মধুপুরে সবজির বাম্পার ফলন, দামেও খুশি কৃষক

টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ে শীতকালীন সবজি চাষে এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। বাজারে দামও মিলছে আশানুরূপ। তাই ভালো ফলন ও দাম পেয়ে খুশি এখানকার কৃষক। এদিকে শেরপুরের নকলায় রঙিন ফুলকপি ও ময়মনসিংহের ভালুকায় কুলচাষ করে ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।

প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে বিস্তারিত ডেস্ক রিপোর্ট- মধুপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি জানান, লালমাটির মধুপুর গড়ে এ বছর শীতকালীন সবজির ভালো ফলন হয়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা তাদের উৎপাদিত সবজির ফলন ও দাম ভালো পেয়ে খুশি। তাদের মুখে ফুটেছে হাসি। কৃষি বিভাগের পরামর্শ সহযোগিতায় এ বছর মধুপুরে সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে। শীতকালীন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ১৭৫ হেক্টর। উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৩২৮ হেক্টর। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫৩ হেক্টর বেশি।

মধুপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর মধুপুরে লাউ ২২৯ হেক্টর, শিম ১২৪, মুলা ৮৮, ফুলকপি ৭৫, বাঁধাকপি ৫৯, লালশাক ৭৫, বেগুন ২২০, মিষ্টিকুমড়া ৭২, শসা ৭০, করলা ৭৬, গাজর ৩ দশমিক ৫, স্কোয়াশ ১০, ডাটা ৭৭, পালং শাক ৪৫, খিরা ১৮, বাটিশাক ১০, টমেটো ৩৯, পাটশাক ৩৮ হেক্টরসহ মোট ১ হাজার ৩২৮ হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষ হয়েছে।

সরেজমিনে মধুপুরের পিরোজপুর, কুড়াগাছা, ভবানটেকী, চাপাইদ ও রাধানগর গ্রামে গিয়ে জানা যায়, তাদের সবজি চাষ সাফল্যের কাহিনি। এসব গ্রামে এক যুগ আগে উঁচু জমিতে পাট, ধান, কচু, আদা চাষ করা হতো। এসব ফসল চাষ করে খরচ তুলে আনাই কঠিন ছিল। পরে স্থানীয়ভাবে কুড়াগাছা গ্রামের কয়েকজন কৃষক কপি, শিম, লাউ চাষ শুরু করে। ফলন ও দাম ভালো হওয়ায় পরের বছর আরও কয়েক কৃষক তাদের দেখাদেখি সবজি চাষে এগিয়ে আসেন। এভাবে গত এক যুগে কুড়াগাছা গ্রাম সবজি চাষে এগিয়ে আছে।

এ গ্রামের কৃষক আলমগীর হোসেন জানান, এ বছর তিনি সাত একর জমিতে সবজি চাষ করেছেন। এক বিঘা ডাটা, পটোল ৫০ শতাংশ, বরবটি ৫০ শতাংশ, বেগুন ১ একর, ফুলকপি ৪ একর, লাউ ১ দশমিক ৫০ একর। তিনি লাউ বিক্রি করে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, কপি ৬ লাখ, বেগুন থেকে পেয়েছেন ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

তিনি জানান, সবজি চাষ করে মোটামুটি ভালো লাভ পেয়েছেন। একই গ্রামের হাফিজুল ইসলাম এক একর জমিতে কপি ও দেড় একর জমিতে চিচিঙ্গা চাষ করে ভালো লাভ পেয়েছেন। কৃষক শামীম পাঁচ বিঘা জমির মধ্যে দুই বিঘা জমিতে শিম ও তিন বিঘা জমিতে কপি চাষ করে ভালো লাভ পাচ্ছেন। শুধু আলমগীর, হাফিজুল ও শামীমই নন তাদের মতো এ গ্রামের অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক সবজি চাষ করে নিজেরা খাওয়ার পাশাপাশি বিক্রি করে ভালো লাভ পেয়েছেন।

মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন রাসেল জানান, মধুপুরের মাটি সবজিসহ কৃষি ফসল উৎপাদনের জন্য বিশেষ উপযোগী। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কমসহ সব মিলিয়ে কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতায় এলাকার কৃষকরা কৃষি উৎপাদনে এগিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে নকলা (শেরপুর) প্রতিনিধি জানান, শেরপুরের নকলায় গণপদ্দী ইউনিয়নের গণপদ্দী পশ্চিমপাড়ার আবুল কালাম আজাদ নামের এক কৃষক প্রথমবারের মতো রঙিন ফুলকপির চাষ করেছেন। প্রথম চাষেই বাম্পার ফলন ও ভালো দাম পেয়ে খুশি ওই কৃষক। তার এমন সফলতা দেখে আগ্রহী হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরাও। রঙিন এ ফুলকপিতে স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী ভিটামিন ছাড়াও রয়েছে ক্যারোটিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এদিকে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে উপজেলা কৃষি বিভাগ।

উপজেলা কৃষি বিভাগ জানা গেছে, দেখতে হলুদ ও বেগুনি রংয়ের ‘রঙিন’ ফুলকপির বাংলাদেশে চাষাবাদ শুরু হয় ২০২১ সালে। ময়মনসিংহ অঞ্চলের ফসলের নিবিরতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের আওতায় প্রথমবার নন-ক্রিপার জাতীয় সবজি চাষ প্রদর্শনী মাঠে ‘উন্নত জাত ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব কৌশল’ ব্যবহার প্রয়োগ করে জামালপুর থেকে ২ হাজার চারা এনে ১৫ শতক জমিতে রঙিন ফুলকপি চাষ করেন আবুল কালাম আজাদ লিটন।

কৃষক শফিকুল ইসলাম লিটন জানান, ১৫ শতক জমিতে চারাসহ সব মিলে তার খরচ হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার টাকা। চারা রোপণের ৭০ থেকে ৭৫ দিন পর বাগানে আসে রঙ্গিন ফুলকপি। বর্তমানে প্রায় ৮ হাজার টাকার ফুলকপি বিক্রি করেছেন। তার আশা বাগান থেকে প্রায় ৭০ হাজার টাকার মতো বিক্রি হবে পুষ্টিগুণে ভরপর এই রঙ্গিন ফুলকপি।

কৃষক আরও জানান, রঙিন এসব ফুলকপি দেখতে প্রতিদিনই এলাকার কৃষকসহ সাধারণ মানুষ তার জমিতে ভিড় করছেন। রঙিন ফুলকপির ভালো ফলন দেখে আগামী বছর নিজেও চাষ করতে চান আরেক চাষি হলটু মিয়া। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ‘লিটনের দেখাদেখি স্থানীয় অনেক কৃষকই এখন রঙিন ফুলকপি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। আমরা কৃষকদের সবসময় নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে থাকি এবং পাশে আছি সব সময়।’

অন্যদিকে ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি জানান, ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের পাড়াগাঁও বড়চালা গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে মৌসুমি ফল বরই আবাদ করে ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন কৃষক রফিকুল ইসলাম রবি। আগাম সিজনে বাজার মূল্য বেশি থাকায় ভালো লাভে বরই বিক্রি করতে পারছেন রবিসহ এলাকার বরই চাষিরা। উঁচু চালা ভূমি ভালুকা উপজেলার সর্বত্র এটেল মাটি হওয়ায় বরইসহ বিভিন্ন ফল গাছ যেমনি ভালো জন্মায় তেমনি ফলন বেশি ও সুস্বাদু হয়।

সরেজমিন ওই গ্রামে দেখা যায়, মাটি লাগুয়া ছোট ছোট ডালা গাছগুলো বরইয়ের ভারে নুইয়ে রয়েছে। বাগান মালিক কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে বাগান পরিচর্যার কাজ করছিলেন। এ সময় কৃষক রফিকুল ইসলাম রবি জানান, প্রতিটি চারা ১২০ থেকে ১৫০ টাকা করে ৫৮০টি কিনে ছয় বিঘা জমি ইজারা নিয়ে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে চারা রোপণ করেন। ছয় মাসের মধ্যেই গাছে ফুল আসতে শুরু করে। বর্তমানে প্রতিটি গাছ কাঁচা-পাকা বরইয়ে টইটুম্বর। জমি বর্গা, ক্ষেত তৈরি, চারা ক্রয়, সার কীটনাশক, পানি সেচ ও শ্রমিক বাবদ এ পর্যন্ত ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। স্থানীয় বাজারে ৭০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে এ পর্যন্ত প্রায় লাখ টাকার বরই বিক্রি করেছেন। সামনের দেড় মাসে আরও লাখ টাকার বরই বিক্রি করার আশা করছেন তিনি। এছাড়াও চলতি মৌসুমে বাড়ির পাশের নিজের জমিতে মরিচ, টমেটো, লাউসহ বিভিন্ন সবজি আবাদ করেছেন। কৃষিপণ্য উৎপাদন করে সচ্ছলতার পাশাপাশি ছয় মেয়ে ও দুই ছেলেকে লেখাপড়া করাচ্ছেন।

উপজেলা কৃষি উপসহকারী (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, উপজেলার ডাকাতিয়া ও উথুরা ইউনিয়নে এবার বেশি পরিমাণে কুল চাষ হয়েছে। অনেকেই চারা সংগ্রহ করছেন। আগামীতে ভালুকায় বরইয়ের আবাদ আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।