স্মার্ট কৃষি খামারে সুমনের অভাবনীয় সাফল্য

বরিশালের বাবুগঞ্জে পেঁপে চাষে বিপ্লবের পর এবার বাণিজ্যিকভাবে স্মার্ট কৃষি খামার গড়ে আলোড়ন তুললেন আবু বকর সিদ্দিকী সুমন। উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের বায়লাখালি গ্রামে দেড় একর জমিতে দুটি ঘের কেটে মাছ চাষের পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন স্মার্ট কৃষি খামার।

গত বছর তিনি উন্নত জাতের পেঁপে চাষ করে বরিশাল জেলায় চমক দেখিয়েছেন। এবার ওই ঘেরের চারপাশে বাণিজ্যিকভাবে আগাম ব্লাক ডায়মন্ড জাতের কুমড়া ও লাউ চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি চাষ করেছেন শিম। ইতোমধ্যে তিনি লাখ টাকার বেশি কুমড়া ও লাউ বিক্রি করেছেন। তাঁর ঘেরে ২ শতাধিক কুমড়া ও শতাধিক লাউ গাছ রয়েছে। প্রতি মন কুমড়া গড়ে ৯০০-১২০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। প্রতি পিস লাউ আকার ভেদে ৫০-১০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন।

গত ২ বছরে কৃষিতে সফল হওয়ায় তিনি ইউনাইটেড সিড ও এগ্রিকালচার রিচার্স সেন্টার থেকে দুটি সম্মাননা পদক পেয়েছেন। সম্প্রতি বরিশাল কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. হারুন অর রশিদ ও উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা তার ঘের পরিদর্শন করে প্রশংসা করেছেন।

এ ব্যাপারে বাবুগঞ্জ কৃষি স¤প্রসারণ কর্মকর্তা শাহ মো. আরিফুল ইসলাম জানান বলেন, আবু বকর সিদ্দিকীর কৃষিতে অভাবনীয় সফলতার পেছনের রহস্য হচ্ছে প্রবল ইচ্ছে ও শ্রম বিনিয়োগ। প্রথমে তিনি ভালো জাতের বীজ সংগ্রহ করে চারা উৎপাদন করেন। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের কারণে তার সফলতা আকাশ ছোঁয়া। আমরা সর্বদা তাকে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করে আসছি।

বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মামুনুর রহমান বলেন, নিয়মিত কৃষি অফিস থেকে আবু বকর সিদ্দিকির কৃষি ফার্ম পরিদর্শন করে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। স্মার্ট কৃষি করে তিনি লাভবান হয়েছেন। উপজেলার কৃষকরা তাকে দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী কৃষি স¤প্রসারণ বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বরিশাল কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হারুন অর রশিদ বলেন, আবু বকর সিদ্দিকী সুমন বাণিজ্যিকভাবে কৃষি করে লাভবান হচ্ছেন। তার কৃষির ধরনকেই স্মার্ট কৃষি বলে। সরকারের যুগোপযোগী পদক্ষেপের ফলে গত এক দশকে কৃষি ক্ষেত্রে ও খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। আবু বকর সিদ্দিকী সুমন কৃষকদের আইডল হতে পারে। তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে অনেকই কৃষি কাজে আগ্রহী হচ্ছেন।

জানা গেছে, ১৯৯৩ সালে আবু বকর সিদ্দিকী সুমন সাউথ আফ্রিকায় হুন্দাই কোম্পানিতে একজন পেইন্টার হিসেবে যোগদান করেন। কাজের সুবাদে তিনি ২২টি দেশ ভ্রমণ করেন। জিম্বাবুয়ে ও মালাইও ভ্রমণ করতে গিয়ে সেখানে কৃষকদের পেঁপে চাষ দেখে আগ্রহী হন। তার উপার্জিত টাকায় দেশে জমি ক্রয় করেন এবং সাউথ আফ্রিকায় একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান খোলেন। ২০১৪ সালে তার ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে (ডাকাতি) রোবারি হয়। তখন তিনি আর্থিকভাবে ভেঙে পড়েন।

এক পর্যায় শুভাকাক্ষীদের সহযোগিতা নিয়ে আবারো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান এবং সব দেনা-পাওনা পরিশোধ করেন। স্ত্রীর কিডনি রোগের কারণে ২০২০ সালে দেশে চলে এসে চিকিৎসা করাতে থাকেন। ওই সময় আবারো তিনি অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন। ২০২১ সালে আবু বকর সিদ্দিকী সুমন মাছ চাষের ওপর লোনের জন্য বাবুগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান এবং লোনের আবেদন করেন। তৎকালীন সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান আবু বকরের কথা শুনে মাছ চাষ ও পাশাপাশি সবজি চাষের পরামর্শ দেন। তখন মৎস্য অফিস থেকে একটি প্রল্পপ বাবদ ৫০ হাজার টাকা পান তিনি। ওই টাকায় নিজের জমিতে ঘের করে মাছ চাষ ও পেঁপে চাষ শুরু করেন। প্রথমবার জাত নির্বাচনে ভুল হওয়ায় পেঁপে চাষে ব্যর্থ হয়।

এরই মধ্যে ২০২১ সালের শেষের দিকে তার স্ত্রী কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি স্ত্রীর একটি গহনা ৬৬ হাজার টাকায় বিক্রি করে গাজীপুর থেকে পেঁপের ভালো বীজ সংগ্রহ করেন। বীজ থেকে চারা উৎপাদন করেন। উৎপাদিত চারা নিজের ঘেরের পারে লাগিয়ে সফল হন। ২০২২ সালে শুধু চারা বিক্রি করে তিনি ৬ লাখ টাকা উপার্জন করতে সক্ষম হয়। আবু বকর সিদ্দিকী সুমন বলেন, আমার আজকের সফলতার বীজটা বপন করেছিলেন তৎকালীন সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুজ্জামান। তার পরামর্শে ও অনুপ্রেরণায় আমি হাল ছাড়িনি।

সুমন বলেন, উপজেলা কৃষি অফিস থেকে আমাকে বিভিন্ন সময় পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছে। আমি এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পেঁপে চাষের ওপর লেকচার দিতে আমন্ত্রণ পেয়ে থাকি। মাকড়সা ও ছত্রাক ছাড়া পেঁপে বাগানে তেমন কোনো সমস্যা দেখা যায় না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে পুষ্টিমানসমৃদ্ধ পেঁপে চাষে ভাগ্য বদলে ফেলা যায়।

তিনি বলেন, পেঁপে চাষে অর্থনৈতিকভাবে সরকারি সহযোগিতা পেলে দেশের অনেক বেকার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। এবার সম্মিলিত কৃষি করে সফল হয়েছি। ঘেরের চারপাশে ব্লাক ডায়মন্ড জাতের কুমড়া ও লাউ চাষ করে সফল হয়েছি। শিক্ষিত বেকার যুবকরা যদি চাষে অগ্রসর হয় তাহলে তারাও লাভবান হবেন।