কক্সবাজারমুখী দুয়ার খুলছে এবার

সিপিডিএল চট্টগ্রামের শীর্ষ রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার প্রকৌশলী ইফতেখার হোসেন ২০১০ সালেই আনোয়ারায় স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছেন। তার পরিকল্পনা যে সুদূরপ্রসারী ছিল তা কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে টানেল চালুর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। আগামী মার্চে পুরোদমে টানেল চালু হওয়ার পর পুরো আনোয়ারাসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামজুড়ে উন্নয়ন কর্মকা- গতি পাবে।

এ বিষয়ে সিপিডিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চিটাগাং চেম্বারের পরিচালক প্রকৌশলী ইফতেখার হোসেন বলেন, ‘টানেলকে ঘিরে ওয়ান সিটি টু টাউনের আদলে কর্ণফুলী নদীর অন্যপাড়ে (আনোয়ারা ও কর্ণফুলী অংশ) উন্নয়ন ঘটবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। এখন প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা ও এর প্রয়োগ।’

তিনি আরও বলেন, ‘পারকি সমুদ্রসৈকত, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ কক্সবাজারমুখী উন্নয়ন নিশ্চিত করবে কর্ণফুলীর তলদেশের টানেল এবং সাগরের তীর দিয়ে নির্মিতব্য মেরিন ড্রাইভ।’ এ মেরিন ড্রাইভে আনোয়ারা থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত পুরো এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হবে উল্লেখ করে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন এ বছরে চালু হচ্ছে। এতে কক্সবাজারমুখী পর্যটকদের স্রোত বাড়বে। অন্যদিকে টানেলকে কেন্দ্র করে সাগরপাড় দিয়ে মিরসরাই থেকে টেকনাফ পর্যন্ত যে মেরিন ড্রাইভ নির্মিত হওয়ার কথা রয়েছে, তা হলে পুরো উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়নের জোয়ার বইবে। এতে এসব এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হওয়ার পাশাপাশি দেশেরও উন্নয়ন হবে।’ কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নামে করা টানেলের একটি টিউবের কাজ গত নভেম্বরে শেষ হওয়ার পর উদযাপন করা হয়। তবে যানবাহন চলাচলের জন্য টিউব খুলে দেওয়া হয়নি। আসছে মার্চ নাগাদ অন্য টিউবের কাজও শেষ হবে। ওই মাসেই টানেল খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের কাজ জুনে শেষ হবে এবং আগামী আগস্টে ট্রেন পরিচালনা শুরু করা যাবে এমন আশার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের মিরসরাইতে চালু হয়েছে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর। টানেলের অন্যপ্রান্ত আনোয়ারায় গড়ে তোলা হচ্ছে চায়না ইকোনমিক জোন। কক্সবাজারে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, চট্টগ্রামের বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে অনেক আগেই জাইকা (জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি) বিগ বি ইনিশিয়েটিভ নিয়ে রেখেছে। আর এই বিগ বি’র আওতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ কক্সবাজারের উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা যায়।

টানেলকেন্দ্রিক উন্নয়ন প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান প্রকৌশলী ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘নতুন বছরের মার্চে পুরোদমে চালু হবে টানেলের মাধ্যমে যান চলাচল। আর তাই আনোয়ারা ও কর্ণফুলী অংশে শহর সম্প্রসারণের জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে টানেল চালু হলে পুরো জোনটিই বদলে যাবে।’

কিন্তু টানেলকে কেন্দ্র করে যে যানবাহন কক্সবাজারমুখী চলাচল করবে সেই চাপ বহন করার ক্ষমতা কি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের রয়েছে? ১৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ মহাসড়কের শিকলবাহা ওয়াই জংশন থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার অংশে রাস্তাটির প্রস্থ মাত্র ১৮ ফুট। আর এ অংশে সবচেয়ে বেশি যানজট লেগে থাকে। চার লেনের টানেল ও চার লেনের তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু দিয়ে আসা যানবাহন শিকলবাহা ওয়াই জংশন দিয়ে কক্সবাজার যাওয়ার পথে ভোগান্তিতে পড়বে। এ অবস্থা থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের দোহাজারী সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন সিংহ বলেন, ‘যে ৪০ কিলোমিটার অংশে রাস্তার চওড়া ১৮ ফুট রয়েছে সেই অংশকে আমরা ৩৪ ফুটে উন্নীত করার কাজ করছি। এর মধ্যে শিকলবাহা ওয়াই জংশন থেকে পটিয়া পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার অংশ ৩৪ ফুটে উন্নীতকরণের কাজ প্রায় শেষের দিকে। এ ছাড়া বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির কাছ থেকে দোহাজারী মৌলবির দোকান পর্যন্ত ১২ কিলোমিটারের রাস্তা সম্প্রসারণ করতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।’

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘২০২২ শেষে আমাদের ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এ বছরেই কক্সবাজারে ট্রেনে যাওয়া যাবে। কক্সবাজারমুখী মানুষের স্রোত বাড়বে এবং এ স্রোতকে ধারণ করার জন্য কক্সবাজারেরও উন্নয়ন প্রয়োজন।’

কক্সবাজারমুখী পর্যটকের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কীভাবে ধারণ করবে এ বিষয়ে কথা হয় কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমোডর মোহাম্মদ নুরুল আবছারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারে ৩ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগের কাজ চলছে। মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর, কয়লা বিদ্যুৎ, সোনাদিয়া পর্যটন কেন্দ্র, সাবরাং পর্যটন কেন্দ্র, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ নানা উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে বৃহত্তর কক্সবাজার অঞ্চল হবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাব।’