ফেব্রুয়ারিতে ৫০ কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্য

তিন দিবসকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন ফুলের রাজ্য খ্যাত যশোরের গদখালী, এলাকার ফুলচাষিরা। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফুল উৎপাদন ভালো হয়েছে। দামও রয়েছে বেশ। চাঙ্গা হয়ে উঠছে ফুলের কেনাবেচা। ফুলচাষিদের আশা এ মৌসুমে ৫০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবেন।

এদিকে বসন্তবরণ, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে ঘিরে ফেব্রুয়ারিতে ফুল বিক্রি অন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। ফুলচাষ, সংগ্রহ ও ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত এ এলাকার লক্ষাধিক মানুষের কাছে উৎসবের মাস হিসেবে পরিচিত ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে কর্মব্যস্ততা আরও বেড়েছে। ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী, পানিসারা, নাভারণ ও নির্বাসখোলা এবং শার্শা উপজেলার উলাশী এলাকায় ফুলচাষ হয়েছে। গত কয়েকমাস ধরে চাষিদের পরিশ্রমে মাঠে মাঠে দোল খাচ্ছে গাঁদা, গোলাপ, জারবেরা, রজনীগন্ধাসহ বিভিন্ন ধরনের ফুল।

গদখালীর ফুল বাজারে বর্তমানে প্রতিটি গোলাপ ৩-৫ টাকা, গ্লাডিওলাস রং ভেদে ৮-১৪ টাকা, জারবেরা ৬-১০ টাকা, রজনীগন্ধা ৪-৬ টাকা, চন্দ্রমল্লিকা দেড়-২ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এক হাজার গাঁদা ফুল ৩৫০-৫৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের পর চাহিদা ব্যাপক বেড়ে যায়। তখন ফুলের দর আরও বাড়বে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। বসন্তবরণে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় হলুদ রঙের গ্লাডিওলাস ও গাঁদা। বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে গোলাপ আর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে গাঁদা ফুল বেশি বিক্রি হয়।

গতবছর বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে একশ’ গোলাপ দুই হাজার টাকা পর্যন্তও বিক্রি হয়েছিল বলে চাষিরা জানান। ঝিকরগাছা উপজেলার পানিসারা ইউনিয়নের পানিসারা গ্রামের ফুলচাষি ইসমাইল হোসেন বলেন, এবছর ৫ বিঘা জমিতে চন্দ্রমল্লিকা লাগিয়েছি। ৩ বিঘার ফুল বিক্রি শেষ হয়েছে। কিছুদিন আগে ফুলের দাম কম থাকায় ৫শ’ টাকা হাজার দরে বিক্রি হয়েছে। তবে এখন দুই টাকা পিস বিক্রি হচ্ছে। এবছর চাষাবাদে দেড়লাখ টাকা খরচ হয়েছে এবং ৪-৫ লাখ টাকা বিক্রি হবে বলে আশা করছি।

তিনি চন্দ্রমল্লিকার রেণু চারা তৈরি ও টিউলিপ ফুলও চাষ করেন। গত বছর কৃষি অফিসের সহযোগিতায় প্রথম টিউলিপ চাষ শুরু করেন। গদখালী ইউনিয়নের কোটুয়াপাড়া গ্রামের ফুলচাষি সাবেক ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, এবছর ফুল খুব ভালো হয়েছে। আমি আড়াই বিঘা জমিতে রজনীগন্ধা, গোলাপ ও কামিনী (পাতার জন্য) চাষ করেছি। আশা করছি দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা বিক্রি হবে। ফুলচাষি শাহজাহান, রাসেল ও জাহিদুল বলেন, এবছর আবহাওয়া ভালো থাকায় উৎপাদন খুব ভালো হয়েছে। দামও ভালো পাচ্ছি। গদখালী বাজারের ফুল ব্যবসায়ি নাজমুল হোসেন বলেন, বাজারে ফুলের ভালো দাম রয়েছে।

এক হাজার গাঁদা ৩৫০-৬৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। গোলাপ প্রতিটি ৩-৫ টাকা। চাহিদা এখন কিছুটা কম থাকলেও বসন্তবরণ ও ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই গোলাপ ও গাঁদা ফুলের বিক্রি প্রচুর বেড়ে যায়। তখন দাম আরও বাড়বে। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি ও যশোর ফুল উৎপাদক ও বিপনন সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, গতবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফুল উৎপাদনে অনেক ক্ষতি হয়েছিল। এবার কৃষকরা ফুলের মূল্য ভালো পাচ্ছে। ফুলের অবস্থাও ভালো।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার ৫০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে বলে আশা করছি। তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্নস্থানে এখান থেকে ফুল যাচ্ছে। দেশের ৭০ শতাংশ ফুলের চাহিদা আমাদের এলাকা থেকে পূরণ হয়। মাঝেমধ্যে বিদেশেও কিছু ফুল রপ্তানি করা হয়েছিল। নিয়মিত বিদেশে ফুল পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারলে চাষিরা বেশ উপকৃত হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় এ বছর ৭০০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয়েছে। গত বছর ৬৪০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছিল। এ বছর ৬ হাজার চাষি ফুলচাষ করেছেন। জেলার ৯৫ শতাংশ ফুল চাষ হয় ঝিকরগাছা উপজেলায়। সেখানে এ বছর ৬৩০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ও পানসারি ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি ফুল চাষ হয়।

ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ হোসেন পলাশ বলেন, ঝিকরগাছা উপজেলায় ৬৩০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয়েছে। ফুল চাষের সঙ্গে এ এলাকার লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার সম্পর্ক রয়েছে। কৃষি অফিস চাষিদের সার্বিক সহযোগিতা করছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মনজুরুল হক বলেন, গতবারের তুলনায় উৎপাদন অনেক ভালো হয়েছে। চাষিরা করোনা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি এবার পুষিয়ে নিতে পারবে। বাজারজাতকরণে অবকাঠামো করে দেয়া হয়েছে। এ বছর চাষিরা ৫০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি। তবে সারাদেশে ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততার কথা হিসাব করলে এর মূল্য এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।