উপকূলীয় অঞ্চলের পতিত জমিতে ফসলের হাসি

ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তি

খুলনার কয়রা উপজেলার হাতিয়াডাঙ্গায় তুষার মিস্ত্রির দেড় বিঘা অনাবাদি জমিতে প্রথমবার হচ্ছে বেগুন চাষ। লবণাক্ততা ও পানি স্বল্পতা জয় করে এবার তার ক্ষেতে শোভা পাচ্ছে অর্থকরী ফসল। কারণ, এবারই প্রথম তার জমিতে ব্যবহার করেছেন পলিমালচ প্রযুক্তি। আধুনিক এ প্রযুক্তির কল্যাণে দূর হয়েছে লবণাক্ততা ও পানি স্বল্পতার সমস্যা।

পলিমালচ হলো এক ধরনের পলি প্লাস্টিক দিয়ে ক্ষেত ঢেকে সেখানে নলের মাধ্যমে সাধারণ মিঠা পানি সরবরাহ করার প্রযুক্তি। পলিমালচ ব্যবহারে যেমন লবণাক্ততা ও পানি স্বল্পতা দূর হচ্ছে, পাশাপাশি জমিতে রোগবালাই আক্রমণ কমে এবং আগাছাও হয় না। ফলে বাড়ে উৎপাদন।

খুলনা অঞ্চলের বেশিরভাগ জমিই এক ফসলি, যেখানে শুধু আমন মৌসুমে ধান চাষ হয়। পানির অভাবে বাকি সময় জমি পতিত থাকে। এখন নানা ধরনের কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এসব জমি চাষের আওতায় আনতে কাজ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

হাতিয়াডাঙ্গা গ্রামের আরেক চাষি সৌরভ বাছরের অনাবাদি জমিতে এখন হাসছে সূর্যমুখী। আমন ধান কাটার পরে জমিটি অনাবাদি থাকতো সারাবছর। সেখানে এই প্রথমবার ১২ বিঘা জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ করেছেন। এবছর ভালো ফলন হলে আগামী বছর আশপাশের জমিতে সূর্যমুখী চাষ করবেন বলে জানান তিনি।

সৌরভ বাছরের পাশের জমির মালিক মজিবুর রহমান। তার জমি এখন অনাবাদি। মজিবুর রহমান বলেন, সৌরভ বাছরের সূর্যমুখীর ফলন ভালো হলে আমরা সবাই আগামী বছর থেকে সূর্যমুখীর চাষ করবো।

পাশের গ্রামের চাষি দেবানন্দ ছানা একই প্রকল্পের সহায়তা নিয়ে পাঁচ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। জমি প্রস্তুত ও তরমুজ চাষে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে এক লাখ টাকার মতো। তার ওই জমিতে উৎপাদিত তরমুজ বিক্রি করে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পাবেন বলে আশা করছেন দেবানন্দ।

এ প্রকল্পের অংশ হিসেবে তার ক্ষেতের পাশেই ৫ শতাংশ জায়গায় একটি পুকুর খনন করা হয়েছে। ওই পুকুরের পানি দিয়েই চলছে তরমুজ ক্ষেতের সেচ। এ সুবিধা আগে না থাকায় বছরের পর বছর জমিটি অনাবাদি থাকতো। এখন সোলার পাম্পের মাধ্যমে ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতিতে পুরো পাঁচ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে।

উপকূলীয় এলাকায় প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অনাবাদি জমি আবাদি করতে ‘ক্লাইমেট স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে খুলনা কৃষি অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

২০২১ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে শেষ হবে প্রকল্পের মেয়াদ। এই প্রকল্পের মাধ্যমে জলবায়ুর অভিযোজন মোকাবিলায় খুলনা কৃষি অঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা এবং নড়াইলের ২৮টি উপজেলা ও দুটি মেট্রোপলিটন এলাকার কৃষি উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে।

মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকরা পিছিয়ে পড়ছেন আধুনিক কৃষি থেকে। বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উচ্চ তাপমাত্রা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসের কারণে খুলনা বিভাগের কয়েকটি জেলায় ফসলের জমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। আবার শুষ্ক মৌসুমে এসব এলাকায় মিষ্টি পানির প্রচণ্ড অভাব।

অন্যদিকে স্বল্পকালীন শীতকাল এবং মাটিতে বেশিদিন ‘জো’ বা পানি না থাকায় রবি ও খরিপ মৌসুমে এ অঞ্চলের অধিকাংশ জমিই থাকে অনাবাদি। ফলে এ অঞ্চলে চাষাবাদের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার পরও সময়মতো প্রয়োজনীয় পানি না পাওয়ায় কৃষিকাজে খুব একটা অগ্রসর হতে পারছে না।

একদিকে খালগুলো চিংড়ি চাষিদের কাছে ইজারা দেওয়া, অপরদিকে দীর্ঘদিন খনন না করার কারণে বর্ষা মৌসুমে খালের দুই পাড় উপচে বন্যা ও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। যখন পানির প্রয়োজন থাকে না তখন পানিতে ভাসতে হয়। অথচ যখন পানির প্রয়োজন তখন ইজারাদাররা পানি আটকে করছেন চিংড়ি চাষ।

খুলনা কৃষি অঞ্চলে মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৪৪ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে ৬৬ হাজার হেক্টর পুরোপুরি পতিত থাকে। শুধু আমন মৌসুমে চাষ হয় প্রায় ১৯ হাজার হেক্টর, বাকি সময় এ জমি পড়ে থাকে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খুলনা অঞ্চলের বেশিরভাগ জমিই এক ফসলি, যেখানে শুধু আমন মৌসুমে ধান চাষ হয়। পানির অভাবে বাকি সময় জমি পতিত থাকে। ফলে বর্ষা মৌসুম ছাড়া এসব জমিতে চাষাবাদ হয় না। এখন নানা ধরনের কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এসব জমি চাষের আওতায় আনতে কাজ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। যার মধ্যে ক্লাইমেট স্মার্ট প্রকল্প বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

এ প্রকল্পের মাধ্যমে অনেক কৃষক এখন সোলার পাম্পের মাধ্যমে ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতি, পলিমালচ ব্যবহার, টাওয়ার ও বস্তা পদ্ধতিতে লবণাক্ততা কাটিয়ে চাষাবাদ করছেন। এসব এলাকায় পতিত জমিতে মিনি পুকুর (ছোট পুকুর) খনন করে শুষ্ক মৌসুমে পানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে অনাবাদি জমি আসছে চাষের আওতায়। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে সূর্যমুখী, ভুট্টা, তরমুজ, সবজিসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করছেন স্থানীয় কৃষকরা। কোথাও কোথাও আবার শুরু হয়েছে লবণসহিষ্ণু জাতের ফসল চাষ। ২০২২-২৩ অর্থবছরেই ছয়টি উপজেলায় ক্যাপসিকাম, শসা, টমেটো, বেগুন, মরিচসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

বর্ষা মৌসুমে প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা। খালগুলো ভরাট এবং দখলে থাকায় পানি বের হতে পারে না। ফলে জলাবদ্ধতার কারণে ফসল নষ্ট হয়। পাশাপাশি লবণাক্ততা তো আছেই। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির বড়ই অভাব।

প্রকল্প পরিচালক শেখ ফজলুল হক মনি বলেন, খুলনা কৃষি অঞ্চলে (খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইল) মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৪৪ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে ৬৬ হাজার হেক্টর পুরোপুরি পতিত থাকে। এছাড়া শুধু আমন মৌসুমে চাষ হয় প্রায় ১৯ হাজার হেক্টর, বাকি সময় এ জমি পড়ে থাকে।

তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে অর্থাৎ যখন পানি থাকে তখন প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা। খালগুলো ভরাট এবং দখলে থাকায় পানি বের হতে পারে না। ফলে জলাবদ্ধতার কারণে ফসল নষ্ট হয়। পাশাপাশি লবণাক্ততা তো আছেই। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির বড়ই অভাব। এক-দুই কিলোমিটার দূর থেকে ওয়াটার প্লান্ট থেকে স্থানীয়রা খাবার পানি কিনে আনেন। পানির অভাবে তখন ক্ষেত খামার ফেটে হয় চৌচির। পানি না থাকায় তখন কৃষকরা জমি চাষ করতে পারেন না।

শেখ ফজলুল হক মনি আরও বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত ৪০০ মিনি পুকুর (ছোট পুকুর) খনন করা হয়েছে। আরও ৩০০ মিনি পুকুর খনন করা হবে। পাশাপাশি সোলার প্যানেলের মাধ্যমে ড্রিপ সেচ পদ্ধতিতে পানি সরবরাহ করে ফসল চাষে মিলছে সফলতা।

পলিমালচ প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে এ প্রকল্প পরিচালক বলেন, কয়রা উপজেলার হাতিয়াডাঙ্গা গ্রামে এ প্রকল্পের মাধ্যমে পলিমালচ ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানকার কৃষকদের উচ্চমূল্যের সবজি চাষের এ প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রদর্শনী প্লট করার পর এখন কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কীভাবে অল্প পানি ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করা যায়, সে বিষয়ে ধারণা নিচ্ছেন কৃষকরা। এর মাধ্যমে একই খরচে একাধারে দু-তিন বছর ফসল উৎপাদন, সেচ খরচ কমানো, আগাছা দমন, মাটির রস সংরক্ষণ, রোগ-জীবাণুর সংক্রমণ কমিয়ে আনা বা বালাই দমন, সবল ও সতেজ গাছে অধিক সবজি উৎপাদন প্রক্রিয়া কৃষকদের দেখানো হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, সোলার পাম্পের মাধ্যমে ড্রিপ ইরিগেশনেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

তিনি জানান, প্রকল্পের মাধ্যমে কিছুটা সহায়তা এবং নিজেদের চেষ্টায় অনাবাদি জমিতে চাষ করছেন কৃষকরা। এছাড়া স্থানীয় উপকূলীয় দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও পুষ্টি চাহিদা পূরণে ছোট ছোট বৈজ্ঞানিক কৃষি সহায়ক প্রযুক্তি হস্তান্তর করা হচ্ছে। এগুলো ব্যবহার করে একদিকে তাদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হচ্ছে, অপরদিকে উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন বলেও জানান শেখ ফজলুল হক মনি।