মডেল মসজিদ ইতিহাসের নবদিগন্ত

গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গত সোমবার দেশে মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ৫০টি মসজিদ ও ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৯ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকায় যে ৫৬৪টি মডেল মসজিদ ও ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সরকার নির্মাণ করছে, তার মধ্যে দুই দফায় ১০০টির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে প্রথম পর্যায়ে ৫০টি মডেল মসজিদের উদ্বোধন করা হয় ২০২১ সালের ১০ জুন। সরকার আশা করছে, ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ নাগাদ আরও ৫০টি মসজিদ ও ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র চালু করা সম্ভব হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি উন্নত মসজিদ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি মসজিদ ও ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। ৪০ থেকে ৪৩ শতক জায়গায় তিন ক্যাটাগরিতে এসব মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে। জেলা পর্যায়ে চারতলা, উপজেলার জন্য তিনতলা এবং উপকূলীয় এলাকায় চারতলা মডেল মসজিদ ও ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। নান্দনিক নির্মাণশৈলীতে নির্মীয়মাণ এসব মডেল মসজিদে রয়েছে একটি করে মিনার।

মডেল মসজিদ ও ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে নারী ও পুরুষের আলাদা অজু ও নামাজের জায়গা রাখা হয়েছে। হজ গমনেচ্ছুদের জন্য নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, লাইব্রেরি, ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, গবেষণা কেন্দ্র, ইসলামি বই বিক্রয় কেন্দ্র, কোরআন হেফজ বিভাগ, শিশু শিক্ষা, অতিথিশালা, মৃতদেহ গোসলের ব্যবস্থা, অটিজম কেন্দ্র, ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ইমাম-মুয়াজ্জিনের আবাসনসহ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অফিস এবং গাড়ি রাখার জায়গা রাখা হয়েছে। এসব মসজিদে প্রতিদিন চার লাখ ৯৪ হাজার ২০০ জন পুরুষ ও ৩১ হাজার ৪০০ জন নারী একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারবেন। একসঙ্গে প্রায় ৩৪ হাজার মানুষ কোরআন তেলাওয়াত করতে পারবেন, ৬ হাজার ৮০০ জন ইসলাম বিষয়ে গবেষণা করতে পারবেন, ৫৬ হাজার মানুষ দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নিতে পারবেন এবং প্রতি বছর এখান থেকে ১৪ হাজার শিক্ষার্থী কোরআন মাজিদের হাফেজ হবেন।

মসজিদকে বলা হয় সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালার ঘর ও মুসলিমদের ইবাদতকেন্দ্র। মসজিদ প্রত্যেক মুসলমানের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও পবিত্র জায়গা। ইসলামে মসজিদ নির্মাণ এবং মসজিদ সংরক্ষণের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদ নির্মাণ করবে, আল্লাহতায়ালা তার জন্য জান্নাতে অনুরূপ ঘর নির্মাণ করবেন।’ -সহিহ বোখারি : ৪৫০

সারা দেশে ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের জন্য এতগুলো মডেল মসজিদ নির্মাণ বিরল এক ঘটনা। ইতিহাস হয়ে থাকবে শেখ হাসিনার এই কর্ম ও মুসলমানদের প্রতি তার মমত্ববোধ ও ভালোবাসার কথা। এক অনন্য, অসাধারণ, বিস্ময়কর ও ইতিহাস সৃষ্টিকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে মসজিদ নির্মাণের ইতিহাস সোনালি হরফে লিখিত থাকার মতো ঘটনা। শুধু এই মসজিদ নির্মাণই শেষ নয়। এর আগেও মুসলমানদের প্রতি ভালোবাসা এবং ইসলামের শান্তির বাণী চারদিকে ছড়িয়ে দিতে তিনি নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর মধ্যে কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি, দারুল আরকাম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও আলিয়া মাদ্রাসার জন্য স্বতন্ত্র আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা উল্লেখযোগ্য।

শতকরা ৯২ জন মুসলিম জনসংখ্যার এই দেশে তিন লক্ষাধিক মসজিদ রয়েছে বলে জানা যায়। এদিক থেকে বাংলাদেশ মসজিদের দেশ হিসেবে অনেক আগেই পরিচিতি লাভ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তার সরকার আরও ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে যে চমক সৃষ্টি করেছেন তা বিস্ময়কর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব মহলের সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য এবং আমরাও জানাই অভিনন্দন-মোবারকবাদ।

মডেল মসজিদের উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এগুলোর যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কথা বলেছেনতা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের মসজিদের ইতিহাসে এক নয়া অধ্যায়ের সূচনা হবে। এ দেশে মসজিদ সম্পর্কে যাদের মন পরিষ্কার নয়প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মডেল মসজিদ নির্মাণের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ এবং ইসলাম সম্পর্কে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বক্তব্য তারাও অনুধাবন করতে পারবেন।

প্রধানমন্ত্রী মডেল মসজিদ উদ্বোধনকালে মসজিদের গুরুত্বের ওপর যে অসাধারণ বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তা প্রত্যেকটি মুসলিম হৃদয়কে নাড়া দেবে। তার গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের সঙ্গে সবাই একমত হবেন যে, তিনি ‘লেবাস নয়, ইনসাফের ইসলামে বিশ্বাসী’ হওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি মডেল মসজিদ নির্মাণের যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের বিবরণ দিয়েছেন, তা তার সুস্থ চিন্তা ও চেতনাসমৃদ্ধ, গভীর ইসলামি চিন্তাধারারই বহিঃপ্রকাশ। তার সুউচ্চ চিন্তাধারার এরূপ মডেল মসজিদ সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে এবং তাতে একটি আদর্শ সমাজ গড়ে উঠতে পারে। এসব মসজিদের মাধ্যমে প্রচলিত বহু সামাজিক অন্যায়, বঞ্চনা এবং নানা কুসংস্কারের অবসান ঘটা সম্ভব।

মডেল মসজিদ উদ্বোধনের বিষয়টি খুবই আনন্দের। তবে এসব মসজিদ নির্মাণে বিভিন্ন স্থানে কিছু অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টির আড়ালে থাকার কথা নয়। মসজিদগুলোকে যেমন রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে তেমনি দুর্নীতিমুক্তভাবে পরিচালনার জন্য সুষ্ঠু, সুন্দর ও ত্রুটিমুক্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে। মসজিদের আয়-ব্যয় ও পরিচালনায় অপচয় ও দুর্নীতি কঠোর হস্তে দমনের ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং মসজিদকে যেন কেউ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে না পারে, সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, মডেল মসজিদগুলো যেন বিদ্যমান মসজিদগুলোর প্রতিপক্ষ হয়ে উম্মতকে বহুধাবিভক্ত না করে। এ জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, যোগ্য, নিরপেক্ষ ইমাম-খতিব-মুয়াজ্জিন নিয়োগের পাশাপাশি মসজিদ কমিটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা।

মডেল মসজিদ নির্মাণে যে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে তা যেন কেবল মসজিদের উন্নয়নের প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হয়। কোনোরূপ তছরুফ-অনিয়ম যেন না হয়, সেদিকে কড়া দৃষ্টি রাখতে হবে। কেননা মসজিদের অর্থ অন্যায়ভাবে ব্যবহার করা হলে অথবা তার অপচয় করলে খোদায়ি গজবের আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ মসজিদ পরিচালনার ক্ষেত্রে সততা বজায় রাখতে হবে এবং অন্যায়, দুর্নীতিকে কোনো অবস্থাতেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। কেননা তাতে সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ভেস্তে যেতে পারে।

লেখক : মুফতি এনায়েতুল্লাহ,
শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক