সরিষায় ভাসছে দেশ, উৎপাদন বাড়ার সম্ভাবনা ৩ লাখ টন

ঋতুর পালাবদলে চলছে শীতকাল। এখন রবিশস্যের মৌসুম। তাই বাংলার মাঠ জুড়ে হলুদের সমারোহ। সরিষার নয়ন ভুলানো সৌন্দর্য শুধু মৌমাছিকেই নয় আকৃষ্ট করছে মানুষকেও। যেন সরিষায় ভাসছে পুরো দেশ! কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে সরিষার চাষ। এর মধ্যে সম্প্রতি বিদেশ থেকে আমদানি করা সয়াবিনের কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় ও ভোজ্যতেলের আমদানি কমাতে পরিকল্পিতভাবেই দেশে সরিষার আবাদ বাড়ানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।

এবারও দেশের প্রায় প্রতিটি এলাকায় বেড়েছে তেলজাতীয় এই ফসলের আবাদ। গত বছরের চেয়ে দেশে এবার দুই লাখ হেক্টরের চেয়ে বেশি জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। এবার প্রায় তিন লাখ টন বেশি সরিষা উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কৃষকরা বলছেন, তারা এখন সরিষা আবাদে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এখন পর্যন্ত ফলন ভালো হয়েছে। সরিষার ভালো উৎপাদনে শেষ হাসির অপেক্ষায় এখন তারা। কৃষিসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে কৃষি সচিব ওয়াহিদা আক্তার বলেন, ‘সরিষা আবাদ করলে কৃষক অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়। কেবলমাত্র আবাদি জমি নয়, আমরা পতিত জমিতে সরিষা আবাদে কৃষকদের উৎসাহিত করছি। তাদের নানাভাবে মোটিভেশন করছি। এ বছর দেশে সরিষার আবাদ বেশ ভালো হয়েছে। ফলনও ভালো হবে বলে আশা করছি। এছাড়া কৃষক সরিষার দামও ভালো পাবে বলে প্রত্যাশা আমাদের। বাজারে সরিষার দামও ভালো আছে। সবমিলিয়ে সরিষা আবাদ করে কৃষকরাও খুশি।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা গত বছর থেকে সরিষা আবাদে অধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছি। আবাদ বাড়ানোর জন্য তিন বছরের একটি রোডম্যাপ করেছি। ভোজ্য তেলের চাহিদার ৪০ ভাগ আমরা স্থানীয়ভাবে মেটাতে চাই, যেখানে বর্তমানে ১০ ভাগেরও কম ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। আগামীতে আরও আবাদ বাড়বে। আমরা যে লক্ষ্যমাত্রা বা রোডম্যাপ তৈরি করেছি, মাঠে এবার তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। আগামী দুয়েক বছরের মধ্যেই আমরা ভোজ্যতেলের চাহিদার ৪০ ভাগ স্থানীয়ভাবে মেটাতে পারব।’ এক প্রশ্নের উত্তরে মহাপরিচালক বলেন, ‘ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরিষা কাটা শুরু হয়েছে। এখন সবধরনের সরিষাতেই ফুল এসেছে। ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখের মধ্যে দেশের সব এলাকায় সরিষা কাটা শেষ হবে বলে আমরা ধারণা করছি।’

বাড়ছে সরিষার আবাদ
২০১৭-১৮ অর্থবছর অর্থাৎ ২০১৭ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় প্রতিবছরই বেড়েছে তেলজাতীয় এই ফসলের আবাদ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরিষা আবাদ হয়েছিল ৪ লাখ ৭৭ হাজার হেক্টর জমিতে। পরের ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২১ হাজার হেক্টর। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আবাদ ৫ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর ও ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছিল। এদিকে, ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯, ২০১৯-২০, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে সরিষার উৎপাদন যথাক্রমে ৬ লাখ, ৬ লাখ ৮৩ হাজার, ৭ লাখ ৫০ হাজার, ৭ লাখ ৮৭ হাজার ও ৮ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন।

বর্তমান চিত্র
দেশে এবার সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর। আবাদ হয়েছে ৮ লাখ ১২ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে। বছরটিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৯ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিক টন। তবে আবাদ বেশি হওয়ায় ১১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন আবাদের সম্ভবনা রয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ৬ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে। সমপরিমাণ জমিতে উৎপাদন হয়েছিল ৮ লাখ ৫৪ হাজার টন। কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত হেক্টর প্রতি ১ দশমিক ৪ টন সরিষা উৎপাদন হয়ে থাকে। প্রতি টন সরিষার বাজার মূল্য আনুমানিক ৮০ হাজার টাকা।

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার কৃষক জব্বার বলেন, ‘এবার আমাদের এলাকায় সরিষার ভালো ফলন হয়েছে। অন্যবারের চেয়ে আবাদ অনেক বেশি। আশা করা যায় এবার উৎপাদন ভালো হবে।’ তিনি বলেন, ‘এক সময় আমাদের এসব জমি পতিত থাকতো। এখন সেখানে সরিষার আবাদ করছি। এতে আমরা উপকৃত হচ্ছি।’

ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার কৃষক মোস্তফা বলেন, ‘এবার এলাকায় সরিষার আবাদ বেশ ভালো হয়েছে। ফলন ভালো হবে বলেই মনে হচ্ছে।’ এই উপজেলার কৃষক রফিক বলেন, ‘আমন ও বোরোর মাঝামাঝি সময়ে আমাদের এসব জমি পতিত থাকত। এখন সেখানে সরিষা আবাদ করছি। এবার আমার ১০ কাঠা (পৌনে সাত শতাংশে এক কাঠা) জমিতে সরিষা আবাদ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে।’

সরকারিভাবে নানা প্রণোদনা থাকলেও কৃষকদের অভিযোগও রয়েছে। রংপুরের পীরগঞ্জের সরিষা চাষি আফছার আলী বলেন, ‘আমি এক একর জমিতে সরিষা লাগিয়েছি কিন্তু সরকারি কোনো সহায়তা পাইনি। এমনকি এলাকার কৃষি কর্মকর্তাদের কোনো পরামর্শও পাইনি। পরামর্শ পেলে ফলন আরও ভালো হতো।’

সহায়তা না পাওয়ায় কি ধরনের সমস্যা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তেমন সমস্যা না। তবে, এই সরিষার আবাদ না করার কারণে অনেক কিছু জানা যায় না। আমি হঠাৎ করে সরিষা ক্ষেতে পানি সেচ দিয়েছিলাম। এই সেচ দেওয়ার কারণে সরিষার আবাদটা ডাউন (ভালো হয়নি) হয়েছে। যদি কৃষি অফিসাররা আমাদের খোঁজ নিত তাহলে এমন সমস্যায় পড়তে হতো না।’

সরিষা আবাদে সরকারি কোনো প্রণোদনা পেয়েছেন কিনা? জানতে চাইলে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার বাঘবাড়ি গ্রামের কৃষক আরিফ বলেন, ‘শেষ দিকে সরিষা লাগিয়েছি। এখন গাছে ফুল এসেছে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কেমন ফলন হয়। তবে সরকারিভাবে কোন প্রণোদনা পাইনি। সরকারি বীজও পাইনি।’ একই রকম কথা বলেন ওই উপজেলায় কৃষির সঙ্গে যুক্ত মাইজাবাড়ী গ্রামের তাইজ উদ্দিন।

তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়াতে প্রকল্প
দেশে তেলজাতীয় ফসলের আবাদ বাড়াতে ‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি’ শীর্ষক একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২০ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়। শেষ হবে ২০২৫ সালের জুনে। প্রকল্পের ব্যয় ২২২ কোটি ১৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। এই প্রকল্পের অধীনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১৩ হাজার ৯৭৯ টি প্রদর্শনী করা হয়েছে। প্রদর্শনীতে ৩ হাজার ৫২৫ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। এসব প্রদর্শনীতে বীজ ও সার সবই বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে।

তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক মো. জসীম উদ্দিন বলেন, ‘চলতি বছর দেশে সরিষার আবাদ বেড়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ। কয়েক বছর মধ্যে এবারই সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে। ২০১৫-১৬ সালের দিকে সরিষার আবাদ কমতে শুরু করেছিল। ২০১৭ সাল থেকে আবারও সরিষার আবাদ বাড়তে শুরু করে।’

প্রকল্পের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে একর প্রতি বা হেক্টর প্রতি সরিষার উৎপাদন বাড়ানো। সে লক্ষ্যে আমরা গতানুগতি জাতের পরিবর্তে বারি-১৪, বারি-১৭, বারি-১৮, বিনা-৪ ও বিনা-৯ জাতের সরিষা আবাদে কৃষকদের উৎসাহিত করছি এবং আমরাও এসব জাত ব্যবহার করছি। দুটি ধান ফসলের মাঝখানে আমরা সরিষাকে অন্তর্ভুক্ত করেছি। রোপা আমনে স্বল্প জীবনকালের ধান ব্রি ধান-৭১, ব্রি ধান-৭৫, ব্রি ধান-৮৭, বিনা ধান-৭ ও বিনা ধান-১৭ এগুলো রোপনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এরপর স্বল্পকালীন সরিষা বারি-১৪, বারি-১৭, বিনা-৪ ও বিনা-৯, এগুলো ৮০ দিনের জাত- এসব জাতের সরিষা রোপনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তারপরে উচ্চফলনশীল বোরো ধান রোপনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া চরাঞ্চল, লবণাক্ত অঞ্চল ও পাহাড়ী জমিতে সরিষা আবাদের ৩ বছর মেয়াদী একটি কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে ৩ বছরের মধ্যে ৪০ ভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা।’

এদিকে, কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ১০ লাখ বিঘা জমিতে সরিষা আবাদে প্রণোদনা দিয়েছে। প্রণোদনার আওতায় কৃষকদের সরিষা বীজ ও রাসায়নিক সার বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, ভোজ্যতেলের ৯০ ভাগ দেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। দেশের উৎপাদিত ভোজ্যতেল দিয়ে মাত্র ১০ ভাগ চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। ৯০ ভাগ ভোজ্য তেল আমদানি করতে ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হয়। সয়াবিন তেলের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার সরিষা চাষের পরিধি বাড়াতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। সরকারি নানা সহায়তা ও প্রণোদনার কারণে কৃষক এখন সরিষা চাষে অধিক উৎসাহী হয়ে উঠছেন বলে মনে করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।