নতুন বইয়ে শিশুদের উৎসব

নতুন বছরের শুরুর দিনই সারা দেশে একযোগে বই পেল শিশুরা। শীতের সকালে নতুন বইয়ের ঘ্রাণে মেতে ওঠে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা। আপন মনে বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টেপাল্টে দেখছিল শিশুরা। তাদের উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব বই না পৌঁছালেও উৎসবে কমতি ছিল না। শিশুরা নাচগান, আবৃত্তি আর উল্লাসে রঙিন করে তোলে উৎসব।

রবিবার সারা দেশে একযোগে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের বই বিতরণের মাধ্যমে পালিত হয় বই উৎসব। পৃথকভাবে আয়োজন করা হয়েছিল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের বই উৎসব উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। গাজীপুরের কাপাসিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রাথমিকের বই উৎসবের উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে প্রাথমিকের বই বিতরণ উদ্বোধন করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন। সকাল ১০টায় এসব অনুষ্ঠান শুরু হয়।

প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন বলেন, নতুন বই যেভাবে শিশুদের আনন্দিত, উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করে, সেই অনুপ্রেরণায় আজকের শিশুরা আগামীর আলোকিত বাংলাদেশ গড়েবে। বই শিশুকে বিমুগ্ধ ও বিমোহিত করে, বইয়ের ঘ্রাণ শিশুকে কৌতূহলী করে তোলে। শিশুর মনোজগতের এ আবেগকে ধারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ২০১০ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে শতভাগ নতুন পাঠ্য বই বিতরণ করা হচ্ছে।

রাজধানীর বেশির ভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বই সংকট আছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের সংকটই বেশি। দক্ষিণ মৈশুণ্ডী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক উম্মে কুলসুম বলেন, ‘দ্বিতীয় শ্রেণির শতভাগ বই এলেও এখনো পঞ্চম শ্রেণির কোনো বই পাইনি। ’

অনুষ্ঠানে আসা বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত নতুন পাঠ্যপুস্তক। এর মধ্যে কয়েকটির মান কিছুটা ভালো। তবে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর হাতেই নিউজপ্রিন্ট কাগজের বই দেখা যায়। দক্ষিণ মৈশুণ্ডী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নুসরাত জাহান বলেন, ‘শুনেছি এ বছর কাগজের সংকট আছে। আবার দামের কারণেও হয়তো নিউজপ্রিন্টের বই দিয়েছে। ’

এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ফরিদ আহাম্মদ বলেন, বইয়ের কোনো সংকট নেই। টেন্ডার জটিলতা, ভার্জিন পাল্প (কাগজ তৈরির মণ্ড) আমদানিতে সমস্যা এবং কাগজ না পাওয়ার কারণে কয়েকটি প্যাকেজের কাজে দেরি হয়েছে। সব বিদ্যালয়ে তিন থেকে চারটি বিষয়ের বই পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলো সরবরাহের অপেক্ষায় রয়েছে। ১০ জানুয়ারির মধ্যে সব বিদ্যালয়ে শতভাগ বই পৌঁছে দেওয়া হবে।

বইয়ের মান নিয়ে ফরিদ আহাম্মদ বলেন, মুদ্রণপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে এ বছর স্বাধীন এজেন্সি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মান যাচাইয়ে পরিদর্শন টিম আরো ছয় মাস সময় পাবে। টেন্ডারে নির্ধারিত মানের বই সরবরাহ করতে হবে। কোথাও নিম্নমানের বই পাওয়া গেলে তারা এনসিটিবি, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে তা জানাবে। ফলে এর বাইরে বই সরবরাহের কোনো সুযোগ নেই।

মানিকগঞ্জ সরকারি বালক বিদ্যালয়, সুরেন্দ্র কুমার বালিকা বিদ্যালয় ও ৮৮ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। হবিগঞ্জের মাধবপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বই উৎসবে প্রধান অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী। মাগুরা পারনান্দুয়ালী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে বই উৎসবের উদ্বোধন করেন মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান শিখর।

এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, ঝালকাঠি, সাতক্ষীরা, বগুড়া, নওগাঁ, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও হবিগঞ্জে বই পেয়ে শিক্ষার্থীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। এসব অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসকসহ জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রচণ্ড শীতের মধ্যে সাদা শার্টের ওপর ব্লু সোয়েটারে ছেয়ে যায় খুলনা জিলা স্কুলের মাঠ। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নিতে মাতোয়ারা শিক্ষার্থীরা কখনো গানে মেতেছে, আবার কখনো আবৃত্তিতে। ঘণ্টা দুয়েক অপেক্ষার পর বই হাতে নিয়ে ঘরে ফেরে তারা। আবার কেউ কেউ বই নিয়ে বসে পড়েছে মাঠের কিনারায়। ঐতিহ্যবাহী খুলনা জিলা স্কুলের মতো এ দৃশ্যের দেখা মিলেছে প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

খুলনা জেলা প্রাথমিক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনায় এক হাজার ৫৭১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়। চলতি বছরে জেলায় বইয়ের চাহিদা রয়েছে ১০ লাখ ৬৫ হাজার ২৩১টি। চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৮০ শতাংশ বই এসেছে। খুলনায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪২০টি ও মাদরাসা ১৩৬টি। বইয়ের চাহিদা ২৯ লাখ। মাধ্যমিক স্তরে ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগ পাঠ্য বই পেয়েছে।

খুলনা জিলা স্কুলের শিক্ষার্থী আদনান বলে, ‘স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে একটি বই পেয়েছি। স্যাররা পরে অন্য বই দেবেন। ’ একই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সৌমিত্র ও ফাইয়াজ নতুন বই পেয়ে উচ্ছ্বসিত। তারা ১২টি বই পেয়ে খুবই খুশি। তাদের ভাষায় ‘আহ্! নতুন বই। আজই পড়া শুরু। ’

গোপালগঞ্জ শহরের বীণাপাণি সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, এসএম মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে বই উৎসবে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক কাজী মাহবুবুল আলম। এদিন জেলায় প্রথমিকের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাত লাখ ৫৫ হাজার ৬৯৭টি এবং মাধ্যমিক, মাদরাসা ও ভোকেশনালে ১৭ লাখ ৭১ হাজার ১১১টি বই বিতরণ করা হয়।

রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আবু জাফর রংপুর জিলা স্কুলের হলরুমে বই উৎসবের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে ছিলেন জেলা প্রশাসক চিত্রলেখা নাজনীন। বিভাগের আট জেলায় প্রাক-প্রাথমিকে ২৯ লাখ ৪৩ হাজার ৮৬২ জন শিক্ষার্থীকে এক কোটি ২৭ লাখ ৪৪ হাজার বই দেওয়া হয়।

ময়মনসিংহ নগরের নওমহল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বই বিতরণ উৎসবের উদ্বোধন করেন বিভাগীয় কমিশনার শফিকুর রেজা বিশ্বাস।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলায় চার হাজার ৭১৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩৭ লাখ ৭২ হাজার বইয়ের চাহিদার বিপরীতে বিভিন্ন স্কুলে ১৩ লাখ ৯ হাজার ৬০০ বই দেওয়া হয়, যা মোট চাহিদার ৩৪.৭২ শতাংশ। একইভাবে মাদারীপুরে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সাত লাখ ১৬ হাজার ৮৪৭টি বইয়ের চাহিদার বিপরীতে শিক্ষার্থীরা পেয়েছে তিন লাখ ৭৩ হাজার ১৫০টি, যা চাহিদার তুলনায় ৪৮ শতাংশ কম। মেহেরপুরে মাধ্যমিক পর্যায়ে ২৯ শতাংশ ও প্রাথমিক পর্যায়ে চাহিদার ২৫ শতাংশ বইয়ের সংকট ছিল। অবশ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, শিগগিরই অন্য সবার হাতে নতুন বই পৌঁছে দেওয়া হবে। [প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা। ]