ঢাকার নবাবগঞ্জে হচ্ছে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ব্যয় ১৯১৫ কোটি

কর্মসংস্থান, দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচন ও পরিকল্পিত শিল্পায়নে সারাদেশে একশটি অর্থনৈতিক অঞ্চল করছে সরকার। এটি সরকারের উন্নয়ন নীতির একটি অংশ। এরই অংশ হিসেবে ঢাকার নবাবগঞ্জে ৮৭৪ একর জমিতে স্থাপন করা হবে অর্থনৈতিক অঞ্চল। এ খাতে প্রস্তাবিত ব্যয় এক হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এরই মধ্যে প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে।

জানা যায়, চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) আবদুল বাকীর সভাপতিত্বে কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ‘নবাবগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনা’ শীর্ষক প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়।

পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রকল্পের পিইসি সভা করেছি। বেজা এটা বাস্তবায়ন করছে। ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৮৭৪ একর এলাকা নিয়ে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল গেড়ে তোলা হবে। থাকবে একটি সংযোগ সড়ক। সড়কটি মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলায় ১২ দশমিক ৫১৬ একর ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় মোট এক হাজার ৯১৫ কোটি টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের (অর্থ বিভাগ) কাছ থেকে ঋণের মাধ্যমে এ ব্যয় নির্বাহ করা হবে।

প্রকল্প প্রস্তাবটি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দবিহীনভাবে অননুমোদিত নতুন প্রকল্প তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আছে বলে জানায় পরিকল্পনা কমিশন।

বেজার পক্ষ থেকে উপ-সচিব মো. নাজমুল আলম বলেন, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটার হাউজ কোপার্সের মাধ্যমে একটি প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে। সেই আলোকে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণসহ কতিপয় অফসাইট ও অনসাইট অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব করে প্রকল্প প্রস্তাবটি (ডিপিপি) প্রণয়ন করা হয়েছে। দুই শতাংশ সুদে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য অর্থ বিভাগের সম্মতি মিলেছে।

বেজা জানায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি অগ্রাধিকার প্রকল্প। ‘নবাবগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনা’ শীর্ষক প্রকল্পটি জুলাই ২০২৩ থেকে জুন ২০২৬ মেয়াদে মোট এক হাজার ৯১৫ কোটি টাকায় বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকা রাজধানীর খুব কাছে, তাই এটি একটি লাভজনক প্রকল্প হবে।

তবে পরিকল্পনা কমিশন জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিআইডব্লিউটিএর ছাড়পত্র নিতে হবে। প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন প্রক্রিয়ার আগে সমীক্ষা জরুরি।

আইএমইডি বলছে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না হওয়ার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে অসুবিধা হয় এবং প্রকল্প ব্যয় ও বাস্তবায়ন মেয়াদ বাড়ে। তাই বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

প্রকল্প অনুমোদনের পরে সার্বিক সমীক্ষা হবে। ভৌত কাজের জন্য সরকারের বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগ থেকে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে হালনাগাদ করা অনুমোদিত রেট শিডিউল অনুযায়ী। প্রকল্পের আওতায় চার লেনের সংযোগ সড়ক নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে সংযোগ সড়কের সংস্থান রাখা হলেও তা সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে ডেলিগেটেড ওয়ার্ক হিসেবে বাস্তবায়ন করা হবে- জানায় বেজা।

এ প্রকল্প প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগ জানায়, যদি থোক খাতে অর্থ থাকে কেবল সেক্ষেত্রে প্রকল্পে অর্থায়নের সুযোগ থাকতে পারে। অন্যথায় আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। বৈদেশিক প্রশিক্ষণ/স্ট্যাডি ট্যুর, পরামর্শক সেবা ও সেমিনার/কনফারেন্সের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে বেজা জানায়, বেজা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কাজ করে। তাই সেমিনার-কনফারেন্স খাতে বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। অপরদিকে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং নিয়মিত উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা অর্জন প্রয়োজন। এ বিবেচনায় বৈদেশিক প্রশিক্ষণ/স্ট্যাডি ট্যুর খাতে কিছু বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে এসব ব্যয় যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনসাপেক্ষে করা হবে।

পরামর্শক বিষয়ে বেজার যুক্তি, নিজস্ব লোকবল কম থাকায় বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শক সেবা নিতে হয়। আগের বিভিন্ন প্রকল্পের অভিজ্ঞতার আলোকে এ খাতে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে।

আগামী ১৫ বছরে ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে একশ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার। প্রতি জেলায় থাকবে একাধিক অর্থনৈতিক অঞ্চল। এরই অংশ হিসেবে প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারি, বেসরকারি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) ও বিদেশি- এই চার ধরনের অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন নিয়ে কাজ করছে সরকার।

এসব অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারী টানতে কর অবকাশ সুবিধা, আয়ের ওপর কর মওকুফ, যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ আরও অনেক প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। এরই মধ্যে তাইওয়ান, চীন, জাপান, ভারত, ফিলিপাইন, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা এসব অঞ্চলে বিনিয়োগ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সরকারের পক্ষে তাদের জন্য অঞ্চল নির্ধারণও করা হয়েছে। বেসরকারিভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে দেশীয় অনেক শিল্পগ্রুপ। বেজার পক্ষ থেকে এরই মধ্যে ছয়টি সফল ব্যবসায়ী গ্রুপকে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় প্রাকযোগ্যতা লাইসেন্সও দেওয়া হয়েছে।

বেজা জানায়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, সাভার আর গাজীপুরে অপরিকল্পিতভাবে কিছু শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলেও মূলত কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর ভর করেই সেগুলো টিকে আছে। তাই কৃষি আর গ্রামীণ অর্থনীতির পুরোনো বৃত্ত ভেঙে পরিকল্পিত শিল্পায়নের পথে এগোনোর উদ্যোগ এসব অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা।

এ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো বাস্তবায়িত হলে পুরো দেশের চেহারাই পাল্টে যাবে। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করতে এ অঞ্চলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আগামী ১৫ বছরের মধ্যে একশটি অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে অতিরিক্ত রপ্তানি আয় হবে চার হাজার কোটি ডলার। দেশে কর্মসংস্থান হবে অন্তত এক কোটি লোকের। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন দেশের অর্থনীতি গতি পাবে, তেমনি বেকার সমস্যা থেকেও মুক্ত হবে বাংলাদেশ।