সংকটেও লড়াকু বাংলাদেশ সম্ভাবনার কথা বলে

অস্বীকার করার উপায় নেই যে সংকট মোকাবেলা করার এক অভাবনীয় সক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশের। লড়াকু বাংলাদেশের এই সক্ষমতার বীজ বঙ্গবন্ধুই বপন করে গেছেন মুক্তিযুদ্ধোত্তর দেশে। এক ডলারও রিজার্ভ ছিল না সেদিনের বাংলাদেশের। নেতৃত্বের সাহস, উদ্দীপনা এবং বিচক্ষণতার গুণে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাংলাদেশ ফিনিক্স পাখির মতো উঠে দাঁড়ায়। ছুটতে থাকে সম্মুখ পানে সমৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণের দিকে। বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশে অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে গিয়েছিল। সর্বত্র সংকট ঘনীভূত হয়েছিল। কিন্তু সেসব হতাশার দিন পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ সংকট মোকাবেলায় এক সফল উদাহরণে পরিণত হয়েছে। মূলত বিশ্ব সংকটের কারণে ধেয়ে আসা মন্দা মোকাবেলায় বাংলাদেশের বিচক্ষণ নেতৃত্ব সময়োচিত সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সতর্কতামূলক সিদ্ধান্ত নিয়ে আইএমএফ কর্মসূচিতে অংশ নিতে সম্মত হয়েছে। সম্প্রতি আইএমএফের বোর্ডে বাংলাদেশের জন্য ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পাস হয়েছে।করোনাকালে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তা আরো ঘনীভূত হয়। এই দুই সংকটের নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপরও পড়েছে। আর জলবায়ু সংকটের চাপ তো ছিলই। এখন আরো তীব্র হয়েছে। তাই বাংলাদেশকে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির হারের প্রক্ষেপণ ১ শতাংশ কমাতে হয়েছে। আমদানি ব্যয় হঠাৎ অনেকখানি বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ও রপ্তানি মূল্যের ব্যবধান, যাকে ট্রেড ডেফিসিট বলা হয়—তা অসম্ভব পরিমাণে বেড়ে যায়। এই ব্যবধান এতটাই বেড়ে যায় যে এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা যতটা অর্থনীতিতে ঢুকেছে তার তুলনায় বেরিয়ে যাওয়ার মাত্রা অনেকটাই বৃদ্ধি পায়। আর এই কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিটের প্রভাব রিজার্ভের ওপর পড়ার ফলে তা কমতে থাকে। দীর্ঘদিন সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বকে তারল্যে ভাসিয়ে দিয়ে হঠাৎ করেই মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবার সংকোচনের পথ ধরে। এরই অংশ হিসেবে আগ্রাসীভাবে তাদের পলিসি রেট বাড়াতে শুরু করে। ফলে তাদের বন্ডের কদর বাড়ে। বাড়ে ডলারের দাম। আর ডলারের বিপরীতে অন্য বেশির ভাগ মুদ্রার মতো আমাদের টাকারও অবমূল্যায়ন ঘটেছে (২৫ শতাংশের মতো)। সারা বিশ্বেই মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে। বিশেষত আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতির কারণে বেশি বিপদে পড়ে কম আয়ের বাংলাদেশি নাগরিকরা। যদিও কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি লাগাতার কমছে, তবু কমার সেই হার খুবই ধীর। তাই জনজীবনে অস্বস্তি রয়েই গেছে। এ অবস্থায় আইএমএফের এই ঋণ কর্মসূচির ঘোষণা আসলেই একটি স্বস্তির খবর।
আইএমএফের তরফ থেকে এ সিদ্ধান্তে এযাবৎকালে (বিশেষত গত ১৪-১৫ বছর সময়কালে) বাংলাদেশের ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বাস্তবমুখিতা ও আমাদের আগামীর সম্ভাবনার বিষয়ে বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকদের আস্থাটুকু প্রতিফলিত হয়েছে। অন্য অনেক দেশের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি-বিচ্যুতির ফলে পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের একেবারে বাইরে চলে যায় তখনই সরকারগুলো আইএমএফের দ্বারস্থ হয়। আমাদের নীতিনির্ধারকরা বিদ্যমান বাস্তবতার বিষয়ে সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়ে আগেভাগেই আইএমএফের সঙ্গে ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন বলেই তারা যথাসময়ে এগিয়ে এসেছে। তাদের দেখানো পথে অন্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিরাও এগিয়ে আসবে বলে ধারণা করা যায়। বিশ্বব্যাংক এরই মধ্যে সরকারকে দেওয়া বাজেট সহযোগিতার পরিমাণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এডিবি আগে থেকেই বাংলাদেশে বেশি করে বিনিয়োগ করে যাচ্ছিল। এখন আরো করবে। জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাইকাও একই পথে হাঁটছে। এরই মধ্যে পাতালরেলের জন্য ৪.২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের এমন ইতিবাচক মনোভাব আমাদের সংকটকালে বিশেষ ভরসা দিচ্ছে, তা ঠিক। তবে তাদের এমন এগিয়ে আসাটি প্রত্যাশিতই ছিল। কেননা ১৪-১৫ বছর ধরে খুবই মুনশিয়ানার সঙ্গে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি পরিচালিত হয়েছে। এতে একদিকে ২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের মুখেও আমাদের প্রবৃদ্ধি বলশালী থেকেছে। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি ও তার ফলে বাড়তে থাকা মাথাপিছু আয়ের সুফল সামাজিক পিরামিডের পাটাতনের মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে উন্নয়নপ্রক্রিয়ার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রও নিশ্চিত করা গেছে। আর আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারীদের ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও এ সময়টিতে অন্য বেশির ভাগ ইমার্জিং ইকোনমির চেয়ে আমরা সফলতা দেখিয়েছি। সর্বোপরি আমাদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রধানত নিজস্ব চাহিদার ওপর ভর করে (তার ৭৩ শতাংশ ভোগ থেকে আসছে)। তাই অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে টেকসই। নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আগামীর সম্ভাবনাও আশা-জাগানিয়া।অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বিগত ১৪-১৫ বছরে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এমন ইতিবাচক রূপান্তরকে সংগত কারণেই ‘কোয়ান্টাম জাম্প’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। স্বাধীনতা-উত্তরকালে আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ৬১ শতাংশই হয়েছে এ সময়ে (বর্তমানে বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি)। প্রবাস আয়ের ক্ষেত্রেও প্রবৃদ্ধির ৬০ শতাংশ এ সময়ে হয়েছে। আর রিজার্ভের আকার যতটা বেড়েছে তার তো ৮৭ শতাংশই এ সময়ে হয়েছে। কৃষির ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, তার ফলে এই খাত আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির রক্ষাকবচ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই অর্জনগুলো টেকসই করা সম্ভব হয়েছে ম্যাক্রো-অর্থনীতির পাশাপাশি বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের দিকে সমানতালে নীতি-মনোযোগ দেওয়ায়। বাংলাদেশের এই অসামান্য অগ্রযাত্রার পেছনে মানবিক-সামাজিক উন্নয়নের যে দিকগুলো বিশেষ ভূমিকা রেখেছে তার মধ্যে প্রধান তিনটি হলো—(০১) নারীর ক্ষমতায়ন, (০২) মানুষের ওপর বিনিয়োগ এবং (০৩) জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অভিযোজন ও সহিষ্ণুতার পক্ষে শক্তিশালী সিদ্ধান্ত। এর পাশাপাশি সরকারের বাইরের অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে এগোনোর কৌশলও খুব কাজে লেগেছে।জনসংখ্যার অর্ধেক যে নারী তাদের ক্ষমতায়িত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য একদিকে যেমন সামাজিক উন্নয়ন সূচকে এ দেশকে এগিয়ে নিয়েছে, অন্যদিকে এতে তাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কার্যকরভাবে বিনিয়োজিত করার ক্ষেত্র প্রসারিত হওয়ায় ম্যাক্রো-অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সাম্প্রতিক দুটি দশকের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে ২০০০ সালেও দেশের নারী শ্রমশক্তির ৭৯ শতাংশ যুক্ত ছিল কৃষিতে। ২০১৯ সালে এই অনুপাত ৫৮ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এখন এই অনুপাত আরো কমতির দিকে। কারণ গ্রামীণ অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে আমাদের নারী শ্রমশক্তিকে আধুনিক শিল্প ও সার্ভিস খাতে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এই শতাব্দীর শুরুতে শিল্প খাতে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ ৯ শতাংশের নিচে ছিল এবং পরের দুই দশকে তা বাড়িয়ে প্রায় ১৮ শতাংশ করা সম্ভব হয়েছে। সার্ভিস সেক্টরেও নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ প্রায় দ্বিগুণ করা গেছে এ সময়ের ব্যবধানে (১৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৫ শতাংশ হয়েছে)। এখন নারী জনশক্তির ৩৮ শতাংশই আনুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত। ১৪-১৫ বছর ধরে চলতে থাকা ব্যাপকভিত্তিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কল্যাণে শহরে ও গ্রামে উদ্যোক্তা হিসেবে নারীর আত্মপ্রকাশের হারও উৎসাহব্যঞ্জক। তবে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবচেয়ে বড় সাফল্য দেখিয়েছে শিক্ষায়। অল্প সময়ের মধ্যেই এ দেশে প্রাথমিক শিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ পুরুষের সমান করা সম্ভব হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় এখনো সেই সমতা নিশ্চিত করা না গেলেও প্রশংসনীয় অগ্রগতি যে হয়েছে তা মানতেই হবে। তবে কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

দ্বিতীয় যে মানবিক-সামাজিক উন্নয়ন খাতের দিকে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা বিশেষ মনোযোগ দিয়েছেন তা হলো মানুষের ওপর বিনিয়োগ। এ ক্ষেত্রে শিক্ষায় বিনিয়োগের কথাই প্রথমে আসে। নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছে তা গড়ে পুরো শিক্ষা খাতেরই প্রতিচ্ছবি। এটি সম্ভব হয়েছে বিশেষ করে বিগত এক দশকের বেশি কাল ধরে ধারাবাহিকভাবে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বেশি বরাদ্দ দেওয়ায়। তবে আগেই যেমন বলেছি, কারিগরি শিক্ষায় হালে নীতি-মনোযোগ বৃদ্ধির কিছু সুফল নজরে পড়লেও এ ক্ষেত্রে আরো অনেক ভালো করার সুযোগ রয়েছে (বিশেষত চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে)। এ ছাড়া শিক্ষার গুণমান নিয়েও আমাদের এখন আরো বেশি ভাবার দরকার বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে শিক্ষার পরিমাণগত সূচকগুলোতে (ভর্তির হার, শিক্ষার সুযোগ ইত্যাদি) ধারাবাহিকভাবে ভালো করার ফলেই এখন গুণগত দিক নিয়ে নীতি-ভাবনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষায় আমাদের অর্জনগুলোর ধারাবাহিকতা ধরে রাখা গেলে ২০২৬ সালের মধ্যে ৩২ শতাংশ নাগরিকের উচ্চতর ডিগ্রি (সম্মান বা তদূর্ধ্ব) থাকবে (বর্তমানে আছে ২৪ শতাংশ)। উচ্চতর ডিগ্রি ও দক্ষতার ফলে তাদের গড় আয়ও বাড়বে, আর তার সুফল পাবে পুরো সামষ্টিক অর্থনীতি।উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় কেউই যেন পেছনে না পড়ে থাকে সেটিও মানুষের পেছনে বিনিয়োগে বিবেচনার বিষয়। এ জন্য সরকার ধারাবাহিকভাবে জাতীয় বাজেটের ১০ শতাংশের বেশি বরাদ্দ দিয়ে গেছে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। আগে থেকে চলতে থাকা পরীক্ষিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে আরো কার্যকর করে তোলার পাশাপাশি নতুন নতুন উদ্ভাবনী আর সময়োপযোগী কর্মসূচিও আমরা দেখতে পাচ্ছি। যেমন—মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গৃহহীনদের জন্য ঘর নির্মাণের কর্মসূচি, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প। পাশাপাশি বিভিন্ন রকম বীমা এবং সর্বজনীন পেনশন স্কিমের মতো বিভিন্ন পাইলট কর্মসূচিও শুরু হয়েছে বা হতে যাচ্ছে। এতে বোঝা যায় যে বাংলাদেশ সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে দারিদ্র্য নিরসনকেন্দ্রিক নীতি-ভাবনা থেকে এগিয়ে এসে জীবনমানের উন্নয়নকেন্দ্রিক কর্মসূচির দিকে যাচ্ছে।জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাংলাদেশের অর্জন এ দেশের মানুষকে শুধু সুরক্ষা দিচ্ছে তা-ই নয়, পাশাপাশি আমাদের কর্মসূচি এবং অর্জনগুলো বাকি পৃথিবীর জন্যও দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এর স্বীকৃতি হিসেবে আইএমএফ কর্মসূচিতে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ট্রাস্টের তহবিল যুক্ত করা হয়েছে। এই সহযোগিতা জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় আমাদের সক্ষমতাকে আরো জোরদার করবে। মনে রাখা চাই, এই ব-দ্বীপের মানুষরা সাধারণত জলবায়ু পরিবর্তনের যে প্রভাবগুলো মোকাবেলা করে থাকে (যেমন—ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা ইত্যাদি), সেগুলো থেকে মানুষকে সুরক্ষা ও ত্রাণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যেমন বিভিন্ন মেয়াদি কর্মসূচি নিয়ে আমরা সফল হয়েছি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পথনকশা তৈরিতেও আমরা বাকি বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছি। এ প্রসঙ্গে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ ও মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যানের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হয়। সবুজ শিল্প খাত এবং সবুজ জ্বালানির ক্ষেত্রেও আমরা অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। সারা বিশ্বের সব কটি প্লাটিনাম রেটেড সবুজ কারখানার অর্ধেকেরও বেশি রয়েছে বাংলাদেশে। তবে এটাও মানতে হবে যে সবুজ শিল্প খাত এবং সবুজ জ্বালানির প্রসারের ক্ষেত্রে যতটা ভালো করা সম্ভব ছিল ততটা আমরা অর্জন করতে পারিনি। আগামী দিনগুলোতে শিল্প খাতের সবুজ বিকাশ এবং সবুজ জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর জন্য বাড়তি নীতি-মনোযোগ খুবই জরুরি।

আমাদের উন্নয়ন অভিযাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর অংশগ্রহণমূলক ধরন। নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষার প্রসার এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা—সব ক্ষেত্রেই সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি খাত ও অসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর সমবেত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবার অংশগ্রহণের ‘এনাবলিং এনভায়রনমেন্ট’ তৈরির কৃতিত্ব সরকারের। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন—আইএমএফ, এডিবি, বিশ্বব্যাংক ইত্যাদি) এ কারণেই বাংলাদেশের ওপর আস্থা রাখছে ধারাবাহিকভাবে। ইদানীং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সহযোগিতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও তারা তাই বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার তালিকার ওপরের দিকেই রাখবে। তবে এ নিয়ে আত্মতুষ্টিতে না ভুগে নিজেদের কমতিগুলো পুষিয়ে নেওয়ার দিকেও নজর দেওয়া চাই। শুরুতেই আইএমএফের যে ঋণ সহায়তার কথা বলেছি, সেই সহায়তার জন্য কিছু সংস্কারের শর্ত রয়েছে। ঋণ পাওয়ার শর্ত বলে নয়, বরং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বেগবান ও টেকসই করার জন্য দরকারি সংস্কার কার্যক্রম হিসেবেই এগুলোকে দেখা উচিত। এসব সংস্কারের প্রস্তাব আমরাই আমাদের বাজেট ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উপস্থাপন করেছি। বিশেষ করে কর কাঠামো এবং করনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। দুঃখের কথা যে আমাদের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনো ৮ শতাংশের আশপাশে। আমাদের আশপাশের দেশের এই অনুপাত এর দ্বিগুণেরও বেশি। প্রধানমন্ত্রী যেমনটি বলেছেন—জোরজবরদস্তি করে নয়, সংস্কার করে উপযুক্ত জনসম্পদ ব্যবহার করে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে এবং ‘ডিজিটাল আদায়’ পদ্ধতি চালু করে এই অনুপাত বাড়ানো সম্ভব। আইএমএফও একই সুরে কর-জিডিপি অনুপাত বছরে ০.৫ শতাংশ করে বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। একইভাবে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতে চলমান ভর্তুকি কাঠামো সংস্কারের কথা আইএমএফ বলেছে। এটি আমাদের মনের কথা। আমাদের বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখার দাওয়াই এটি, আইএমএফের প্রেসক্রিপশন নয়। আর্থিক খাতকে আরো বাজারনির্ভর এবং এই খাতের শাসনপদ্ধতি উন্নয়নের যে শর্ত আইএমএফ দিয়েছে, তা-ও আমাদের ম্যাক্রো-অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়াবে। ব্যাংকের পুঁজি পুনর্ভরণের মতো ‘বিলাসিতা’ করার সুযোগ আমাদের নেই। তাই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের টেকনিক্যাল জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এ সংস্কারগুলো করা গেলে তা অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন কৌশলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। আশার কথা, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং উন্নয়ন অংশীজনদের মধ্যে এই প্রশ্নে এক ধরনের ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। এখন দেখার বিষয় কতটা সাফল্যের সঙ্গে আমরা এই ঐকমত্যের আলোকে সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারি।

লেখক : ড. আতিউর রহমান
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর