সরকারি সহায়তায় ভিক্ষা ছেড়ে দোকানদারী

৪৫ বছর আগে বিয়া হইছে। জামাইর (স্বামী) ঘরে আওয়ার (আসার) পরই দেখি সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। কয়েক বছর পরই বাধ্য হইয়া অভাবের কারণে ভিক্ষাত নামছি। সংসারত চালায়া নেওয়ন লাগব। একটু সাহায্যের আশায় ৩৮ বছর মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। এহন প্রধানমন্ত্রী আমারে দোহান (দোকান) দিছে। এহন আর আমারে কেউ ভিক্ষুক কয় (বলে) না। সরকারের দেওয়া দোকান ঘরে বসে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন নান্দাইল উপজেলার জাহাঙ্গিরপুর ইউনিয়নের বাতুয়াদি গ্রামের জীবন নাহার (৬২)।

জীবন নাহার জানান, স্বামী মুর্শিদ ফকির লাঠিয়াল ছিল। গ্রামে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে লাঠি খেলা দেখাত। এই কাজে তেমন একটা আয় হতো না।

সংসার জীবনে তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তাদের ভরণপোষণের খরচ জোগার করতে হতো। সম্পদ বলতে চার শতক জমি ও একটি কুঁড়ে ঘর ছিল। তখন দুর্বিষহ জীবনে একটু অর্থনৈতিক স্বস্তির আশায় ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেন তিনি। তিনি বলেন, গত ১২ বছর ধরে স্বামী অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে আছে। তাঁর সারা শরীর শুকিয়ে গেছে। মেয়ে ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করে। ছেলেরা সংসার নিয়ে আলাদা থাকে। প্রত্যেকের সংসারে চার/পাঁচজন করে সদস্য আছে। এ অবস্থায় আমাদের কিভাবে দেখবে। তাইত ৩৮ বছর ধরে ভিক্ষাবৃত্তি করছি। মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সাহায্য সহযোগিতা নিয়েছি। প্রায় সময় ভিক্ষা করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে রাস্তার পাশে পড়ে থেকেছি। তখন মানুষজন উদ্ধার করে বাড়িতে পৌঁছে দিছে। অনেক সময় ভেবেছি আর ভিক্ষা করব না। কিন্তু পেটে খিদা থাকলে কি ঘরে বসে থাকা যায়।

জীবন নাহার আরও বলেন, ভিক্ষা করতে লজ্জা লাগে। তবুও অভাবের কারণে ভিক্ষা করতে হয়েছে। অনেক সময় না দেখে সাহায্য চাইতে গিয়ে আত্মীয়স্বজনের কাছে হাত পেতেছি। তখন লজ্জায় মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হয়েছে।

ভিক্ষাবৃত্তির মাঝে কোনো সম্মান নেই। সবাই ভিক্ষুক বলে ডাকত। এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে আগের সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছে। আমি দোকান চালিয়ে অনেক খুশি। ভিক্ষার পরিবর্তে কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। তাছাড়া বয়সের কারণে এখন আগের মতো হাঁটতে পারি না। তাই শেষ বয়সে এই দোকান আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন হয়েছে। সরকার দোকানের পাশাপাশি বিক্রির জন্য জিনিসপত্রও দিয়েছে। আর আমি কিছু টাকার ব্যবস্থা করে দোকানে জিনিসপত্র বাড়িয়েছি। বাড়ির কাছে সড়কের পাশে দোকান বসানোর কারণে বিক্রিও ভালো হয়। এখন আর আমাকে ভিক্ষা করতে হবে না।

জানা গেছে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান কর্মসূচির’ আওতায় একটি টং দোকানঘর বরাদ্দ পেয়েছেন জীবন নাহার। সেই দোকানে ৩৫ হাজার টাকার মালামাল ও নগদ ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। দোকানটি বসানোর জন্য অস্থায়ী একটি জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এই বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ইনসান আলী বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চান দেশ যাতে ভিক্ষুক মুক্ত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা কাজ করে যাচ্ছি। জীবন নাহারকে দোকানঘর ও নগদ টাকা দেওয়া হয়েছে। এখন তাঁর আর ভিক্ষাবৃত্তি করতে হবে না। তিনি এই দোকানের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সম্মানও ফিরে পেয়েছেন।

নান্দাইল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ জুয়েল বলেন, ভিক্ষুকরা যাতে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে সম্মানের সঙ্গে সমাজে চলতে ও জীবিকা নির্বাহ করতে পারে সে জন্য প্রধানমন্ত্রী কাজ করে যাচ্ছেন। জীবন নাহারের মতো আরও অনেক ভিক্ষুককে দোকানঘরসহ বিক্রির জন্য পণ্য সামগ্রীও দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি দ্রুতই নান্দাইল উপজেলা ভিক্ষুকমুক্ত হবে।