জাতিসংঘে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য

গত ২১ ডিসেম্বর দিনটি ছিল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য এক ঐতিহাসিক দিন। ৭৪ বছরের মাঝে এই প্রথম মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কোনো প্রস্তাব গ্রহণ করল। সঙ্গে মিয়ানমারের অবহেলিত, নিপীড়িত জনমানুষের জন্যও দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মিয়ানমারের বিষয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব ২৬৬৯ গৃহীত হয় এই দিন। নিরাপত্তা পরিষদ এই ঘোষণায় ‘সামরিক বাহিনী কর্তৃক আরোপিত চলমান জরুরি অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে এবং বেশ কয়েকটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোরও প্রদান করে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতার জন্য এই ঘটনা একটি বিশেষ সাফল্য বহন করে। কেননা মিয়ানমার ও রোহিঙ্গাবিষয়ক গৃহীত হওয়া এটিই প্রথম প্রস্তাব। এই প্রস্তাব মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা সমস্যার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যই বটে।

আন্তর্জাতিক শান্তি, সংহতি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে এই ঘটনার মাধ্যমে এক নতুন আলোর সঞ্চার দেখা যায়। নিরাপত্তা পরিষদের তিন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য চীন, ভারত ও রাশিয়া ভোট প্রদানে বিরত থাকে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে চীন ও রাশিয়া তাদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ না করার মাধ্যমে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও মিয়ানমারের জান্তা সরকারের প্রতি তাদের মনোভাবের পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা সামান্য হলেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

এই প্রস্তাবকে চারটি ভিন্ন দিক থেকে দেখা যায়। প্রথমত, এটি মিয়ানমার জান্তার ওপর চাপ তৈরি করার একটি পশ্চিমা কৌশল। এর ফলে পশ্চিমের কাছ থেকে কূটনৈতিকভাবে বেশ জোরালো চাপের মুখে পড়েছে মিয়ানমার জান্তা সরকার। যুক্তরাজ্য এই প্রস্তাব উত্থাপন করলেও দেশটি ছিল এই বিশেষ ঘটনায় পশ্চিমাদের মুখপাত্রস্বরূপ। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে মিয়ানমার জান্তা পড়েছে গভীর সংকটে, যার চিত্রায়ণ দেখা যাবে কূটনৈতিক মহলে।

দ্বিতীয়ত, এই প্রস্তাবে প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ কঠিন পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কাউন্সিল রাখাইন রাজ্যের সংকটের মূল কারণগুলো সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেয়। তারা রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি তৈরি করার কথা বলে। এটি রোহিঙ্গাদের মুখোমুখি হওয়া সমস্যাগুলোর সমাধানে সহায়তা করার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করবে।

তৃতীয়ত, এই প্রস্তাবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দৃশ্যমান ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে বৃহত্তম রাজনৈতিক দল এনএলডিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করে আসছে জান্তা সরকার। অং সান সু চিসহ শত শত রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়। চলছে গৃহযুদ্ধ। দেশের ভেতরে তৈরি হয়েছে এক ছায়া সরকার। তবে এই ছায়া সরকারের সঙ্গে শুরুতে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখলেও বর্তমানে পশ্চিমের রয়েছে নিবিড় কৌশলগত যোগাযোগ। সঙ্গে যোগ হয়েছে চীন ও রাশিয়ার পূর্বের অবস্থান থেকে সরে আসার মতো ঘটনা। এই ইস্যুতে ভেটো ক্ষমতার ব্যবহার না করার মাধ্যমে সরাসরি বিরোধিতা থেকে সরে এসেছে দেশ দুটি। তাই এই দ্রুত পদক্ষেপগুলো হয়তো দেখতে পাবে এক নতুন গতিশীলতা।

চতুর্থত, এই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পেছনে আসিয়ানের দেশগুলোর বিশেষ অবদান রয়েছে। ভোটাভুটির পূর্বাপর ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আসিয়ান সদস্য রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল এই প্রস্তাব গ্রহণের পেছনে। একদিকে পশ্চিমাদের আগ্রহ, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার শঙ্কায় অনেকটা বাস্তববাদী আচরণ করে এই দেশগুলো। যার ফলে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ও রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সমাধানের ক্ষেত্রে আসিয়ানের ভূমিকা ফুটে উঠেছে। এটি ভবিষ্যতে আসিয়ানের ভূমিকাকে আরও জোরালো করতে সাহায্য করবে।

উল্লেখ্য, কাউন্সিল তার শর্তাবলির মাধ্যমে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়াগুলো সমুন্নত রাখার এবং মিয়ানমারের জনগণের ইচ্ছা ও স্বার্থ অনুসারে গঠনমূলক আলোচনা ও পুনর্মিলনের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে। সব পক্ষকে অবশ্যই মানবাধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনকে সম্মান করতে হবে। সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করতে এবং এই বিষয়ে আসিয়ান নেতৃত্বাধীন প্রক্রিয়া ও প্রক্রিয়াকে সমর্থন করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উৎসাহিত করতে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর (আসিয়ান) কেন্দ্রীয় ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সঙ্গে আসিয়ানের পাঁচ দফা ঐকমত্যকে কার্যকরভাবে ও পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়।

তবে প্রস্তাবের ভাষা নিয়ে ছিল প্রশ্ন। জাতিসংঘ সনদের অধ্যায় সাত (শান্তির প্রতি হুমকি, শান্তি ভঙ্গ এবং আগ্রাসনের ক্রিয়াকলাপের বিষয়ে পদক্ষেপ) এখানে সংযুক্ত নয়। নেই কোনো কঠোর বার্তাও। তাই কূটনৈতিক মহলে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা। এর তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করছেন সমালোচকরা। বিশ্ব পরিস্থিতি আমলে নিলে এবং এই অঞ্চলের ভূরাজনীতি একটু খতিয়ে দেখলে অবশ্য এই প্রস্তাবকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। বরং অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি চাপে রয়েছে জান্তা সরকার- এটুকু জোর দিয়েই বলা যায়। আর এতে আছে জাতিসংঘে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের বিশেষ কৃতিত্ব।

জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধিরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে। এই প্রস্তাব তাই যেন বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য। আমাদের কূটনীতিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেয়ার বার্তাই যেন এই প্রস্তাব। যেসব দেশ মিয়ানমারের পাশে থেকে সাহায্য করে যাচ্ছে, তাদের জন্য এই প্রস্তাব এক বার্তাস্বরূপ। মিয়ানমারের জান্তা সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে তারা কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে না। বরং সময় এসেছে মিয়ানমারকে প্রশ্ন করার। কেননা আন্তর্জাতিকভাবে দরকার আরও জোরালো পদক্ষেপের।

তবে সামগ্রিক পরিস্থিতির বিচারে আন্তর্জাতিক তৎপরতা যথেষ্ট নয়। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সমগ্র বিশ্বের মনোযোগ সরে গিয়েছে রোহিঙ্গা সংকট থেকে। মানবতার চরম বিপর্যয় তাই এড়িয়ে গেছে বিশ্ববাসীর চোখ। জাতিসংঘের এই পরিবর্তিত রূপের ফলে আশা করা যায়, বিশ্বের দৃষ্টি আবারও এসে পড়বে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিপীড়নের ওপর। এর আগে সাধারণ পরিষদে বহুবার ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হলেও, এবারই প্রথম কার্যকরী কোনো সংস্থা থেকে এ রকম প্রস্তাব গৃহীত হলো।

পুরো বিষয়টিকে বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা হিসেবে দেখা যায়। জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশের প্রতি চাপ প্রয়োগে এই প্রস্তাব এক কাঠামোগত রূপরেখা হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়াও সনদের অধ্যায় সাত সংযুক্ত করার ব্যাপারেও আরও সোচ্চার ভূমিকা পালন করা যাবে। এতে অবশ্যই চীন, রাশিয়াসহ অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির সহায়তা লাগবে। তবে আশা জাগানোর মতো বিষয় হচ্ছে, চীন, ভারত ও রাশিয়া জাতিসংঘের এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাটির ভোটাভুটিতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়া ইচ্ছা করলে তাদের ভেটো প্রয়োগ কিংবা অতীতের মতো হুমকি প্রদান করতে পারত। সঙ্গে পশ্চিমের প্রত্যক্ষ আগ্রহও উল্লেখ করার মতো। তবে সংকট সমাধান করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যেতে হবে বহুদূর।

লেখক: দেলোয়ার হোসেন
অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়