পাহাড়ে আমেরিকান তুলা চাষে ভাগ্য বদলের সম্ভাবনা

বাংলাদেশে তুলার চাহিদা ৭০ থেকে ৮০ লাখ বেল, সেখানে উৎপন্ন হয় মাত্র ১ থেকে দেড় লাখ বেল। দেশে তুলার ব্যাপক চাহিদা থাকায় বিদেশ থেকে তুলা আমদানি করতে প্রতি বছর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। শুধু তাই নয়, এ সেক্টরটিতেই দেশের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার লোক কর্মযজ্ঞে জড়িত।

একটা সময় পাহাড়ে জুম চাষে প্রচুর তুলা চাষ হতো, ‘কার্পাস মহল’ পার্বত্যাঞ্চলের পুরনো একটি নাম। পাহাড়ের জুমে ‘কার্পাস’ তুলা চাষের কারণে ব্রিটিশ আমলে এই নামকরণ হয়েছিল। কালের পরিক্রমায় কার্পাস তুলার চাষাবাদ কমে গেছে। এখন জুমে তুলা চাষ প্রায় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কিছুটা হলেও দেশে এর চাহিদা মেটাতে এবং পাহাড়ের চাষিদের ভাগ্য বদল করতে এরই মাঝে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে তুলা চাষ বৃদ্ধি ও কৃষকদের দারিদ্য বিমোচন প্রকল্পের আওতায় পাহাড়ের পতিত অনাবাদি জমিতে তুলা চাষে আগ্রহ সৃষ্টি করে যাচ্ছে, বাংলাদেশ তুলা উন্নয়ন বোর্ড। তুলা চাষ বৃদ্ধি ও কৃষকদের দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে পাহাড়ে তুলা চাষের মাধ্যমে কৃষকের ভাগ্য বদল হবে এবং এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

তুলা উন্নয়ন বোর্ড, খাগড়াছড়ি জোন অফিস সূত্রে জানা গেছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক উদ্ভাবিত সিবি-১২, সিবি-১৩ ও সিবি-১৪ জাতের তুলাবীজ সারা দেশে চাষ করা হয়। জাত ভেদে তুলার বীজ ১৫ জ্যৈষ্ঠ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত পাহাড়ে বপনের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। তবে সমতলে ৩০ শ্রাবণ পর্যন্ত বীজ বপন করা যেতে পারে। হাইব্রিড জাত আগাম বপন করা উত্তম। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব জাতের ক্ষেত্রে বিঘাপ্রতি ২ কেজি এবং হাইব্রিডের ক্ষেত্রে ৮০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। বীজ বপনের আগে তুলাবীজ ৩-৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে শুকনো মাটি বা ছাই দিয়ে ঘষে নেয়া উত্তম। পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড়ে পানি জমে থাকে না, তাই এখানে তুলা চাষে ঝুঁকি কম। তবে সেচ ব্যবস্থা না থাকলে তুলা উৎপাদন কম হয়। সুনিষ্কাশিত মাটি তুলাচাষের উপযোগী। তুলাচাষের জন্য উৎকৃষ্ট হচ্ছে-বেলে দোআঁশ ও দোআঁশ প্রকৃতির মাটি। এ ছাড়াও, এটেল দো-আঁশ ও পলিযুক্ত এটেল দোআঁশ মাটিতে তুলাচাষ করা যায়। মাটির অবস্থা বুঝে ৩-৪টি চাষ এবং মই দিয়ে জমি সমতল ও ঝরঝরে করে নিতে হবে। সারি থেকে সারি ৯০ সেমি. (৩ ফুট বা ২ হাত) এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৪৫ সেমি. (১.৫ ফুট বা ১ হাত) বজায় রেখে বীজ বপন করতে হয়। সারি বরাবর মাটি উঁচু করে তার ওপর বীজ বপন করা উত্তম।

মহালছড়ি উপজেলার তুলাচাষি সুচিত্র চাকমা জানান, প্রতি বিঘায় ৪২০০ থেকে ৪৫০০ চারা রোপণ করতে হয়। রোপণের পর জাত ভেদে ১১০-১২০ দিনের মধ্যে তুলার বোল ফাটতে শুরু করে। প্রতিটি গাছে গড়ে ৩৫-৪০টি বোল থাকে, প্রতি বোলে ৫ গ্রাম করে তুলা পাওয়া গেলে প্রতি বিঘায় ৭৩৫ কেজি থেকে ৭৫০ কেজি তুলা উৎপাদন সম্ভব। ৩-৪ বারে সব তুলা সংগ্রহ করতে ৪০-৫০ দিন দরকার হয়। তুলার বোল সম্পূর্ণরূপে ফাটার পরও ৭-১০ দিন গাছেই শুকানো উচিত। এতে আঁশ ও বীজের মান উন্নত হয়।

খরচ ও আয় ব্যয়ের বিষয়ে দীঘিনালা উপজেলার তুলা চাষি মাহিল হোসেন জানান, মাঝে মাঝে পানি সেচ ও সামান্য সার ও কীটনাশক ব্যবহার ছাড়া তুলা চাষে তেমন একটা ব্যয় নেই। তুলার সঙ্গে শুরুতেই লালশাক ও পরে বরবটি, ভুট্টা চাষ করা যায়। এছাড়াও আম, মাল্টা, পেয়ারা বাগানেও তুলা চাষ করা যায়। এক হেক্টর জমিতে ৪-৫ মাসে সার বীজসহ মোট ১৫ হাজার টাকার মতো খরচ হলেও ৬৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকার ফসল পাওয়া যায়। তুলা চাষে সরকারিভাবে সেচ যন্ত্রের সহযোগিতা পেলে অধিক জমিতে তুলা চাষ করতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন চাষিরা।

তুলা উন্নয় বোর্ডের খাগড়াছড়ি জোনের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. মোজাফফর হোসেন বলেন, তুলা একটি অর্থকরী ফসল। পার্বত্যাঞ্চলের মাটি তুলার সঙ্গে মিশ্র চাষের উপযোগী। পাহাড়ের অনাবাদী ও জুমে মিশ্রচাষে সম্ভাবনার ফসল তুলা। তুলা চাষ করে এখানকার চাষিরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। বস্ত্র শিল্পে তুলার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে আমাদের প্রতি বছর বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অধিক চাহিদার প্রেক্ষিতে, বাংলাদেশী টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিল এবং অন্যান্য ব্যবহারকারীরা ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল এবং পাকিস্তান থেকে তুলা আমদানি করে থাকে।

পার্বত্যাঞ্চল তথা খাগড়াছড়িতে বর্তমানে আমেরিকান আপল্যান কটন ও চায়না হাইব্রিড জাতের তুলা চাষ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে এর ভালো সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কৃষকরা যেখানে ভালো সেচ সুবিধায় তুলা চাষ করতে পারছে সেখানে প্রতি বিঘা ভূমিতে ১২ থেকে ১৪ মণ পর্যন্ত তুলা উৎপাদন হচ্ছে। তবে ব্যাপকভাবে তুলা উৎপাদনের সুযোগ থাকলেও এখানকার দুর্গম এলাকার চাষিরা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং ভালো সেচ সুবিধা না থাকায় তা ব্যাহত হয়। এখানকার কৃষকদের সরকারি- বেসরকারি, এনজিও বা বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে যদি তুলা চাষ করা যায় তাহলে এখানে ২ থেকে ৩ লাখ বেল তুলা উৎপাদন করা সম্ভব এবং এখানকার তুলায় দেশের চাহিদা অনেকটা পূরণ করা যাবে।

এবার চলতি মৌসমে ১২০০ টন আমেরিকান আপল্যান তুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলায় ৩৮৪ হেক্টরেরও বেশি জমিতে তুলা চাষ করা হয়েছে বলেও জানান এ কর্মকর্তা।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (প্রশাসন) ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে তুলা চাষ বৃদ্ধি এবং কৃষকের দারিদ্য বিমোচন প্রকল্প পরিচালক ইফতেহার আহম্মেদ বলেন, তুলা উন্নয়ন বোর্ড কৃষক নির্ধারণ করে দেয়। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে তুলা চাষ বৃদ্ধি ও কৃষকের দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্পের আওতায় তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ি তুলাসহ ৬ প্রজাতির তুলা চাষ করা হচ্ছে। তুলা চাষের জন্যে কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণের মাধ্যমে মোট ৯৪০টি প্লট তৈরি করে দেয়া হবে বলেও তিনি জানান।