কুলের ভারে নুয়ে পড়েছে গাছ, স্বপ্ন কৃষকের চোখে

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বেশির ভাগ অনাবাদি জমি এখন সারি সারি কুলগাছে ছেয়ে গেছে। গাছগুলোতে থোকায় থোকায় শোভা পাচ্ছে বর্ণিল নানা জাতের কুল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাষ করা হচ্ছে বল সুন্দরি, ভারত সুন্দরি ও থাই আপেল কুল। যা রীতিমতো সবার নজর কাড়ছে। এই অঞ্চলে প্রথম দিকে দু-একজন শৌখিন ব্যক্তি শখ করে কুলবাগান করে সফল হওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে এর চাষির সংখ্যাও বেড়েছে। এবার প্রায় অর্ধশতাধিক চাষি বাণিজ্যিকভাবে কুলের চাষ করেছেন। ফলন ভালো হওয়ায় সব চাষির মুখেই ফুটেছে হাসি।

উপজেলার মধ্যে বড়খারদিয়া গ্রামে এবার সবচেয়ে বেশি কুল চাষ করা হয়েছে। ওই গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য ইমরুল খান জানান, বছর দশেক আগে মজিবর খান নামের এক ব্যক্তি অল্প কিছু পতিত জমিতে শখ করে কুল চাষ করেন। তার পর থেকে প্রতিবছরই দু-একজন করে চাষির সংখ্যা বাড়তে থাকে। গত বছর সাত-আটজন চাষি কুল বাগান করেন। তারা সবাই ব্যাপকহারে লাভবান হন। তাদের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এবার অন্তত ২০ জন কুলবাগান করেছেন। সবার বাগানেই কুলের বাম্পার ফলন হতে দেখা গেছে।

মঙ্গলবার (১০ জানুয়ারি) সকালে সরেজমিনে বড়খারদিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে ও বসতবাড়ির আঙিনায় অনাবাদি জমিতে করা হয়েছে বিশেষ প্রকারের কুল বাগান। সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়েছে গাছ। গাছগুলো আকারে খুবই ছোট। একেকটি গাছ বড়জোর চার থেকে পাঁচ ফুট হবে। কুলের ভারে গাছগুলো নুয়ে পড়েছে। চিকন বাঁশের লাঠি দিয়ে সেগুলো আটকে রাখা হয়েছে। বাগানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চারপাশ দিয়ে পাটকাঠির বেড়া ও ওপরে জাল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। কেউ কুলের বাগান পরিচর্যা করছেন। কেউ স্প্রে মেশিন দিয়ে ছিটাচ্ছেন ওষুধ। কেউ শ্রমিকদের নিয়ে কুল তুলে বস্তা ভরছেন। সব মিলিয়ে কুল উৎপাদন নিয়ে মহাব্যস্ত চাষিরা।

বড়খারদিয়া গ্রামের কুলচাষি মাসুম মোল্যা বলেন, আমি ৯ মাস আগে দুই বিঘা অনাবাদি জমিতে ১০০ বল সুন্দরি ও ৫০০ থাই আপেল কুলের কলম (চারা) রোপণ করি। এখন প্রতিটি গাছের কুল বড় হয়েছে, খাওয়ার উপযোগী হয়েছে। ফলনও আশানুরূপ পেয়েছি। প্রতিটি গাছে অন্তত ১০ কেজি করে কুল হবে। এর মধ্যে থাই আপেল কুলের মিষ্টি খুব কড়া ও সুস্বাদু। দামও অনেক ভালো পাচ্ছি। থাই আপেল আরো এক মাস আগে থেকে বিক্রি শুরু করেছি। প্রথম দিকে প্রতিকেজি থাই আপেল কুল ২০০ টাকাও বিক্রি করেছি। এখন প্রতিকেজি পাইকারি ১০০ টাকা ও খুচরা ১২০ টাকা দরে বিক্রি করছি।

তিনি আরো বলেন, দুই বিঘা জমিতে আমার এখন পর্যন্ত এক লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বছর শেষে বাগানের সব কুল বিক্রি করে অন্তত তিন থেকে চার লাখ টাকা হবে। এতে খরচ বাদে লাখ দুয়েক টাকার মতো লাভ হবে বলে আশা করছি।

বড়খারদিয়া গ্রামের আরেক কুলচাষি আলমগীর ফকির বলেন, প্রতিবেশীর কুল চাষ করা দেখে গত চার বছর ধরে আমিও কিছু জমিতে কুলচাষ শুরু করি। এবার ২৪ কাঠা জমিতে কুলের বাগান করেছি। ফলন হয়েছে খুবই ভালো। প্রতিবছর কুল উৎপাদন ও সাংসারিক খরচ বাদে আমার প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয় থাকে।

অপর কুলচাষি নাগর মোল্যা বলেন, আমি ২৬ কাঠা জমিতে বল সুন্দরি ও ভারত সুন্দরি কুলের চাষ করছি। যদি ঝড়-তুফান না হয়, তাহলে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা বিক্রি করতে পারব। অন্যান্য ফসলের চেয়ে কুল চাষ করে আমি অনেক বেশি লাভবান হচ্ছি।

সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জীবাংশু দাস বলেন, সালথায় কিছু উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে, যারা ফল চাষে ঝুঁকছেন। বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ায় বিশেষ করে কুল চাষের দিকে এখন বেশি ঝুঁকছেন তারা। এবার উপজেলায় আট হেক্টর আবাদি ও অনাবাদি জমিতে কুল চাষ করা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের আধুনিক জাতের কলম (চারা) এনে বাণিজ্যিকভাবে কুল বাগান করছেন চাষিরা। এতে চাষিরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনই সামাজিকভাবেও তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে এসব উদ্যোক্তাকে সব ধরনের পরামর্শ ও সহযোগিতা করা হচ্ছে।