সরিষা চাষের অর্থনীতি

সারাদেশে এখন সরিষা ফুলের হাতছানি, কৃষকের মুখে ফুটছে হাসি! কৃষক আশাবাদী এ সরিষার বাম্পার ফলনে কৃষকের আয় বাড়বে নিশ্চিতভাবে। সরিষার রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার। এই শীত মৌসুমে সরিষা শাকের ঝাঁজালো গন্ধে, মুখের রুচি বাড়ে অনায়াসে। কে না ভালোবাসে এ সরিষাশাক! সরিষা শাক যাকে চট্টগ্রামের ভাষায় রাই শাক বলে থাকে। সেটি বিক্রি করেও কৃষকের অতিরিক্ত আয় হয়। সরিষা চাষের সঙ্গে মৌ চাষ বেশ মানানসই। সরিষা ফুলের মধু সবার প্রিয়। আর এ মধুর গুণ তো বলে শেষ করা যাবে না। অনেক জায়গায় সরিষা চাষের জমিতে তরে তরে মৌ এর বাক্স সাজিয়ে রাখছে, মৌমাছিদের আনাগোনা বাড়ছে!

সরিষা ফুল থেকে মৌমাছিরা দলে দলে মধু সংগ্রহ করছে। আর রানী মৌমাছি বসে বসে তা পাহারা দিচ্ছে। কি এক অপরূপ দৃশ্য! এ সরিষা ফুলের মধুর কদর বাজারে বেশ। দামও বেশ চড়া। ফলে যেসব কৃষক সরিষা চাষের সঙ্গে মৌ চাষ করছে তাদের বাড়তি আয় যোগ হবে অনায়াসে।

বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেশ চড়া। সয়াবিন তেল তো পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। আর তাই সরকারের তরফ থেকে ভোজ্যতেল আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশেই তেলবীজ ফসলের আবাদ বাড়ানোর তাগিদ রয়েছে। এটি বাস্তবায়নে কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ সরিষা আবাদ বাড়াতে উঠেপড়ে লেগেছে। কৃষকরাও সরিষা আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠছে। ফলে বিগত বছরের চাইতে চলতি মৌসুমে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে সরিষা আবাদ চোখে পড়ার মতো! হলুদ রঙের সরিষা ফুলের আকর্ষণে পর্যটকদেরও দৃষ্টি কাড়ে! সয়াবিন তেলের চেয়ে এক সময় সরিষা তেলের ব্যবহার ও কদর ছিল বেশি। অনুমান করা যায় সে দিন আবার ফিরে আসবে। এখনো মানুষ ঘানিতে ভাঙ্গা খাঁটি সরিষার তেল সংগ্রহ করতে লম্বা লাইন চোখে পড়ে। এ দৃশ্য নিয়মিত চোখে পড়ে চট্টগ্রামের চাঁদগাঁও আবাসিক এলাকার বি-ব্লকের বড় মসজিদের পাশে খেলার মাঠে। শুধু সেখানে নয় অন্য জায়গায় ও মানুষ হন্যে হয়ে খুঁজছে ঘানি ভাঙ্গা সরিষার তেল। এ তেলের কদর বেশ। এখন রান্না-বান্নায়ও গৃহীনিরা সরিষার তেল ব্যবহার করছে অনায়সে। এটি স্বাস্থ্যসম্মতও বটে। রান্না-বান্নাতে সরিষার তেল ব্যবহার ছাড়াও এর  হরেক-রকম ব্যবহার রয়েছে। আচার তৈরিতে এ সরিষা তেলের জুড়ি মেলা ভার!

সরিষার তেলে থাকা ওমেগা ৩, ওমেগা ৫ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ভিটামিন ই শরীরকে প্রয়োাজনীয় পুষ্টি উপাদান যোগান দেয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। সরিষার তেলের ঝাঁজালো উপাদান শ্লেষ্মা এবং অবরুদ্ধ সাইনাস পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। প্রথম সারির জাতীয় দৈনিক সূত্রে বিভিন্ন ভোজ্যতেলের তুলনামূলক এক সমীক্ষার বরাতে জানা যায়, সরিষার তেল ৭০ শতাংশ হৃদরোগ সংক্রান্ত রোগের ঝুঁকি কমায়। এটি ব্যবহারে কোলেস্টেরল মাত্রা হ্রাস পায়, যা হৃদরোগের আশঙ্কা কমিয়ে দেয়। এছাড়াও সরিষার তেল চুল ও ত্বকের যত্নও কাজে লাগে। তবে এসব ক্ষেত্রে সরিষার তেল খাঁটি কিনা এটি নিশ্চিত হওয়া জরুরি। বিভিন্ন জাতের সরিষার বীজে প্রায় ৪০-৪৪% তেল থাকে। খৈলে প্রায় ৪০% আমিষ থাকে। তাই খৈল গরু ও মহিষের জন্য খুব পুষ্টিকর খাদ্য।

দেশের গ্রামীণ  জীবনে এ সরিষার তেল খুব গুরুত্বপূর্ণ। রান্না ছাড়াও সর্দি জ্বর বা ভেষজ ওষুধ তৈরিতে এই তেলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সরিষার উপজাত বা বাই প্রডাক্ট জ্বালানি আর খৈল গ্রামীণ মহিলাদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। মাছের বা গরুর খাদ্য আর মাটির জৈব সার হিসাবে এর অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে অনেক। তাই সরিষা চাষ বাড়াতে মনোযোগের দাবি রাখে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক) এর সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. ওয়ায়েস কবির। সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের কারণে দেশে সরিষা আবাদ ব্যাপকহারে বাড়ছে। কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ-২০২১ এর তথ্যানুসারে দেশে রাই/স্থানীয় ও উফশী জাত মিলে ২০২০-২১ সালে ৮ লাখ ১৪ হাজার ২৮৮ দশমিক ৫৪ একর জায়গায় সরিষা আবাদ হয়েছিল। যার মোট উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৫৯৪ দশমিক ২৮ মেট্রিক টন। তারমধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ৬ হাজার ৯ দশমিক ১৪ একরে উক্ত অর্থবছরে মোট সরিষা উৎপাদন হয়েছিল ২ হাজার ৩৭১ দশমিক ৩৮ মেট্রিক টন।

অনেক জাতের সরিষা রয়েছে। এসব স্বল্পমেয়াদি সরিষার সঙ্গে আগে পরে ধান চাষ করা যায়। যেমন স্বল্পমেয়াদি আমন ধান কাটার পর স্বল্পমেয়াদি সরিষা (যেমন বারি সরিষা-১৪, ১৫, ১৭), এরপর বোরো ধান চাষ করা যায়। ফলে নতুন একটি লাভজনক শস্য পর্যায়  আমন-সরিষা-বোরো আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ বেড়ে যায়। তাতে দুই ফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর সহজ হবে এবং কৃষকের আয় বাড়বে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এর আঞ্চলিক কার্যালয়, সোনাগাজী, ফেনীর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. বিশ্বজিৎ কর্মকার জানান, স্বল্পমেয়াদি আমন ধান যেমন বিরি ধান ৭১, বিরি ধান-৭৫ এবং স্বল্পমেয়াদি বোরো ধান যেমন বিরি ধান ৬৭ (যা লবণাক্ত সহিষ্ণু), বিরি ধান ৭৪, ৮৪, ৮৮, ৯৬ ও বঙ্গবন্ধু ধান ১০০ এই শস্য পর্যায়ের জন্য বেশ উপযোগী। তবে একক ফসল হিসাবে বারি সরিষা-১৮ চাষ করে উত্তরবঙ্গে অনেক কৃষক লাভবান হয়েছে বলে জানা যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সম্প্রতি বারি সরিষা-২০ ও উদ্ভাবন করেছে। কৃষক পর্যায়ে এসব উচ্চ ফলনশীল সরিষা জাতের বীজ সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।

সরিষা সংগ্রহের পর সরিষা বীজ থেকে তেল আহরণের আধুনিক প্রযুক্তি বা কমিউনিটি ভিত্তিক ঘানির ব্যবস্থা করা গেলে কৃষক সহজেই তেল আহরণ করতে পারবে। সূত্রমতে, সাধারণত তেল দুইভাবে আহরণ করা হয়। প্রথমটি হলো- কোল্ড প্রেসিং- সহজ ভাষায় ঘানি ভাঙ্গা বুঝায়। এটা কাঠের এবং মেটাল দুইভাবেই হয়ে থাকে। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সরিষা বীজ থেকে তেল আহরণ করা হয়, তাতে আহরিত তেলের পুষ্টিমান অক্ষুণ্ণ থাকে। এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত তেলের পরিমাণ এবং তেলের স্থায়িত্ব (shelf life) কম হয়। যে কারণে এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত তেলের (বোতলজাত) দাম বেশি। এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত তেলকে ভার্জিন গ্রেড বলে। দ্বিতীয়টি হলো হট প্রেসিং- সাধারণত বাণিজ্যিকভাবে এই পদ্ধতিতে তেল উৎপাদন করা হয়। কারণ যে সব তৈল বীজে তেলের পরিমাণ কম থাকে (যেমন- সয়াবিন বীজে তেলের পরিমাণ ১৭-২০%) তাদের হট প্রেসিং এর মাধ্যমে প্রসেস করা হয়। এই পদ্ধতিতে তেলের তুলনামূলক পরিমাণ ও স্থায়িত্ব বাড়লেও হট প্রেসিং এর প্রতিটার ধাপে তেলের পুষ্টিমান কমতে থাকে এবং ফ্রি র‌্যাডিকেল, ট্রান্সফ্যাট ইত্যাদির পরিমাণ বাড়তে থাকে।

যার কারণে এই পদ্ধতিতে উৎপাদিত তেলের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে শরীরে রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে দৈনিক পত্রিকার সংবাদে প্রচার রয়েছে।

পুষ্টিমান বিবেচনায় কোল্ড প্রেসড তেলের বিকল্প নেই। কিন্তু চাইলেই সব তেল বীজ ঘানিতে ভাঙানো সম্ভব নয় বিশেষ করে যেসব বীজে তেলের পরিমাণ কম থাকে। প্রচলিত পদ্ধতিতে বাংলাদেশে কেবল সরিষা ঘানিতে ভাঙা হয়। দেশীয় পদ্ধতিতে এ তেল আহরণ করা যায় বলে এই ভোজ্য তেল হিসেবে এই তেল নিরাপদ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টজনরা। সরিষার তৈল বেশ স্বাস্থ্য সম্মত বলেও জানান অনেক ডাক্তার।

লেখক : প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, বারি, চট্টগ্রাম