যেভাবে আরও গণ হবে মেট্রোরেল

মেট্রোরেলের যুগে প্রবেশের ঘটনা ঢাকার মতো ২ কোটির কাছাকাছি জনসংখ্যার শহরের জন্য ভীষণ স্বস্তির সংবাদ। মেট্রোরেলের অভিজ্ঞতা আমাদের দেশে প্রথম, ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের কিছু অনভিজ্ঞতাজনিত জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এমআরটি-৬ অংশ যতটুকু উদ্বোধন হয়েছে তা দিয়ে অবশ্য শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থায় খুব একটা প্রভাব পড়বে না। বলা হচ্ছে ২০২৩ এর ডিসেম্বরের মধ্যে মতিঝিল এবং ২০২৪ এর মধ্যে এমআরটি-৬ কমলাপুর পর্যন্ত যাবে। বর্তমানে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত যতটুকু পথে মেট্রোরেল চলছে পুরোটাই আবাসিক এলাকা। যখন মানুষ ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, সচিবালয়, মতিঝিলে অফিস করে দ্রুততর সময়ে বাসায় ফিরতে পারবে তখন এর পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে।

তবে ২ কোটি জনসংখ্যার একটা শহরে ৫ লাখ যাত্রীর নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত হলেও পরিবহন সংকট মিটবে না। তার জন্য প্রস্তাবিত বাকিসব মেট্রোর যথাযথ ও সময়মতো নির্মাণকাজ শেষ করা দরকার। মেট্রো-৬ এর মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতাগুলো অন্য মেট্রোরেল বাস্তবায়নে কাজে লাগানো উচিত। এমআরটি-১ এর প্রস্তাবিত রোড বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর ও নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল। এটি বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯.৮৭ কিলোমিটার হবে পাতাল ও অন্যদিকে নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল অংশের ১১ কিলোমিটার হবে উড়ালপথে। বলা হচ্ছে ২০২৬ সালে এই মেট্রোর নির্মাণকাজ শেষ হবে এবং যাত্রী পরিবহন করতে পারবে দৈনিক ১৯ লাখ। এমআরটি ১ ও এমআরটি ৬ দুটিই ঢাকাকে উত্তর-দক্ষিণে যুক্ত করবে। ফলে এসব মেট্রো লাইন দ্বিমুখী যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। ঢাকাকে পূর্ব-পশ্চিমে সংযোগ করার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে এমআরটি-৫। এই এমআরটিরও দুটি অংশ। একটি এমআরটি-৫ নর্দান, যা হেমায়েতপুর থেকে গাবতলী হয়ে যাবে ভাটারা। অন্যদিকে এমআরটি-৫ এর সাউদার্ন অংশ গাবতলী থেকে আসাদ গেট, কারওয়ান বাজার হয়ে আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি গিয়ে শেষ হবে। বলা হচ্ছে ২০২৮ সালে এমআরটি-৫ এর নির্মাণকাজ শেষ হবে এবং দৈনিক যাত্রী পরিবহন করতে পারবে ১৫ লাখ। এই মেট্রো চালু হওয়ার পরই মেট্রোর আসল সুবিধা ভোগ করা যাবে। কারণ এমআরটি ১ ও এমআরটি ৬ যেখানে শুধু উত্তর-দক্ষিণমুখী যাত্রী পরিবহন করবে এই মেট্রো পূর্ব পশ্চিমমুখী যাত্রী পরিবহন করবে। শুধু তাই নয়, এমআরটি-৫ নর্দার্ন এমআরটি-৬ এর সঙ্গে মিরপুর-১০ এবং এমআরটি-১ এর সঙ্গে নতুন বাজারে ইন্টারচেইঞ্জ তৈরি করবে। অন্যদিকে এমআরটি-৫ সাউদার্ন কারওয়ান বাজারে এমআরটি-১ এর সঙ্গে ইন্টারচেইঞ্জ তৈরি করবে। এই ইন্টারচেইঞ্জই মেট্রোরেলের মূল শক্তি। এই নেটওয়ার্ক তৈরি হলে উত্তরের লোক শুধু দক্ষিণ নয় পূর্ব পশ্চিমে এবং পূর্বের লোক শুধু পশ্চিমে নয়, উত্তর-দক্ষিণেও যাতায়াত করতে পারবে। আরেকটি মেট্রো এমআরটি-২ প্রস্তাব করা হয়েছে যেটি গাবতলী থেকে ঢাকা উদ্যান, মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, নিউ মার্কেট, আজিমপুর, পলাশী, গুলিস্তান, মতিঝিল, কমলাপুর, মান্ডা, সাইনবোর্ড হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত। এই মেট্রোর একটি লাইন গোলাপশাহ মাজার থেকে পুরান ঢাকার সদরঘাট পর্যন্ত যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। ২০৩৫ সালের পর এমআরটি-৬ দিয়াবাড়ী থেকে সাভারের বাইপাইল পর্যন্ত বর্ধিত করা এমআরটি-৫ লাইনটিও হেমায়েতপুর থেকে বাইপাইল পর্যন্ত বর্ধিত করার বিষয়টি মহাপরিকল্পনায় রয়েছে। এছাড়া এমআরটি-১ বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার মহাপরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।

মেট্রোরেলের অন্যতম প্রধান সুবিধা স্টেশনের মধ্যে ইন্টারচেইঞ্জ করতে পারা যা মেট্রোর নেটওয়ার্ককে সমৃদ্ধ করে। যেহেতু মেট্রো শহরের অভ্যন্তরীণ গণপরিবহন তাই দূরপাল্লার ট্রেন স্টেশন, বিমানবন্দর, নৌবন্দর ও বাস টার্মিনাল মেট্রোরেলের সঙ্গে যুক্ত থাকে। আমাদের প্রস্তাবিত মেট্রোর মধ্যে বিমানবন্দর ও ট্রেন স্টেশনকে যুক্ত করার কথা বলা হলেও গাবতলী ছাড়া অন্যান্য বাস টার্মিনাল যুক্ত করা হয়নি। প্রস্তাবিত চতুর্থ মেট্রো এমআরটি-২ এমআরটি-৬ কে কমলাপুর বা মতিঝিলে ইন্টারচেইঞ্জ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই মেট্রো সদরঘাটকে যুক্ত করতে পারলে আমাদের নৌপরিবহন অনেক বেশি জনপ্রিয় হবে। দূরপাল্লার সহজ যাতায়াতে গাবতলীর মতো অন্যান্য বাস টার্মিনালকে মেট্রো পরিকল্পনায় যুক্ত করা উচিত।

আরও যেসব বিষয় আমলে রাখা দরকার : ২০৩০ সালের মধ্যে সত্যি সত্যি প্রস্তাবিত ছয়টির অন্তত চারটি এমআরটি-৬, এমআরটি-১, এমআরটি-৫, এমআরটি-৪ নির্মাণ করতে পারলে আমাদের নাগরিক জীবনে বড় একটি প্রভাব তৈরি হবে। একজন লোক ইস্কাটনে থাকেন, তিনি যাবেন কক্সবাজার ঘুরতে। তিনি বাসা থেকে রিকশা নিয়ে কারওয়ানবাজার মেট্রো স্টেশনে যাবেন, সেখান থেকে মেট্রোতে কমলাপুর যাবেন, কমলাপুর থেকে ট্রেনে কক্সবাজার যাবেন। এই যাত্রায় তার ব্যক্তিগত পরিবহন রিকশা, সিএনজি বা প্রাইভেট কারটি থামবে কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনে। অন্যদিকে তিনি কক্সবাজার থেকে ফিরতেও ব্যক্তিগত পরিবহন খুঁজবেন কারওয়ান বাজারে অথবা তার ড্রাইভারকে কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনে অপেক্ষা করতে বলবেন। এই প্র্যাক্টিসের কারণে প্রায় প্রতিদিন মেট্রো স্টেশনের নিচে গাড়ির একটা জটলা হবে অথবা সিএনজি, উবার বা রিকশা চালাকরা কাক্সিক্ষত যাত্রীর জন্য মেট্রো স্টেশনের নিচে অপেক্ষা করবেন। ফলে মেট্রোর নিচের স্পেসটা বড় ও অনেক বেশি উন্মুক্ত রাখা দরকার। দ্বিতীয়ত সহজ ও আরামদায়ক ইন্টারচেইঞ্জ নিশ্চিত করা। উত্তর-দক্ষিণ মেট্রো যখন পূর্ব-পশ্চিমকে ইন্টারচেইঞ্জ করবে তখন এই স্টেশনে এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার যাতে যাত্রীরা সহজে খুব একটা না হেঁটেই অন্য মেট্রো ধরতে পারেন। এছাড়া এই স্টেশনগুলোতে বিশ্রামের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে। সরকার ইন্টারচেইঞ্জ স্টেশনে শপিং সেন্টার, রেস্টুরেন্ট বা দোকান তৈরি করে মেট্রোরেলের জন্য বাড়তি আয়ও করতে পারে। বর্ধিত আয় থাকলে মেট্রো ভাড়া কমানোর একটা সুযোগও তৈরি হবে। আমাদের মেট্রো পরিকল্পনায় দিল্লি মেট্রো কর্তৃপক্ষ পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে। সেখানে উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম এমআরটি লাইনের পাশাপাশি একটি গোলাকার এমআরটি রয়েছে। এই গোলাকার লাইনটি মূলত অনেক বেশি ইন্টারচেইঞ্জের সুযোগ তৈরি করেছে এবং কাক্সিক্ষত দূরত্ব কমিয়েছে।

বলা হচ্ছে পূর্ণোদ্দমে যাত্রা করলে মেট্রোরেল ভোর ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত চলবে। কিন্তু মেট্রোরেলকে লাভজনক করতে এবং পিক আওয়ারের চাপ এড়িয়ে যাত্রীর ভারসাম্য আনতে আমাদের স্কুল-কলেজের শিডিউল, অফিস শিডিউল এগুলো রিভাইস করার কথা ভাবতে হবে। আশা করা যায় মেট্রোর যথাযথ কাজ শেষ হলে আমাদের নাগরিক জীবনে বড় একটা পরিবর্তন আসবে।

লেখক : শাহাদাৎ হোসাইন, কলামিস্ট