নবরূপে ঢাকার রমনা পার্কে প্রাণের উচ্ছ্বাস

করোনাভাইরাস মহামারীর সময় গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রায় ৪৬ কোটি টাকা খরচ করে পার্কটিকে ঢেলে সাজায়।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকার রমনা পার্ক সেজেছে নতুন রূপে। তীব্র রোদেও সাজানো গোছানো এই পার্কের ভেতরে হাঁটার রাস্তাগুলো থাকে ছায়ায় ঘেরা। হাঁটতে হাঁটতে আবার শোনা যায় পাখির ডাক, পাশ দিয়েই ভোঁ দৌড় দেয় কাঠবিড়ালী।

ভেতরের হাঁটার রাস্তায় আধুনিক লাইটিংয়ের ব্যবস্থা সন্ধ্যায় আনে ভিন্ন এক রূপ। লেকের দুই পাশে কাঠ দিয়ে যে সেতু করা হয়েছে, সেটিও দৃষ্টিনন্দন।

পার্কটিতে শিশুদের খেলার যে জায়গা তৈরি হয়েছে, তাতে আছে দারুণ সব রাইড। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পার্কের ভেতরের এই ‘পার্কে’ থাকে শিশুদের মেলা। বাবা মাকে নিয়ে শিশুরা বারবার আসেন সেখানে।

কেবল সময় কাটানো নয়, শরীর চর্চা আর হাঁটাহাঁটির জন্যও পরিবেশটি দারুণ। ব্যায়াম করার জন্য কিছু স্থায়ী স্থাপনা আছে। ব্যায়াম করার পর আছে বিশ্রামের জায়গা।

আধুনিক টয়লেট সুবিধাও গড়ে তোলা হয়েছে পার্কে, যেটি ঢাকার পার্কে বিরলই বলা যায়। টয়লেটের সংখ্যা মোট চারটি। সেখানে চায়নিজ রেস্তোরাঁ ভেঙে নির্মাণ হয়েছে কফি কর্নার। অবশ্য সেটা এখনও চালু হয়নি।

৬৮.৫ একর জায়গা নিয়ে গড়ে তোলা এ পার্কে রয়েছে প্রায় ২১১ প্রজাতির উদ্ভিদ। যার মধ্যে আছে নাগলিঙ্গম, অশোক, রক্তকাঞ্চনসহ দুর্লভ প্রজাতির ছোট বড় গাছ।

করোনাভাইরাস মহামারীর সময় গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রায় ৪৬ কোটি টাকা খরচ করে পার্কটিকে ঢেলে সাজায়। এর অংশ হিসেবে পার্কের ভেতরে লেক খনন করে তৈরি হয়েছে দুই লেনের কাঠের ডেক। হাঁটার তৈরি রাস্তা করা হয়েছে লাল সিরামিক ইট দিয়ে। আছে বিটুমিনাস কার্পেটের রাস্তাও।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়েছে শিশু চত্বরটি। সেখানে খেলাধুলার জন্য দৃষ্টিনন্দন দোলনা, স্লাইড সামগ্রীসহ নতুনরূপে সাজানো হয়েছে, আছে ঝুলন্ত সেতুসহ নানা রাইড।

বিভিন্ন বৃক্ষের পরিচিতি ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন বার্তা তুলে ধরতে স্থাপিত হয়েছে দুটি এলইডি ডিসপ্লে। সান্ধ্যকালীন আলোকিত করার জন্য স্থাপন করা হয়েছে ল্যাম্পপোস্ট ও আধুনিক লাইট। বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

পার্কটিতে প্রায়ই ঘুরতে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী তৌফিক আঞ্জাম। তিনি বলেন, “এখানে এলে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। এখানে বিরল গাছপালা আছে, যা শহরের অন্য কোথাও সহজে পাওয়া যায় না। কর্মব্যস্ত জীবনে হাঁপিয়ে উঠলে এখানে এলেই ক্লান্তি দূরের প্রণোদনা পাওয়া যায়।

“এখানে ব্যায়াম করার সুযোগ আছে, যেটা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও খুব ভালো। এখানে চুরি-ছিনতাই হয় না। সব কিছু মিলিয়ে পরিবেশটা খুবই মনোরম।”

বন্ধুদের নিয়ে পার্কে বেড়াতে আসা আতাউস সামাদ বলেন, “আগে অনেক জরাজীর্ণ ছিল। পরিবেশটা অতটা ভালো লাগত না। এখন ঘুরতে খুবই ভালো লাগছে। লেকের পাশে সুন্দর ব্রিজ হয়েছে, এখানে হাঁটলে অনেক ভালো লাগে। মনটা ফ্রেশ হয়।

“এখন পার্কে কৃষ্ণচূড়া ফুল ফুটেছে। এগুলো দেখতে আরও ভালো লাগছে। আমি মনে করি, বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে ঘুরতে আসতে এটা একটা আদর্শ স্থান।”

সপরিবারে লালবাগ থেকে আসা খায়রুল হক বললেন, “নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ভালো। অন্যান্য পার্কগুলোতে নেশাখোর, ভবঘুরে লোকজন বেশি দেখা যায়। তবে এই পার্কটাতে এগুলো নাই।”

শিশু কর্নারে অন্য রকম মজা

মৎস্য ভবনের কাছের গেট দিয়ে সোজা হাঁটলেই চোখে পড়বে পার্কটি। সেখানে মেয়ে নাফিসা আঞ্জুম সারাকে নিয়ে খেলাধুলা করতে দেখা যায় মা নাহিদা আক্তারকে। তারা রাজধানীর দনিয়া থেকে পার্কে বেড়াতে এসেছেন।

নাহিদা আক্তার বলেন, “আগে শিশু পার্ক ছিল। ওখানে যাওয়া যেত। এখন সেটা বন্ধ, তাই রমনা পার্ক আমাদের ভরসা। বাচ্চারা এখানে খেলাধুলা করে আনন্দ পায়।”

শিশু সারা জানায়, এই পার্কে খেলাধুলা করতে এসে কয়েকজনের সঙ্গে তার বন্ধুত্বও হয়ে গেছে।

এই শিশু কর্নারের টানে ইস্কাটনের স্বরিৎ ঋতি সপ্তাহে দুইবার পার্কে আসে বাবা মায়ের সঙ্গে। এখানকার দোলনা আর স্লাইড তার বেশি পছন্দ। খেলা শেষে হেঁটে যেতে যেতে কৃষ্ণচূড়া ফুল কুড়ায় সে। পাখি আর কাঠবিড়ালীর পেছনে ছুটে বেড়ায়। তাদেরকে ধরতে না পেরে বলে, ‘দুষ্টু’।

সামিয়া সুলতানা নামে আরও এক অভিভাবক তার সন্তানদের নিয়ে নিয়মিত আসেন পার্কে। তিনি বলেন, “প্রতিটি রাইড বেশ সুন্দর। এখানে এলে বাচ্চারা শেয়ার করতে শেখে, অপেক্ষা করতে শেখে। একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হয়। তাদের সামাজিকীকরণ ভালো হয়েছে।”

তিনি বলেন, “বাচ্চাদের খেলাধুলার জন্য খুব ভালো একটা পরিবেশ হয়েছে। এটা একটা উন্মুক্ত পার্ক, যখন ইচ্ছা আসা যায়। টিকেটের কোনো ঝামেলা নাই।”

সকাল সন্ধ্যা চলে শরীর চর্চা

পার্কটি ভোরে খুলে দেওয়া হয়। বেলা ১২টায় বন্ধ করা হয় দুই ঘণ্টার জন্য। এই সময়টা বাদ দিলে বাকি সময়ের একটি বড় অংশ জুড়েই শরীর চর্চা করতে দেখা যায় দল বেঁধে। কেউ কেউ হালকা তালে দৌড়ান, কেউবা হাঁটেন।

শান্তিবাগ থেকে প্রতিদিন সকালে আসেন জাহিদ আহম্মেদ। তিনি বলেন, “আমরা অনেকে ডায়াবেটিসের রোগী। সকাল-বিকাল হাঁটতে হয়। ঢাকা শহরের ধুলাবালির রাস্তায় হাঁটা যায় না। এই পার্ক হাঁটার জন্য বেশ উপযোগী।”

শরীরচর্চার জন্য সেখানে আছে কিছু সংগঠনও। এদের মধ্যে আলফা ইয়োগা সোসাইটির সহসভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম।

তিনি জানান, পার্কে প্রায় ৫৪টি সংগঠন রয়েছে, যারা মানুষকে শরীর চর্চার প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

“আসলে সুস্থ থাকার জন্য শরীরচর্চার বিকল্প নাই। ঢাকা শহরে একটু খোলামেলা জায়গা হাঁটা বা ঘুরে বেড়ানোর জায়গায় খুবই কম। সেই ক্ষেত্রে এই রমনা পার্ক আমাদের জন্য আশীর্বাদ।”

পার্কে শরীরচর্চা করতে দেখা গেল বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসক মো. কামরুজ্জামানকে। তিনি বলেন, “পার্কটি আগের চেয়ে অনকে সুন্দর হয়েছে। এখানকার পরিবেশ মানুষ অনেক উপভোগ করে।

“মানুষ আসলে একটু ফুরসত চায়। সে জন্য রমনা পার্ক একটা আদর্শ জায়গা বলে আমি মনে করি। এখানে গাছ আছে, ফুল আছে, পানি আছে, শিশুদের মেলা আছে। হাঁটার সুন্দর জায়গা আছে, ব্যায়ামের জিনিসপত্র আছে। ক্লান্ত হলে বসার বা শোয়ার জায়গাও আছে। আর কী চাই?”