অনাবাদি জমিতে কুল চাষে বাম্পার ফলন, চাষির মুখে হাসি

বাগেরহাটের ৯ উপজেলার বেশিরভাগ অনাবাদি জমি এখন সারি সারি কুল গাছে ছেয়ে গেছে। গাছগুলোতে থোকায় থোকায় শোভা পাচ্ছে বর্ণিল নানা জাতের বরই। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাষ করা হচ্ছে বলসুন্দরি, ভারত সুন্দরি ও থাই আপেল কুল। যা রীতিমতো সবার নজর কাড়ছে। এই অঞ্চলে প্রথম দিকে দুই একজন শৌখিন ব্যক্তি শখ করে বরই বাগান করে সফল হওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে এর চাষির সংখ্যাও বেড়েছে। এবার প্রায় সহস্রাধিক চাষি বাণিজ্যভাবে কুলের চাষ করেছেন। ফলন ভালো হওয়ায় সব চাষির মুখেই ফুটেছে হাসির ঝিলিক।

জেলার মধ্যে মোরেলগঞ্জ, রামপাল, শরণখোলা ও চিতলমারী উপজেলায় এবার সবচেয়ে বেশি বরই চাষ করা হয়েছে।

মোরেলগঞ্জ উপজেলার সফল কুলচাষি ও নার্সারি ব্যবসায়ী আবুবকর হাওলাদার বলেন, ‘বছর দশেক আগে আমি কুল চাষ ও চারা তৈরি করে আসছি। প্রতিবছরই চাষির সংখ্যা বাড়তে থাকে। গত বছর সাত-আটজন চাষি কুল বাগান করেন। তারা সবাই ব্যাপকহারে লাভবান হন। তাদের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এবার অন্তত ২০ জন কুলবাগান করেছেন। সবার বাগানেই কুলের বাম্পার ফলন হতে দেখা গেছে।’

রামপালে সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তার পাশে ও বসতবাড়ির আঙিনায় অনাবাদি জমিতে করা হয়েছে বিশেষ প্রকারের কুল বাগান। সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়েছে গাছ। গাছগুলো আকারে খুবই ছোট। একেকটি গাছ বড়জোর চার থেকে পাঁচ ফুট হবে। কুলের ভারে গাছগুলো নুয়ে পড়েছে। চিকন বাঁশের লাঠি দিয়ে সেগুলো আটকে রাখা হয়েছে।

এছাড়া বাগানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চারপাশ দিয়ে পাটকাঠির বেড়া ও ওপরে জাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। কেউ কুলের বাগান পরিচর্যা করছেন। কেউ স্প্রে মেশিন দিয়ে ছিটাচ্ছেন ওষুধ। কেউ শ্রমিকদের নিয়ে কুল তুলে বস্তা ভরছেন। সবমিলিয়ে কুল উৎপাদন নিয়ে মহাব্যস্ত চাষিরা।

চিতলমারী উপজেলার কুল চাষি মাসুম মোল্লা বলেন, ‘আমি ৯ মাস আগে দুই বিঘা অনাবাদি জমিতে ১০০ বল সুন্দরি ও ৫০০ থাই আপেল কুলের কলম (চারা) রোপণ করি। এখন প্রতিটি গাছের বরই বড় বড় হয়েছে, খাওয়ার উপযোগী হয়েছে। ফলনও আশানুরূপ পেয়েছি। প্রতিটি গাছে অন্তত ১০ কেজি করে কুল হবে। এরমধ্যে থাই আপেল কুলের মিষ্টি খুব কড়া ও সুস্বাদু। দামও অনেক ভালো পাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘থাই আপেল কুল আরও একমাস আগে থেকে বিক্রি শুরু করেছি। প্রথম দিকে প্রতিকেজি থাই আপেল কুল ২০০ টাকাও বিক্রি করেছি। এখন প্রতিকেজি পাইকারি ১০০ টাকা ও খুচরা ১২০ টাকা দরে বিক্রি করছি।

দুই বিঘা জমিতে আমার এখন পর্যন্ত এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বছর শেষে বাগানের সব কুল বিক্রি করে অন্তত তিন থেকে চার লাখ টাকা হবে। এতে খরচ বাদে লাখ দুয়েক টাকার মতো লাভ হবে বলে আশা করছি।’

মোরেলগঞ্জ উপজেলার আরেক কুল চাষি আলমগীর ফকির বলেন, ‘প্রতিবেশীর কুল চাষ করা দেখে গত চার বছর ধরে আমিও কিছু জমিতে কুলচাষ শুরু করি। এবার ২৪ কাঠা জমিতে বরইয়ের বাগান করেছি। ফলন হয়েছে খুবই ভালো। প্রতিবছর কুল উৎপাদন ও সাংসারিক খরচ বাদে আমার প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয় থাকে।’

অপর চাষি নাগর মোল্লা বলেন, ‘আমি ২৬ কাঠা জমিতে বল সুন্দরি ও ভারত সুন্দরি কুলের চাষ করছি। যদি ঝড়-তুফান না হয়, তাহলে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা বিক্রি করতে পারবো। অন্য ফসলের চেয়ে কুল চাষ করে আমি অনেক বেশি লাভবান হচ্ছি।’

মোরেলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আকাশ বৈরাগী বলেন, ‘মোরেলগঞ্জে কিছু নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে, যারা ফল চাষে ঝুঁকছেন। বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ায় বিশেষ করে কুল চাষের দিকে এখন বেশি ঝুঁকছেন তারা। এবছর উপজেলায় গত বছরের চেয়ে ২ হাজার হেক্টর বেশি আবাদি ও অনাবাদি জমিতে কুল চাষ করা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের আধুনিক জাতের কলম (চারা) এনে বাণিজ্যিকভাবে কুল বাগান করছেন চাষিরা। এতে চাষিরা লাভবান হচ্ছেন। আমাদের কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে উপজেলায় ৯ হাজার হেক্টর জমির এসব উদ্যোক্তাদের সব ধরনের পরামর্শ ও সহযোগিতা করা হচ্ছে।’