শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বদলে গেছে বাংলাদেশ

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তারপর থেকে টানা তিন মেয়াদে ১৪ বছর ক্ষমতায় আছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। গত ১৪ বছরে বাংলাদেশের মানুষের আশার বাতিঘর হয়ে উঠেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। যতই দুর্যোগ-দুর্বিপাক, সংকট আসুক না কেন তিনি মানুষের ভরসার আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছেন। মানুষবিশ্বাস করে যতই সংকট আসুক না কেন শেখ হাসিনা একটা উপায় বের করবেন।

দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সম্ভাবনার নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ। গত ১৪ বছরে সত্যিই বদলে গেছে বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত একটি বড় অর্জন।বিশ্বের বুকে আজ বাংলাদেশ মর্যাদার আসনে দাঁড়িয়েছে। গোটাবিশ্ব দেখেছে বাংলাদেশের উন্নয়ন সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার ম্যাজিক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় ও সাহসী নেতৃত্বের কারণেই বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কাছে জনগণের প্রত্যাশাটাও অনেক বেশি। জনগণের বিপুল প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আরেকটি বছরের যাত্রা শুরু হলো। বিদায়ি ২০২২ সালে বাংলাদেশের অনেক অর্জন হয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় আলোচিত ঘটনা ছিল পদ্মা সেতু উদ্বোধন। ২৫ জুন যার দ্বার উন্মোচন হয়েছে। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলাকে সরাসরি সংযুক্ত করেছে পদ্মা সেতু। বিদেশি অর্থায়ন ছাড়া পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প নির্মাণ করার সক্ষমতা দেখিয়েছে বাংলাদেশ। যার কারণে বিদেশে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

পদ্মা সেতুর কারণে প্রতি বছর দেশের বর্তমান মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সঙ্গে যোগ হবে অতিরিক্ত ৪৮ হাজার থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা। যার ফলে প্রবৃদ্ধি বাড়বে ১ দশমিক ২ থেকে ২ শতাংশ হারে। বছরের একদম শেষদিকে ২৮ ডিসেম্বর যোগাযোগ খাতের আরেক মেগা প্রকল্প মেট্রোরেল লাইন-৬ চালু হয়েছে। যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ মেট্রোরেলের যুগে প্রবেশ করেছে। ঢাকাবাসীর জন্য যোগাযোগের নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। মেট্রোরেল লাইন পুরোটা চালু হলে যানজটের ঢাকা শহরে নগরবাসীকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে।

দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেটিও বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশে শতভাগ বিদ্যুতায়ন করা হয়েছে। গত ২১ মার্চ দেশের সবচেয়ে বড় পায়রা কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসে। এবং মার্চ মাসেই দেশের প্রত্যেক দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ সেবা পৌঁছে দিয়ে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা দেয় সরকার। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ, যারা শতভাগ জনগণের মধ্যে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে পেরেছে।

গত ৭ নভেম্বরে একসঙ্গে সারা দেশে ১০০টি সেতু এবং ২১ ডিসেম্বর দেশের ৫০ জেলায় মোট ২০২২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে সড়ক ও মহাসড়ক গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একসঙ্গে এত সেতু কিংবা সড়ক/মহাসড়ক উদ্বোধনের নজির পৃথিবীর কোথাও নেই। ১০০টি মহাসড়কের মধ্যে ৯৯টি দেশের সরকারি তহবিল থেকে সম্পন্ন হয়েছে। যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ করে। বাকি ১টি গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার মহাসড়কের চার লেন প্রকল্প এডিপি, ওপেক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তহবিলে সম্পন্ন হয়েছে।

২০২৩ সালেও বরাবরের মতো উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। উন্নয়ন প্রকল্পে শামিল হচ্ছে আরও অনেক মেগা প্রকল্প। ট্যানেল যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ। খুলে দেওয়া হবে কর্ণফুলী ট্যানেল। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে চলবে রেল, চালু হবে বিমানবন্দর থার্ড টার্মিনাল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিআরটি মেগা প্রকল্প, খুলনা-মোংলা রেল প্রকল্প, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল প্রকল্প, ঢাকা-রংপুর ফোর লেন, ঢাকা-সিলেট চার লেন প্রকল্প, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, যমুনা নদীর ওপর রেল সেতু। ডিসেম্বরে মেট্রোরেল মতিঝিল পর্যন্ত পৌঁছে যাবে।

চীনের সাংহাই শহরের আদলে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন #৩৯; গড়ে তোলার লক্ষ্যে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। স্বপ্নের এই প্রকল্প উদ্বোধন এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। কর্ণফুলী নদীর দুই পাড়কে সংযুক্ত করেছে বঙ্গবন্ধু টানেল। যা চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজারের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার দূরত্ব কমাবে। টানেল দিয়ে বছরে প্রায় ৬৩ লাখ গাড়ি চলাচল করবে। কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের গাড়ি চট্টগ্রাম শহরকে এড়িয়ে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যাবে। যানজট কমে যাবে চট্টগ্রাম মহানগরীর। টানেলকে ঘিরে নদীর দু-পাশেই সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাবে, সম্প্রসারণ হবে শিল্প কারখানা।

২০২৩ সালের জুন মাসে পদ্মা সেতুতে রেল চলবে। ঢাকা থেকে রেল যাবে যশোর। ১৭২ কিমি দৈর্ঘ্যরে রেলপথের ২৩ কিমি পুরোপুরি এলিভেটেড (উড়াল)। যশোর পর্যন্তকোথাও রেলক্রসিং থাকবে না। দেশের প্রথম উড়াল ও লেভেল ক্রসিংবিহীন রেলপথ। এতে সময়ও বাঁচবে, দুর্ঘটনাও কমবে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল অক্টোবরে উদ্বোধন হবে। এটি উদ্বোধনের পর বিমানবন্দরের যাত্রী সেবার মান আমূল বদলে যাবে। বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়বে আড়াই গুণ। ফলে তিনটি টার্মিনাল দিয়ে যাত্রী পারাপারের সক্ষমতা দাঁড়াবে বছরে ৮০ লাখ থেকে বেড়ে ২ কোটি ২০ লাখে।

ঢাকার যানজট নিরসনে অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। বিমানবন্দর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত প্রায় ৪৭ কিমি এক্সপ্রেসওয়ে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণকে যুক্ত করবে। বিমানবন্দর থেকে তেজগাঁও রেলস্টেশন পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার জুনেই চালু হচ্ছে। এ ছাড়া সাভার থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। যা গত ১২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা ‘ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। এক্সপ্রেসওয়েটি চালু হওয়ার পর রাজধানীর যানজট এড়িয়ে উত্তরবঙ্গের যানবাহন ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে উঠতে পারবে। উত্তর-দক্ষিণের কানেক্টিভিটি বেড়ে যাবে।

বহুল আলোচিত বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) গাজীপুর থেকে শাহজালাল বিমানবন্দর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার সড়কের উদ্বোধন হবে চলতি বছরের জুনে। ইতিমধ্যে উত্তরা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত উড়াল পথের একাংশ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত জোড়া লাগানো আধুনিক বাস চলাচল করবে। এসব বাসের পথ হবে সড়কের মাঝখান দিয়ে। যানজট, ট্রাফিক সিগন্যাল কিংবা অন্য কোনো কারণে বাসের চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে না। ঘণ্টায় প্রায় ২০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবে।

দুই বছর করোনার পরও দেশের আর্থিক খাত ভালো ছিল। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে।বিশ্ববাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে বাংলাদেশেরও আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে বাজারে। লাগামহীনভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকে। গোটাবিশ্বকে শুনতে হচ্ছে দুর্ভিক্ষের অশনিসংকেত।

বিশ্ব জুড়ে মুদ্রাস্ফীতির দাপট চলছে। বর্তমানেবিশ্বের ১০৪টি দেশের খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি দুই অঙ্কের ওপরে। বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে পণ্য আমদানি করে সেসব দেশেও মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি আমদানি করে চীন ও ভারত থেকে। চীনে আগে মুদ্রাস্ফীতি ১ শতাংশের কম ছিল, যা বেড়ে ২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে ভারতে মুদ্রাস্ফীতি ৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া উন্নত দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিলে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ, যুক্তরাজ্যে ৯ দশমিক ১ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ, কানাডা ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। উন্নত দেশগুলোতে এত বড় মুদ্রাস্ফীতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ মুদ্রাস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

তবে গত বছরের শেষ দিকে অর্থনীতিতে আশার আলো দেখায় রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়। ডিসেম্বরে রেমিট্যান্স আসে রেকর্ড ১৭০ কোটি ডলার। অনেক দেশের অর্থনীতি চলে গেছে খাদের কিনারায়। তবে আশার কথা উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের গতি থমকে যায়নি, বরং অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলছে।শত প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তিনিই বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছেন। ‘রূপকল্প-২১’ বাস্তবায়ন করে এবারের লক্ষ্য স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণ।

লেখক: তাপস হালদার,
সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ