নতুন বছরেও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক ধারা

বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভের অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরের মতো নতুন বছরের শুরুতেও এই সূচক বাড়তে দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক রোববার রেমিট্যান্স প্রবাহের সাপ্তাহিক যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, চলতি জানুয়ারি মাসের প্রথম ছয় দিনে (১ থেকে ৬ জানুয়ারি) ৪১ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। প্রতি দিন গড়ে এসেছে প্রায় ৭ কোটি ডলার।

২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা ১৭০ কোটি (১.৭০ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন। যা ছিল চার মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। সেপ্টেম্বরে এসেছিল ১৫৪ কোটি ডলার। অক্টোবর ও নভেম্বরে এসেছিল যথাক্রমে ১৫২ কোটি ৫৫ লাখ ও ১৫৯ কোটি ৫২ লাখ ডলার।

হিসাব করে দেখা যায়, এই চার মাসে প্রতি দিন গড়ে ৬ কোটি ডলারের কম রেমিট্যান্স দেশে এসেছে।

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে অবশ্য ২০০ কোটি (২ বিলিয়ন) ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল।

নতুন বছরের প্রথম মাসের ছয় দিনে যে হারে রেমিট্যান্স এসেছে, মাসের বাকি ২৫ দিনে সেই হারে আসলে জানুয়ারিতে রেমিট্যান্সের পরিমাণ জুলঅই ও আগস্ট মাসের মতো ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

ক্যালেন্ডার বছরের হিসাবে ২০২২ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী সোয়া কোটি প্রবাসী ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সব মিলিয়ে ২ হাজার ১২৮ কোটি ৫৪ লাখ (২১.২৮ বিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এই অঙ্ক আগের বছরের চেয়ে ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ কম। ২০২১ সালে ২ হাজার ২০৭ কোটি ২৫ লাখ (২২.০৭ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।

গত বছরে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ লোক কাজের জন্য বিভিন্ন দেশে গেছেন। যা আগের বছরের চেয়ে ৮৬ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি। ২০২১ সালে জনশক্তি রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ১৭ হাজার ২০৯ জন। অর্থাৎ আগের বছরের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ মানুষ বিদেশ গেলেও টাকা আসলো কম।

জনশক্তি রপ্তানিকারক, ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকের চেয়ে খোলাবাজার বা কার্ব মার্কেটে ডলারের দাম বেশি হওয়ায় একটু বেশি টাকা পাওয়ায় প্রবাসীরা অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠানোয় রেমিট্যান্স কমেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে রেমিট্যান্স বেশ খানিকটা বেড়েছে। এই মাসে ১৭০ কোটি (১.৭০ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা চার মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। গত বছরের ডিসেম্বরের চেয়ে বেশি ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ।

আগের তিন মাস নভেম্বর, অক্টোবর ও সেপ্টেম্বরে এসেছিল যথাক্রমে ১৫৯ কোটি ৫২ লাখ, ১৫২ কোটি ৫৫ লাখ এবং ১৫৩ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। তার আগের দুই মাসেই ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। জুলাই মাসে এসেছিল ২০৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলার; আগস্টে আসে ২০৩ কোটি ৬৯ লাখ ডলার।

সব মিলিয়ে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথমার্ধে অর্থাৎ জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ১ হাজার ৪৯ কোটি ৩২ লাখ (১০.৪৯ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি।

গত ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ১০ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যেও জনশক্তি রপ্তানিতে রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত জনশক্তি রপ্তানি তথ্য প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, ১১ মাসে (জানুয়ারি-নভেম্বর) ১০ লাখ ২৯ হাজার ৫৪ জন লোককে কাজের জন্য বিভিন্ন দেশে গেছেন। এর আগে কোনো বছরেও এত লোক কাজের সন্ধানে বিদেশে যাননি।

ডিসেম্বর মাসের তথ্য যোগ হলে ২০২২ সালে মোট জনশক্তি রপ্তানির পরিমাণ সাড়ে ১১ লাখে গিয়ে পৌঁছবে বলে জানিয়েছেন জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সভাপতি আবুল বাশার।

তিনি বলেন, ‘এই যে আমরা সাড়ে ১১ লাখ লোককে বিদেশে পাঠালাম, এটি একটি বিশাল বড় ঘটনা। কিন্তু দুঃখজনক হলো জনশক্তি রপ্তানি বাড়লেও রেমিট্যান্স বাড়ছে না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে হুন্ডি। করোনা মহামারির কারণে সব কিছু বন্ধ থাকায় বিশ্বব্যাপী অবৈধ হুন্ডি কর্মকাণ্ড বন্ধ ছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর থেকেই ফের হুন্ডি কর্মকাণ্ড চালু হয়েছে। ডলারের বাজারের অস্থিরতার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও বেড়ে গেছে।

‘২০২২ সালে যারা বিভিন্ন দেশে গেছেন, তারা বেশিরভাগ ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। বেতন পাচ্ছেন; দেশে পরিবার-পরিজনের কাছে টাকা পাঠাচ্ছেন। সে হিসাবে রেমিট্যান্সের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। উল্টো কমছে। এটি একটি উদ্বেগের বিষয়। এই রেমিট্যান্স কমার কারণেই কিন্তু আমাদের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ কমে আসছে।’

আবুল বাশার বলেন, ‘এখানে প্রবাসী ভাই-বোনদের কোনো দোষ আমি দেখি না। তারা প্রতি ডলারে দুই-তিন টাকা বেশি পাচ্ছেন বলেই ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা না পাঠিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠাচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক হুন্ডি বন্ধে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না।

‘এখানে সরকারের কাছে আমার একটা প্রস্তাব আছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে বা বৈধপথে টাকা পাঠালে সরকার এখন যে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে। তা বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করলে হুন্ডি বন্ধ হবে বলে আমি মনে করি।’

তবে ভিন্ন কথা বলেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর।

তিনি বলেন, ‘প্রণোদনা দিয়ে রেমিট্যান্সের ইতিবাচক ধারা কখনই ধরে রাখা যাবে না। হুন্ডি বন্ধ করতেই তো সরকার প্রথমে ২ শতাংশ, পরে তা আরও বাড়িয়ে আড়াই শতাংশ করেছে। কিন্তু হুন্ডি তো বন্ধ হচ্ছে না; উল্টো আরও বাড়ছে। এখানে যে কাজটি করতে হবে, তা হলো, ডলারের বাজারকে স্থিতিশীল করতে হবে। কার্ব মার্কেট ও ব্যাংকের ডলারের দামের পার্থক্য কমিয়ে আনতে হবে। যত এই পার্থক্য বেশি থাকবে ততো দিন হুন্ডি বন্ধ হবে না।’

আহসান মনসুর বলেন, ‘খোলাবাজার বা কার্ব মার্কেটে ডলারের দর এখন ১১২ থেকে ১১৩ টাকা। ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠালে ১০৭ টাকা পাওয়া যায়। তার সঙ্গে আড়াই শতাংশ প্রণোদনা যোগ হয়ে পাওয়া যায় ১০৯ টাকা ৫০ পয়সা। আর হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠালে, যার নামে পাঠান তিনি ১১৩ টাকা পর্যন্ত পাচ্ছেন। এ কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণ বেড়ে গেছে।’

বিএমইটির তথ্যে দেখা যায় ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে ৬ লাখ ১৭ হাজার ২০৯ জন লোক কাজের সন্ধানে বিভিন্ন দেশে গেছেন। তার আগের বছর ২০২০ সালে করোনার কারণে এই সংখ্যা ছিল একেবারেই কম; ২ লাখ ১৭ হাজার ২০৯ জন।

অর্থবছরের হিসাবে গত ২০২১-২২ অর্থবছরে ২১ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা, যা ছিল আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ কম।

২০২০-২১ অর্থবছরে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। যা ছিল আগের বছরের চেয়ে ৩৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।