তিনি এসেছিলেন বলেই এগিয়ে যাচ্ছে দেশ

১৭ মে ১৯৮১ সালে ছয় বছরের নির্বাসন জীবনের অবসান ঘটিয়ে শ্রাবণের বর্ষণমুখর এক বিকেলে বর্তমানে শেখ হাসিনা স্বদেশে ফিরে এসেছিলেন। সেদিন লাখ লাখ মানুষ রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে বিমানবন্দর থেকে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের জনসভা মঞ্চ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে ভালোবাসায় সিক্ত, পরম মমতায় গ্রহণ করে এবং সংবর্ধনা দেয়। উক্ত সংবর্ধনায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে আমারও অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছিল। সেদিন রাস্তার দু’পাশে জনগণ গগনবিদারী স্লোগান তুলেছিলো- ‘শেখ হাসিনার আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম; শেখ হাসিনা তোমায় কথা দিলাম, মুজিব হত্যার বদলা নেব; বঙ্গবন্ধুর রক্ত, বৃথা যেতে পারে না; আদর্শের মৃত্যু নেই, হত্যাকারীদের রেহাই নেই; ঝড় বৃষ্টি আঁধার রাতে, আমরা আছি তোমার সাথে।’

শেখ হাসিনা বিমানবন্দর থেকে সরাসরি বনানী কবরস্থান এবং সেখান থেকে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের জনসভায় যোগ দেন। মঞ্চে উঠে তিনি শুধু ক্রন্দন করেন। সেদিন প্রকৃতির কান্না ও জনতার কান্না শেখ হাসিনার কান্নার সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছিল। জনসমুদ্রে কান্নাজনিত কণ্ঠে শেখ হাসিনা জাতির কাছে যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন, তার সারমর্ম হচ্ছে নিন্মরূপ ‘আজকের জনসভায় লাখো চেনামুখ আমি দেখছি। শুধু নেই প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু, মা আর ভাই, আরও অনেক প্রিয়জন। ভাই রাসেল আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। আপা বলে ডাকবে না। সব হারিয়ে আজ আপনারাই আমার আপনজন। স্বামী-সংসার-ছেলে রেখে আপনাদের কাছে এসেছি, আমি আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ার জন্য আসিনি।

আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে আপনাদের পাশে থাকতে চাই। ক্ষমতাসীনরা বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবার পরিজন হত্যা করে বলেছিল জিনিসপত্রের দাম কমানো ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু আজকে দেশের অবস্থা কি? নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী। কৃষকরা তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। শ্রমিক তার ন্যায্য পাওনা পাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। সাধারণ মানুষ খেতে পারছে না, আর এক শ্রেণির লোক প্রচুর সম্পদের মালিক হচ্ছে… আমি চাই বাংলার মানুষের মুক্তি।

বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য বঙ্গবন্ধু আজীবন সংগ্রাম করেছিলেন। আজ যদি বাংলার মানুষের মুক্তি না আসে তবে আমার কাছে মৃত্যুই শ্রেয়। আমি আপনাদের পাশে থেকে সংগ্রাম করে মরতে চাই। স্বাধীন সার্বভৌম জাতি হিসেবে বেঁেচ থাকার জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালি জাতি রক্ত দিয়েছে। কিন্তু আজ স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে চলেছে। ওদের রুখে দাঁড়াতে হবে। মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সংগ্রাম করি।

আপনাদের ভালোবাসার আশা নিয়ে আমি আগামী দিনের সংগ্রাম শুরু করতে চাই। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত রাষ্ট্রের চার মূলনীতি বাস্তবায়ন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিচারের ভার সরকারের কাছে নয়, আমি আপনাদের কাছেই হত্যাকা-ের বিচার চাই।’

এটা সর্বজনবিধিত সত্য যে বিট্রিশ শাসন-শোষণ এবং পাকিস্তানিদের নির্যাতন শোষণের বিরুদ্ধে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রজ্বালন ঘটিয়ে অন্ধকারের শক্তি সাম্প্রদায়িকতাকে পরাস্ত করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ৩০ লাখ শহীদ ও অগণিত মুক্তিযোদ্ধা ও মা-বোনের চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ জাতি-ভাষা রাষ্ট্র হিসেবে ঘটে বাংলাদেশের অভ্যুদয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটাকে গড়ে তোলার জন্য বঙ্গবন্ধু সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নিয়ে শুরু করেছিলেন এক অবিস্মরণীয় সংগ্রাম। অথচ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কারণেই ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধু পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ শাহাদাত বরণ করেন।

আল্লাহর বিশেষ রহমতে সে সময়ে শেখ হাসিনা তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে স্বামীর কর্মস্থল জার্মানিতে থাকায় বেঁচে যান। তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফেরার পরিবেশ না থাকায় শেখ হাসিনা ইউরোপ ছেড়ে স্বামী-সন্তানসহ ভারতে আশ্রয় নেন। ১৩-১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১ তার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে সভাপতি নির্বাচন করা হয়। অতঃপর নির্বাসন থেকে স্বদেশে ফিরে এলেও তৎকালীন সরকার শেখ হাসিনাকে ধানম-ির ৩২ নম্বর বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি। বাড়ির সামনের রাস্তায় তিনি জায়নামাজে বসে দোয়া দরুদ পড়তে বাধ্য হন। বুকের ভেতর স্বজন হারানোর সব ব্যথা-বেদনা চেপে রেখে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করার লক্ষ্যে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যান। বাংলার মানুষ আবারও স্বপ্ন দেখতে শুরু করে; ফিরে পায় বঙ্গবন্ধুকে তার কন্যার প্রতিচ্ছবিতে।

শেখ হাসিনার বর্ণাঢ্য সংগ্রামমুখর কর্মময় জীবন কখনো মসৃণ ছিল না। বারবার তার জীবনের ওপর ঝুঁকি এসেছে। প্রতিবারই পরম করুণাময় তাকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে এনেছেন। মানুষ যাকে ভালোবাসে, আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন। মানুষের এ ভালোবাসাকে সম্বল করে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন শুরু করেন এবং এরই ধারাবাহিকতায় ’৯০-এ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন হয়। বিজয় হয় গণতন্ত্রের।

কোনো পদ বা ক্ষমতার লোভে নয়; বরং পিতার মতোই বাংলার মানুষকে ভালোবেসে, তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য তিনি দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথম সরকার গঠন করেন। পরে ২০০৮ সালে দ্বিতীয়; ২০১৪ সালে তৃতীয় এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে শেখ হাসিনা দেশ পরিচালনা করছেন। তারই দূরদর্শী নেতৃত্বে সব প্রতিবন্ধকতা, সমস্যা, সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দুটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতি করেছেন- (১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা (২) অর্থনৈতিক মুক্তি। বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন; কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে যেতে পারেননি। নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে শেখ হাসিনা সেই কাজটি অত্যন্ত দক্ষতা, সততা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও সাহসের সঙ্গে সম্পন্ন করে চলেছেন। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ ধরেই ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত-উন্নত-সমৃদ্ধ-স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য তিনি বিরামহীন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বের তিনটি বিশেষ গুণ রয়েছে- (১) সততা, (২) সাহসিকতা ও (৩) দূরদর্শিতা। এ তিনটি গুণের কারণেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বে অনন্য উচ্চতায়। দুর্নীতির অজুহাত তুলে বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ায় তখন শেখ হাসিনা দুর্নীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে জাতীয় সংসদে ঘোষণা দেন যে, ‘আমরা নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন করব।’ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছে। বর্তমানে এই সেতু শেখ হাসিনা সততা ও দেশের সক্ষমতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করছে বিশ্বে। বাঙালির ইতিহাসে দুটি কলংকময় ঘটনা ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যা।

দেশী-বিদেশী প্রবল চাপ থাকা সত্ত্বেও সাহসের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধী ও পঁচাত্তরের খুনিদের বিচার করে জাতিকে কলংকমুক্ত করেন তিনি। দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ২০০৮ সালে দিন বদলের সনদের আলোকে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে তিনি অনেক দেশ ও রাষ্ট্র নেতাদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। উন্নত-সমৃদ্ধ-স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে টেক্সসই উন্নয়ন অভীষ্ট, ২০৩০; রূপকল্প ২০৪১; ও স্বাধীনতা শতবর্ষ উদ্যাপনের রূপকল্প, ২০৭১, শতবর্ষ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা, ২১০০ মোতাবেক দেশের সামগ্রিক কর্মকা- পরিচালনা করা হচ্ছে। এ কর্মকা-ের পেছনে যিনি দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটাচ্ছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ন্যায্য, সত্য ও মানুষের কল্যাণের পক্ষে সোচ্চার শেখ হাসিনাকে পেয়ে আমরা গর্বিত ও জাতি হিসেবে সৌভাগ্যবানও বটে। কবিগুরুর ভাষায় বলতে চাই ‘তোমারে করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা
এ সমুদ্রে আর কভু হবো নাকো পথহারা।’

লেখক : ড. মো. আবু তাহের,
অধ্যাপক ও সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন