বিএসএমএমইউ-তে সফল লিভার প্রতিস্থাপন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) সফলভাবে লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। ‘মুজিব শতবর্ষ লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রোগ্রাম’-এর অংশ হিসেবে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

রবিবার (১৫ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টায় বিএসএমএমইউ’র শহীদ ডা. মিল্টন হলে সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়।

লিখিত বক্তব্যে বিএসএমএমইউ’র উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ জানান, লিভার প্রতিস্থাপনে সেবাগ্রহীতা ও লিভারদাতা দুজনেই সুস্থ আছেন। তারা দুজনে দেশবাসীর কাছে আগামী দিনের জন্য দোয়া চেয়েছেন।

তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রতি বছর আনুমানিক ৮০ লাখ রোগী লিভার সংক্রান্ত ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় (২০১৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী)। এরমধ্যে অন্যতম ‘এন্ড স্টেজ লিভার ডিজিজ’ হলো ক্রনিক প্রদাহজনিত লিভারের শেষ অবস্থা, যেখানে লিভার কার্যক্ষমতা হারায়। সাধারণত হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই ভাইরাস সংক্রমণ, অথবা লিভারে অতিরিক্ত চর্বিজনিত প্রদাহ থেকে লিভার টিস্যুর পরিবর্তন শুরু হয়, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক লিভার টিস্যুর পরিবর্তন হয়ে সিরোটিক লিভার টিস্যু তৈরি হয়। সিরোটিক লিভার টিস্যু স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে অক্ষম। যখন রোগীর লিভারের একটি বড় অংশ সিরোটিক হয়ে যায়, তখন আমরা বলি— রোগী লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। এই লিভার সিরোসিসের শেষ পর্যায় হচ্ছে ‘এন্ড স্টেজ লিভার ডিজিজ’। ‘এন্ড স্টেজ লিভার ডিজিজ’-এর একমাত্র চিকিৎসা লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন।

শারফুদ্দিন আহমেদ জানান, লিভারের আরও কিছু রোগ রয়েছে। যেমন- লিভারের কোনও একটি অংশে (লোবে) ক্যান্সার (হেপাটোসেলুলার ক্যান্সার), বাচ্চাদের ক্ষেত্রে লিভারের জন্মগত ত্রুটি (বিলিয়ারি এট্রেশিয়া, মেটাবোলিক ডিজিজ ইত্যাদি)-এর চিকিৎসাও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন।

লিখিত বক্তব্যে তিনি জানান, আমাদের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ নানাবিধ হেপাটাইটিস ভাইরাসে আক্রান্ত। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জনসংখ্যার মাত্র ৫-১০ শতাংশ এ ভাইরাসের জন্য টিকা নিয়েছে, যা অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলশ্রুতিতে হেপাটাইটিস ভাইরাস সংক্রান্ত রোগব্যাধি বেড়েই চলেছে। প্রতিবছর বাংলাদেশে আনুমানিক ৪-৫ হাজার রোগীর লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন চিকিৎসা প্রয়োজন। দেশে আগে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের কোনও ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর এই রোগীদের একটি বিশাল অংশ দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য চলে যাচ্ছে। পার্শ্ববর্তী দেশসহ বহির্বিশ্বে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন ব্যয়বহুল চিকিৎসা। ফলে দেশের স্বল্প আয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এ পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে ‘মুজিব শতবর্ষ লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রোগ্রাম’ চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আমার সভাপতিত্বে এবং হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়েটিক ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মোহছেন চৌধুরীকে সদস্য সচিব করে ‘মুজিব শতবর্ষ লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠন করি। লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের মতো একটি জটিল চিকিৎসা প্রক্রিয়া সুচারুরূপে সম্পন্ন করার জন্য এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজির লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিভাগের সহযোগিতা নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় নতুন বর্ষের সূচনালগ্নে ১ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

উপাচার্য বলেন, ‘দেশের স্বল্প আয়ের ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যাতে এই চিকিৎসা সুবিধা পেতে পারে, এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনাক্রমে লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন কার্যক্রমের উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন অপারেশনটি ছিল একটি লিভিং ডোনার লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন। এর অর্থ হলো রোগীর আত্মীয় সম্পর্কিত কোনও ডোনারের কাছ থেকে লিভারের একটি অংশ কেটে রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করা হয় (রোগীর সিরোটিক লিভারের পুরোটিই কেটে ফেলা হয়)। গত ১ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের রোগী ছিলেন বগুড়ার মো. মন্তেজার রহমান (৫৩)। তিনি নন-বি, নন-সি জনিত ‘এন্ড স্টেজ লিভার ডিজিজে’ আক্রান্ত ছিলেন। মন্তেজার রহমানকে লিভার দান করেন তার বোন শামীমা আক্তার (৪৩)। শামীমা আক্তারের দেহ থেকে সুস্থ লিভারের ৬০ শতাংশ কেটে ফেলা হয়। মন্তেজার রহমানের সিরোটিক লিভারের পুরোটাই কেটে বের করে ফেলা হয়। এরপর শামীমা আক্তারের দেহ থেকে নেওয়া সুস্থ লিভারের ৬০ শতাংশ মন্তেজারের লিভারের সঙ্গে জোড়া দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘লিভারদাতা শামীমা আক্তারের লিভারটি ধীরে ধীরে রি-জেনারেট করবে। এটি লিভার নামক অঙ্গটির একটি বিশেষত্ব।’