প্রধানমন্ত্রীর তিন দেশ সফরে নির্ভার সরকার

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিনিয়তই বদলে যাচ্ছে কূটনৈতিক চালচিত্র। বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যের কূটনীতির পারদের ওঠানামার খেলায় সরকার যে বেশ হিসাব করেই পা রাখছে, তা এখন বেশ দৃশ্যমান। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সদ্যসমাপ্ত জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফরের পর নির্বাচন ইস্যুতে সরকারকে বরাবর চাপে রাখা পশ্চিমা বিশ্বের মুখের বোলই যেন পাল্টে গেছে। বাংলাদেশ ও এদেশের নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে সোচ্চার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে বেশ পরিবর্তন এসেছে। সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের শর্তও অদৃশ্য হয়ে গেছে বিদেশি কূটনীতিকদের বক্তব্য-বিবৃতিতে। এমনকি তারা বলছেন, নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। তারা নির্বাচন ইস্যুতে হস্তক্ষেপ বা মধ্যস্থতা করবেন না।

প্রধানমন্ত্রীর ওয়াশিংটন সফরের সময় গত ১ মে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের উপপ্রধান মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল নিয়মিত ব্রিফিংয়ে প্রশ্নের জবাবে আগের সুর বদলে দিয়ে স্পষ্টই জানিয়ে দেন, বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অভ্যন্তরীণ ও ঘরোয়া বিষয়। তাই তিনি এ ব্যাপারে মন্তব্য করবেন না।

প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরে বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের ইতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। যে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিল, সেই বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ৫০ বছরপূর্তিতে সরকারপ্রধানকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়ে সম্পর্ক গতিশীল করে নিল। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর উদযাপন ও নতুন করে ঋণ পাওয়া অর্থনৈতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের বড় অর্জন হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ওই অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট ডেভিড মালপাসকে পদ্মা সেতুর একটি বাঁধাই করা ছবি উপহার দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গর্বের সঙ্গে বিশ্বসম্প্রদায়কে জানিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বব্যাংক ভুল করেছিল। শেখ হাসিনার সরকার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সঠিক পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাজ্য সফরের সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তার জন্য বড় অনুপ্রেরণা। তার স্ত্রী ও দুই মেয়েও শেখ হাসিনার ভক্ত বলে জানান। ঋষি সুনাক শেখ হাসিনাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছেন এবং তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা ভাবছেন, কোন জাদুর কাঠির কারণে পশ্চিমা সুর নরম হলো? আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি বরাবর পূর্ণ সমর্থন ও আস্থা রাখা ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ও ঐতিহাসিক বন্ধুদেশ ভারতের নেপথ্য ভূমিকার কারণে পশ্চিমা বিশ্বের সোচ্চার সুরে উত্তাপ কমেছে। পরীক্ষিত বন্ধুর কারণে ত্রিদেশীয় সফরের পর কূটনৈতিক চালে অনেকটাই নির্ভার হয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। প্রধানমন্ত্রীর এবারের যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফরকালেই বেদান্ত প্যাটেল ও ঋষি সুনাকের বক্তব্যে তা স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়েছে। উল্লেখ্য, প্যাটেল ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন ও ঋষি ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক।

অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক অজয় বাঙ্গা। প্রভাবশালী দেশ ও বিশ্বব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা থাকার কারণে সম্পর্কোন্নয়নের সুযোগ পাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার, এমনটি ভাবাও অত্যুক্তি হবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে বাংলাদেশ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র যে ভাষায় কথা বলবে, স্বকীয়তা বজায় রেখে পশ্চিমা বিশ্ব তা অনুসরণ করে। ইউরোপ দিবসের সংবাদ সম্মেলনে ঢাকায় ইইউ ডেলিগেশন প্রধান রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলির বক্তব্যে তা দেখাও গেছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মধ্যস্থতা বা হস্তক্ষেপ করতে আসেননি। তবে পরিস্থিতি বোঝার জন্য সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দেখা করতে এবং তাদের কথা শুনবেন তারা।

ঢাকা, দিল্লি ও ওয়াশিংটনের সূত্রগুলো বলছে, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু ভারত। আর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশটির অকুণ্ঠ সমর্থন ঐতিহাসিকভাবেই রয়েছে। তাই দিল্লি-ওয়াশিংটনের কৌশলগত ও অংশীদারত্বের সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কেও দৃশ্যমান হচ্ছে। তবে এই ক্ষেত্র রচনা শুরু হয় বিদায়ী বছরের শেষভাগে। পশ্চিমা দুনিয়া—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে টানাপোড়েনের বরফ গলা দৃশ্যমান হতে থাকে চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর সফরের সময় থেকে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার বরাবরই মার্কিন উদ্বেগের ইস্যুগুলোতে বিশেষ করে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছে। সে কথা ঢাকা সফরে গণমাধ্যমে উল্লেখ করে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন ভালো হবে বলে আশা প্রকাশ করে গেছেন মার্কিন প্রভাবশালী কূটনীতিক ডেরেক শোলে। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় মোহন কোয়াত্রা জানিয়ে গেছেন, শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

এদিকে এ অঞ্চলের উদীয়মান অর্থনীতিতে বাংলাদেশ এক উজ্জ্বল নামে পরিণত হয়েছে। আর এ কারণেই আগামী সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত, যা বাংলাদেশ ও সরকারের জন্য একাধারে মর্যাদাপূর্ণ ও অনন্য সুযোগ। কারণ প্রধান প্রধান অর্থনীতির দেশের কৌশলগত বহুপক্ষীয় সংগঠন জি-২ ‘র কাছেও বাংলাদেশ বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এই সম্মেলনে বিশ্বের বড় শক্তিগুলো একটেবিলে বসবে। সেখানেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমন্ত্রিত সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন। আর বড় শক্তিগুলোর মনোভাব জানার সুযোগ পাবে বাংলাদেশ। এই সম্মেলন সফল করতে ভারত বন্ধু দেশগুলোর মধ্যে কোনো নেতিবাচক সম্পর্কের প্রভাব চাইবে না। আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে সরব না থাকলেও ভারতের প্রভাব কারও অজানা নয়। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে জিরো টলারেন্স নীতির কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার বরাবরই ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি ভারতের মনোভাব একই থাকলেও এবার মার্কিন সুর যেন আরও নমনীয় হয়েছে। এর নেপথ্যেও বড় কারণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়া। ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় চীনের উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের জন্য শুরু থেকেই স্বস্তিকর নয়। এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একসঙ্গে কাজ করছে দিল্লি-ওয়াশিংটন। কৌশলগত কারণে ভারতের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী বাংলাদেশকেও পাশে চায় যুক্তরাষ্ট্র। আর এক্ষেত্রে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আধিপত্যের লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু ভারতের চোখে বাংলাদেশকে দেখার বিকল্প নেই।

শুধু ভারত বা যুক্তরাষ্ট্রই নয়—বড় শক্তিগুলো সবাই বাংলাদেশকে তাদের সব উদ্যোগে সঙ্গে চায়। আর এ সুযোগটি বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছেন সরকার। তার কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার কারণে ত্রিদেশীয় সফরে যাওয়ার আগে ইন্দো-প্যাসিফিক ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখা (আউটলুক) ঘোষণাকে সরকারের বুদ্ধিদীপ্ত ও সময়োপযোগী কূটনীতি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের অভিমত, প্রধানমন্ত্রীর তিন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী দেশ সফরের আগ মুহূর্তে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অধিবাসী হিসেবে বাংলাদেশ নিজস্ব অবস্থান, ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ও লক্ষ্য তুলে ধরেছে। সেইসঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ২০২৬ থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে নতুন বাংলাদেশের দিকে যাত্রা করে উন্নত দেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় স্বপ্ন এবং স্মার্ট বাংলাদেশের ধারণাও বাংলাদেশের সরকার প্রধানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের প্রতিফলন হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক বিশ্ব, যা আগামী নির্বাচনে প্রভাব রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তাদের অভিমত, ত্রিদেশীয় সফরের সাফল্য সরকারের মুকুটে নতুন পালক যুক্ত করেছে। নেপথ্যে থেকে ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতার কারণেই তা সম্ভব হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, কূটনৈতিক সম্পর্কের অনেক গতিপ্রকৃতি রয়েছে। বাংলাদেশে ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কে গভীরতা ও আস্থা পুরো বিশ্বকে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা দেয়। তবে ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বরাবর পেশাদারিত্ব বজায় রাখে। তেমনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিভিন্ন দেশের সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকারও যথেষ্ট পেশাদার। তারা জাতীয় স্বার্থ বা স্পর্শকাতর ইস্যুতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি না। তবে মনস্তাত্তিক নৈকট্য বা চাপের প্রভাব থাকতে পারে।