বিদেশে ডিগ্রি নিয়ে দেশে খামার গড়ছেন তরুণরা

বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে দেশে এসে খামার গড়ে তুলছেন একদল তরুণ। এই খামার গড়ে তুলতে তাঁরা যেমন বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করছেন, তেমনি লালন-পালনেও আধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রাকৃতিক উপায়ের সন্নিবেশ ঘটাচ্ছেন। তরুণদের তালিকায় বেশির ভাগই আছেন প্রতিষ্ঠিত ও বনেদি শিল্পপতিদের সন্তান। ফলে তাঁদের বিনিয়োগ নিয়েও বেশ সংকটে পড়তে হয়নি।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এই বড় শিল্পপতিদের সন্তানরা খামারি হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন বেশ স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গেই। দেশের শিক্ষিত তরুণরা এই শিল্পে মনোযোগ দেওয়ায় এই শিল্প নতুন ও আধুনিক রূপ পাচ্ছে। নতুনরাও এই শিল্পে যোগ দিতে অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন।

শিক্ষিত তরুণরা মিলে গড়ে তুলেছেন চট্টগ্রাম ক্যাটল ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন। ২০২২ সালে সংগঠন গড়ে তুলে সেই বছরেই চট্টগ্রামে তাঁরা প্রথম ক্যাটল এক্সপো’র আয়োজন করেছে। তাঁদের সংগঠনে এখন এক শ সদস্য আছেন, যাদের প্রায় সবারই বয়স ১৭ থেকে ৩০ বছর। এবার সংগঠনটি আয়োজন করেছে জমজমাট দ্বিতীয় ক্যাটল এক্সপো। ৫০ টাকা টিকিট নিয়ে ১৫ হাজার দর্শক প্রবেশের লক্ষ্য থাকলেও সেখানে ২৫ হাজার দর্শক প্রবেশ করার পর স্থান সংকুলান না হওয়ায় একপর্যায়ে গেট বন্ধ রাখা হয়।

মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল ষাঁড় প্রদর্শনী বা ফ্যাশন শো, ছিল রোগমুক্ত গরু চেনার উপায়, খামারি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সেমিনার। তরুণদের আয়োজন যে ব্যতিক্রমী এই এক্সপো তার বড় প্রমাণ।

সংগঠনের সদস্যদের তালিকা যাচাই করে দেখা গেছে, বিদেশে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে এসে দেশে তাঁরা এই খাতে বিনিয়োগ করেছেন, সফলও হয়েছেন।

সংগঠনের সভাপতি বোরহানুল হাসান চৌধুরী সালেহীন, তিনি চট্টগ্রামের জনপ্রিয় সিটি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছোট সন্তান। লন্ডন থেকে ডিগ্রি নিয়ে রাজনৈতিক পরিবারের এই সন্তান দেশে এসে শুরু করেন রেস্টুরেন্ট ব্যবসা। নিজের মেধা ও বুদ্ধি খাটিয়ে চট্টগ্রামে ‘মিলানো এক্সপ্রেস’ ও ‘লিটল এশিয়া’ নামের দুটি রেস্টুরেন্ট বেশ জনপ্রিয় করেছেন তিনি। চার বছর আগে থেকে শুরু করেছেন খামার ব্যবসা, সফলও হয়েছেন। তিনি বলেন, এই সেক্টরে তরুণ শিক্ষিতদের কাজ করার বড় সুযোগ আছে সেটিকে কাজে লাগাতে চাই। ক্যাটল এক্সপোর সফলতা দিয়েই সেই যাত্রা শুরু হয়েছে।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আমানত অ্যাগ্রোর মালিক আক্তার হোসেন জ্যাকি, তার বাবা চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শাহ আমানত অয়েল মিলের মালিক। তিনিও মনে করেন, তরুণদের হাত ধরেই এই সেক্টরে বড় পরিবর্তন হবে। আমরা ইতোমধ্যেই ইমেজ সংকট কাটিয়ে উঠেছি, এখন গর্বের সঙ্গে পরিচয়ও দিতে পারছি।

সংগঠনের সহসভাপতি ওয়াসিফ আহমেদ সালাম হচ্ছে এশিয়ান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও গার্মেন্ট ব্যবসায়ী এম এ সালামের ছোট ছেলে। ওয়াসিফ লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রি নিয়ে হাটহাজারীতে গড়ে তুলেছেন খামার। পড়তে যাওয়ার আগেই শখের বশে গরু পালন শুরু করেন, সেমিস্টারের ফাঁকে শিক্ষা ছুটিতে যখন দেশে আসেন তখনই এই সময়টা কাজে লাগান খামারে। ২০২১ সালে পড়া শেষ করে পুরোদমে মনোযোগ দিচ্ছেন তিনি। ওয়াসিফ বলেন, ‘শুরুর পুঁজি ছিল ঈদ বকশিশের জমানো আড়াই লাখ টাকার তিনটি গরু। গত কোরবানিতে ৪৫০টি গরু বিক্রি করেছি। এই কোরবানিতে ৫৫০ থেকে ৬০০ গরু বিক্রির লক্ষ্য আছে।’

তিনি বলেন, আগে প্রান্তিক কৃষকরাই এই খাতে জড়িত ছিলেন। তরুণ শিক্ষিতরা এ ব্যবসায় আসার পর প্রযুক্তিগত আধুনিক জ্ঞান দিয়ে খামার গড়ে সফল হচ্ছেন। এতে আমরা নিজেদেরকে খামারি হিসেবে পরিচয় দিয়ে গৌরববোধ করছি।

সদস্যদের মধ্যে এই খাতে সাড়া জাগিয়ে সফল হয়েছেন সাংগঠনিক সম্পাদক তানজীব জাওয়াদ রহমান হচ্ছেন, বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ এগ্রো খামার নাহার এগ্রো গ্রুপের মালিক রকিবুর রহমান টুটুলের সন্তান। তিনিও লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে দেশে এসে ২০১৮ সালে নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেন নাহার ক্যাটেল ফার্ম। তিনি বলেন, খামার নিয়ে বাবার কাছ থেকে শিখলেও আমি নিজের উদ্যোগে এই ফার্ম গড়ে তুলেছি। আমি ২০টি গরু নিয়ে খামার শুরু করে এখন আমার খামারে ৪শ গরু আছে। ২০২২ সালেই আমি লাভের মুখ দেখেছি।

এই খাতে বিনিয়োগের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমে সবাই শখের বসেই গরু পালন শুরু করেন। পরে শখকে বিজনেসে রূপান্তর করেছেন। এই সেক্টর খুব দ্রুত এগোচ্ছে, ফলে নতুন প্রযুক্তি আর আধুনিক জ্ঞান দিয়ে আমরা সফল হচ্ছি। এ জন্যই নতুনরা এই খাতে আসছেন।

কন্টিনেন্টাল গ্রুপের মালিক আহসান ইকবাল চৌধুরী আবীরের শিপিং সেক্টরে আছে বিশাল ব্যবসা। তার ছেলে আলী ইকবাল চৌধুরীও অস্ট্রেলিয়া থেকে ডিগ্রি নিয়ে বড় বিনিয়োগে গড়ে তুলেছেন সারাহ এগ্রো।

দেশের প্রথম আইকনিক খামার নাহার এগ্রো’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক রকিবুর রহমান টুটুল বলেন, উচ্চশিক্ষিত তরুণরা এই সেক্টরে এগিয়ে আসলে অনেক বেশি উন্নতি করবে। প্রযুক্তি দিয়ে একটি সর্বাধুনিক খামার এবং একটি ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারবে। আমি মনে করি তারা অবশ্যই সফল হবে। এজন্য তাদেরকে প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা, খামার পর্যবেক্ষণে আমি সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিচ্ছি।