে ভালো আছেন। কারিগরি শিক্ষা মেয়েদের জন্য নয়—এই ধারণা ভালো করা মেয়েরা ভাঙতে শুরু করেছেন বলে জানান ১৯৭০ সালে যাত্রা শুরু করা দেশের বৃহত্ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের পেশাজীবী সংগঠন ইনিস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মো. শামসুর রহমান।

তিনি বলেন, ‘১৯৭৫ সালে আমি যখন শিক্ষার্থী, তখন আমাদের সঙ্গে তিন জন মেয়ে শিক্ষার্থী ছিলেন। এর আগে যারা পড়াশোনা করেছেন, তাদের সঙ্গে কোনো মেয়ে শিক্ষার্থী ছিলেন না বলে জানতে পারি।’ তিনি জানান, তাদের সংগঠনের নিবন্ধনকৃত ৬৭ হাজার সদস্যের মধ্যে ৮ হাজার নারী। কারগরি শিক্ষা বোর্ডের তথ্যমতে, চারটি বিভাগীয় শহরে শুধু মেয়েদের জন্য চারটি ইনিস্টিটিউটে শিক্ষার্থীসহ ৫০টি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনিস্টিটিউট মোট ১৮ হাজার ৪৯৭ জন মেয়ে শিক্ষার্থী পড়ছেন, যা মোট শিক্ষার্থীর ১৪ শতাংশ। ৩ হাজার ৮১৮ জন ময়ে শিক্ষার্থী পড়ছেন চারটি মহিলা পলিটেকনিকে। মোট কারিগরি শিক্ষায় আছেন ২৭ শতাংশ নারী।

বাড়ছে সুযোগ : আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ঢাকা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ শাহানা বেগম বলেন, আগের তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন অনেক বেড়েছে। কম্পিউটার, আর্কিটেকচার, ইলেকট্রিক্যাল, সিভিল, ইলেকট্রনিকস, ইলেকট্রিক্যাল, ফুড টেকনোলজি ইত্যাদি বিষয়ে মেয়েদের আগ্রহ বেশি। শামসুর রহমান বলেন, মেয়েদের কারিগরি শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে সরকার এখানে শতভাগ মেয়ে শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিচ্ছে, যেখানে ছেলে শিক্ষার্থীরা মেধার ভিত্তিতে ৭০ শতাংশ বৃত্তি পান।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, কারিগরি শিক্ষায় কম মেধাবী ও দরিদ্রের বিষয়—এই ধারণা ভাঙতে শুরু হয়েছে। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ছেলেদের ভর্তির যোগ্যতা জিপিএ-৩ হলেও মেয়েরা ২ দশমিক ৫ হলে ভর্তি হতে পারবেন। মেয়েদের জন্য ২০ শতাংশ কোটার ব্যবস্থা রয়েছে। শতভাগ মেয়ে শিক্ষার্থী প্রতি সেমিস্টারে ৪ হাজার টাকা বৃত্তিসহ ইন্টার্নশিপে ১৫ হাজার টাকা সরকারি ভাতা পান। তার পরও সব পলিটেকনিকে মেয়েদের জন্য হল না থাকায় আরো মেয়েরা কারিগরি শিক্ষায় আসতে পারছেন না।