অর্থনীতিতে সুবাতাস

নতুন বছরের শুরুতেই অর্থনীতিতে বইতে শুরু করেছে সুবাতাস। বৈশ্বিক সংকট ও মন্দার আশঙ্কার মাঝেও দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পালে হাওয়া লেগেছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান খাত রপ্তানি আয়ে গড়েছে রেকর্ড। গত নভেম্বর মাসে রপ্তানি খাত প্রথমবারের মতো ৫০০ কোটি ডলার আয়ের মাইলফলক অর্জন করে। প্রথমবারের মতো কোনো এক মাসে রপ্তানি থেকে ৫০৯ কোটি ডলার আয় করে। সেই রেকর্ড ভেঙে গেছে পরের মাসেই। ডিসেম্বর মাসেও রপ্তানি আয়ে রেকর্ড গড়েছে দেশ। এ মাসে রপ্তানি আয় হয়েছে ৫৩৬ কোটি ডলারের বেশি। একই সঙ্গে মুখ থুবড়ে পড়া প্রবাসী বাংলাদেশের পাঠানো রেমিটেন্সও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পর নভেম্বর মাস থেকে রেমিটেন্স ফের বাড়তে শুরু করেছে।

নভেম্বর মাসে ১৫৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের পর ডিসেম্বর মাসে আরও ১৭০ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই দুই খাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে ঊর্ধ্বগতির কারণে বাণিজ্য ও লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি কমতে শুরু করেছে। যা অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাছাড়া, সদ্য সমাপ্ত ২০২২ ক্যালেন্ডার বছরে প্রায় ১১ লাখ বাংলাদেশী নতুন চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন। এই বিপুল সংখ্যক প্রবাসী দেশে রেমিটেন্স প্রেরণ শুরু করলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সংকট অনেকটাই কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, গত চার মাস ধরেই মূল্যস্ফীতি কমছে। সেই ডিসেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, যা আগের দুই মাস অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের চেয়ে বেশি। এতে শ্রমিক শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি দেশে শিল্পায়নের গতি বৃদ্ধির বার্তা দিচ্ছে। মূলত নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠার কারণেই শিল্পঋণ বাড়ছে। শিল্পায়নের কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। তবে এত কড়াকড়ি ও বিধি-নিষেধ আরোপের পরও আমদানি ব্যয় উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়ে গেছে। এটি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে চাপমুক্ত হয়ে অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

রপ্তানি আয়ে রেকর্ড ॥ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে ৫৩৬ কোটি ৫১ লাখ ৯০ হাজার ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে। যা এক মাসের সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়। এর আগে ২০২১ সালের একই সময়ে ৪৯০ কোটি ৭৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার রপ্তানি আয় করে বাংলাদেশ। সেই হিসেবে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে রপ্তানি আয় আগের বছরের একই মাসের চেয়ে ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি। এর আগে নভেম্বরে প্রথমবারের মতো এক মাসের রপ্তানি আয় ৫০০ কোটির ঘর ছাড়িয়েছিল।

ইপিবির তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাস অর্থাৎ জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোট ২ হাজার ৭৩১ কোটি ১২ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এটি আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি। রপ্তানি আয়ের বড় তৈরি পোশাক খাতে অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে ১৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। খাতটি গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাসে ২ হাজার ২৯৯ কোটি ৬৬ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।

রপ্তানি আয়ে রেকর্ডের পর রেকর্ডে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই রপ্তানি আয়ের উল্লম্ফনের ওপর ভর করেই ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশের অর্থনীতি।
ঘুরে দাঁড়িয়েছে রেমিটেন্স ॥ গত নভেম্বর মাস থেকে রেমিটেন্স ফের বাড়তে শুরু করে। নভেম্বর মাসে ১৫৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। ডিসেম্বর মাসে তা আরও বেড়ে ১৭০ কোটি ডলার এসেছে। পর পর দুই মাস রেমিটেন্সে ঊর্ধ্বগতি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এই খাতটি ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই সময়ে নতুন কর্মী বিদেশে গেছে।

সদ্য সমাপ্ত ২০২২ সালে বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি সাম্প্রতিক সময়ের রেকর্ডগুলো ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিদেশে গেছে ১০ লাখ ২৪ হাজার বাংলাদেশী কর্মী। ২০২২ সালে প্রতি মাসে গড়ে ৯৩ হাজার কর্মী বিদেশে গেছেন। করোনা মহামারির আগে বিদেশে যাওয়া কর্মীর গড় মাসিক ছিল প্রায় ৬০-৭০ হাজার। সেই হিসেবে বলা হয়, ২০২২ সালে বিদেশ যাওয়া কর্মীর রেকর্ড ১১ লাখে গিয়ে পৌঁছাবে।
এ প্রসঙ্গে বিএমইটি মহাপরিচালক শহীদুল আলম বলছেন, শুধু নভেম্বরেই ৭৬ হাজারের বেশি কর্মী বিদেশে গেছে। ঊর্ধ্বমুখী এই ধারা অব্যাহত থাকলে, ডিসেম্বর শেষে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ১১ লাখে পৌঁছানোর রেকর্ড করবে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়া এবং জ্বালানি তেলের চড়া দামের সুবাদে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি চাঙ্গা থাকা এবং করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় কর্মীরা কাক্সিক্ষত গন্তব্যে যেতে পারছেন। তাছাড়া সৌদি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগের কোটা ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করার ঘটনাও-জনশক্তি রপ্তানির রেকর্ড বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। এর আগে ২০১৭ সালে বার্ষিক ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায় বৈদেশিক কর্মসংস্থান। কিন্তু, পরের বছরগুলোতে তা পতনের দিকে যেতে থাকে। আর ২০২০ সালে মহামারিজনিত বিধিনিষেধের ফলে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২.১৭ লাখে।

এই কর্মীরা বিদেশ থেকে দেশে অর্থ প্রেরণ করলে আগামী দিনগুলোতে রেমিটেন্স আরও বাড়বে। এছাড়া, ডলার ও টাকার বিনিময় মূল্যে বড় পার্থক্যের কারণে প্রবাসীরা হুন্ডিতে টাকা পাঠিয়েছে। সরকারি পদক্ষেপে এই পার্থক্য কমে আসায় এখন প্রবাসীরা ঝুঁকি না নিয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ করছেন। ফলে রেমিটেন্স বাড়তে শুরু করেছে। তাছাড়া, সামনে রোজা এবং কোরবানির ঈদ রয়েছে। ফলে আগামী জুন পর্যন্ত রেমিটেন্সের গতি বৃদ্ধি ছাড়া কমার আশঙ্কা নেই। ফলে রপ্তানি ও রেমিটেন্স আয় সমান্তরালে বাড়তে থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার টানাপোড়েন কমে যাবে। স্বস্তি মিলবে রিজার্ভে এবং চাপ মুক্ত হবে অর্থনীতি।

গত ২০২১-২২ অর্থবছরে ২১ দশমিক শূন্য তিন বিলিয়ন ডলারের রেমিটেন্স পাঠিয়েছিল প্রবাসীরা। যা ছিল আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ কম। তবে এবার এই সূচকে উল্লম্ফন নিয়ে অর্থবছর শুরু হয়েছিল। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ৪ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। যা ছিল গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি। কিন্তু সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ওই দুই মাসেই দেড় বিলিয়ন ডলার করে রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। অথচ প্রথম দুই মাসে দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি করে পাঠিয়েছিলেন। এর পর নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে রেমিটেন্স। সব মিলিয়ে অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ৮ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার দেশে এসেছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ১৪ শতাংশ।

কমছে লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি ॥ বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন (৫৬৭ কোটি টাকা) ডলার। গত বছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ রেমিটেন্স ও রপ্তানির ওপর ভর করে বৈদেশিক লেনদেনের পার্থক্যও কমে আসছে।

অথচ আমদানি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ১৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল ঘাটতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২১-২২ অর্থবছর। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনোই কোনো অর্থবছরে ব্যালান্স অব পেমেন্টে এত ঘাটতি দেখা যায়নি। তার আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরে এই সূচকে ৪ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি ছিল।

সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা পদক্ষেপে আমদানি ব্যয় কমেছে। মূলত গত বছরের আগস্ট মাস থেকে আমদানি ব্যয় বাড়তে শুরু করে। অর্থবছরজুড়ে সেই উল্লম্ফন দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত ৩৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে অর্থবছর শেষ হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি আয়েও উল্লম্ফন হয়েছিল; ৩৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। কিন্তু আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক রেমিটেন্স প্রবাহ কমেছিল ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ। এই দুই খাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে উলম্ফন সত্ত্বেও আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঘাটতি চূড়ায় উঠেছিল।

সরকারের নানা পদক্ষেপ ও বিধি-নিষেধের কারণে আমদানি ব্যয়ে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) আমদানিতে ব্যয়ের চেয়ে রপ্তানি আয় বেশি হয়েছে। যে কারণে বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি কমতে শুরু করেছে। তবে এখনও আমদানি ব্যয়ে অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে। নানা পদক্ষেপের পরও আমদানি ব্যয় খুব একটা কমছে না। এখনও প্রতি মাসে পণ্য আমদানিতে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা এখন এই আমদানি ব্যয়কে উদ্বেগজনক হিসাবেই দেখছেন।

অর্থনীতির গবেষক আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা পদক্ষেপে পণ্য আমদানির এলসি (ঋণপত্র) খোলার পরিমাণ কমেছে ঠিক। কিন্তু সামগ্রিক হিসাবে নভেম্বর পর্যন্ত আমদানি ব্যয় এখনও বেশি। সে কারণে রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্স প্রবাহ ইতিবাচক ধারায় ফিরলেও ব্যালান্স অব পেমেন্টে ঘাটতি এখনও বেশি দেখা যাচ্ছে। সামনে বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে যে করেই হোক, অর্থনীতির ওপর থেকে চাপ কমাতে আমদানি ব্যয়ের লাগাম টানতে হবে।

বেশ কয়েক বছর পর ২০২০-২১ অর্থবছরে লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতিতে পড়ে বাংলাদেশ। প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ওই বছর। তার আগে ৯ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলারের বড় উদ্বৃত্ত নিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষ হয়েছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে উদ্বৃত্ত ছিল ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার।
বাণিজ্য ঘাটতিও নিম্নমুখী ॥ ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এই পাঁচ মাসে বাংলাদেশ রপ্তানির চেয়ে ১১ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য আমদানি করেছে। অবশ্য আগের ২০২১-২২ অর্থবছরের এই পাঁচ মাসে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ এর চেয়ে বেশি ছিল, ১২ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ৩২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছে দেশে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি। ২০২১-২২ অর্থবছরের এই পাঁচ মাসে ৩১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছিল।
অন্যদিকে জুলাই-নভেম্বর সময়ে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে ২০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেশি। গত বছরের এই পাঁচ মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ১৮ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছিল। এ হিসাবেই অর্থবছরের প্রথম পাঁচ পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গত অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

চার মাস ধরে কমছে মূল্যস্ফীতি ॥ সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতির পারদ ক্রমশ কমছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ তথ্যে বলা হয়েছে, সদ্য সমাপ্ত ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি কমেছে। গত ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। এর আগে গত নভেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং অক্টোবরে ছিল ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ।

এছাড়া, সেপ্টেম্বরে ছিল ৯ দশমিক ১০ শতাংশ এবং আগস্টে ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ। আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল গত এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ।
পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, গত আগস্টের পর থেকে মূল্যস্ফীতি অব্যাহতভাবে কমছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য কমে আসায় দেশের বাজারেও তার কিছুটা প্রভাব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কিছু কিছু পণ্য ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে ক্রেতাদের এখনও অস্বাভাবিক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশের গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১০ দশমিক ৯২ শতাংশ। এরপর আর এই সূচক ৯ শতাংশের ওপরে ওঠেনি।
শ্রমিক মজুরিও বেড়েছে ॥ গত ডিসেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, যা আগের দুই মাস অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের চেয়ে বেশি। অক্টোবরে মজুরি সূচক ছিল ৬ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং নভেম্বর মাসে ছিল ৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ। করোনার প্রভাব কমে আসার পর থেকে দেশে শ্রমিক মজুরি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। মজুরি বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষের কেনাকাটায় স্বস্তি মেলে।

বাড়ছে বিনিয়োগ ॥ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় বেশ চাপে থাকা অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবাহে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের পঞ্চম মাস নভেম্বরে দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। এর অর্থ হলো ২০২১ সালের নভেম্বর মাসের তুলনায় ২০২২ সালের নভেম্বরে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ১৪ শতাংশ বেশি ঋণ নিয়েছেন। পর পর দুই মাস কমার পর নভেম্বরে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচক ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। আগস্টে তা বেড়ে ১৪ দশমিক দশমিক শূন্য সাত শতাংশে উঠে য়ায়। এর পরের মাস সেপ্টেম্বরেই তা ১৪ শতাংশের নিচে নেমে আসে। এ মাসে তা কমে ১৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ হয়। অক্টোবরে তা আরও কমে ১৩ দশমিক ৯১ শতাংশে নেমে আসে। নভেম্বরে এই হার খানিকটা বেড়ে ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতির বিশ্লেষক আহসান এইচ মনসুর বলেন, গত কয়েক মাস ধরেই বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ছিল। এই কঠিন সময়ে ১৪ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি মন্দ নয়। তিনি বলেন, করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার যে প্রণোদণা ঘোষণা করেছিল, তাতে এই ঋণ প্রবৃদ্ধিতে অবদান আছে। এ ছাড়া করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসায় দেশে বিনিয়োগের একটি অনুকূল পরিবেশও দেখা দিয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু কর্ণফুলী টানেলসহ কয়েকটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে উদ্যোক্তারা নতুন পরিকল্পনা সাজিয়ে বিনিয়োগে নেমেছেন। ব্যাংকগুলো তাতেও বিনিয়োগ করেছে। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতের ঋণের একটি গতি এসেছে।

নতুন বছরে দেশের অর্থনীতি ভালো যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেছেন, নতুন বছরে দ্রব্যমূল্য কমে আসবে, বাড়বে রপ্তানি ও রেমিটেন্স আয়। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে জিডিপি-প্রবৃদ্ধির নতুন যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তার চেয়ে প্রবৃদ্ধি বেশিই হবে। শুধু তাই নয়, বৈশ্বিক সংকটের কারণে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। বহির্বিশ্বে জিনিসপত্রের দাম কমায় শীঘ্র দেশেও মূল্যস্ফীতি কমে আসবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামীতে সংকট মোকাবেলা করে এগিয়ে যাওয়া হবে। আগামী বাজেটে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় উপকারভোগী বাড়ানো, দারিদ্র্য নিরসন এবং নতুন কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্প গ্রহণে জোর দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সংশোধিত বাজেটেও কৃচ্ছ্র সাধনের মতো বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আশা করি, বাজারের অস্থিতিশীলতা বেশি দিন থাকবে না। সরকার এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হবে না। আমরা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলমান সঙ্কট মোকাবিলা করতে সক্ষম হব। ফলে আগামীতে ভালো যাবে দেশের অর্থনীতি।